প্রতিশ্রুতির আর্থিক ভার: একটু হিসাব কষা যাক

শুধু মহিলাদের মাসে ৩,০০০ টাকার হিসাবটা ধরা যাক। পশ্চিমবঙ্গে প্রাপ্তবয়স্ক মহিলার সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি। যদি সকল প্রাপ্তবয়স্ক মহিলা এই প্রকল্পের আওতায় আসেন, তাহলে প্রতি মাসে ব্যয় দাঁড়ায় ১২,০০০ কোটি টাকা — অর্থাৎ বছরে প্রায় ১,৪৪,০০০ কোটি টাকা। এমনকি যদি ধরে নেওয়া হয় অর্ধেক মহিলা এই সুবিধা পাবেন, তাহলেও বার্ষিক খরচ ৭২,০০০ কোটি টাকার কম হয় না। তুলনায় দেখা যাক রাজ্যের আয়ের চিত্র। ২০২৫-২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গের মোট রাজস্ব প্রাপ্তি ধরা হয়েছে ২,৬৬,০৬০ কোটি টাকা, যার মধ্যে রাজ্য নিজে সংগ্রহ করে মাত্র ৪৬ শতাংশ — বাকি ৫৪ শতাংশ আসে কেন্দ্র থেকে। অর্থাৎ রাজ্যের নিজের হাতে থাকা অর্থ মাত্র ১,২১,৯০৪ কোটি টাকা। সেখানে শুধু মহিলা ভাতাতেই যদি ৭২ থেকে ১,৪৪ হাজার কোটি টাকা যায়, বাকি সব খরচ চলবে কীভাবে?

রাজ্যের কোষাগার: ইতিমধ্যেই তলানিতে

বিষয়টা শুধু নতুন প্রতিশ্রুতির নয়। পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান আর্থিক অবস্থাটা আগে বোঝা দরকার। ২০২৬-২৭ সালে রাজ্যের মোট বকেয়া ঋণ দাঁড়াবে ৮,১৫,৮৯১ কোটি টাকা — যা রাজ্যের জিএসডিপির প্রায় ৩৮ শতাংশ। এই ঋণ শুধু সংখ্যা নয়, প্রতি বছর এর সুদ মেটাতেই বিশাল অঙ্ক বেরিয়ে যায়। বেতন, পেনশন এবং সুদ পরিশোধ মিলিয়ে রাজ্যের মোট রাজস্ব প্রাপ্তির ৫১.১৭ শতাংশ আগেই নির্ধারিত হয়ে আছে। মানে প্রতি ১০০ টাকা আয়ের মধ্যে ৫১ টাকা চলে যাওয়ার আগেই নতুন কোনো প্রকল্পের জন্য হাতে থাকে বাকি ৪৯ টাকা — তা থেকেই স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিকাঠামো, কৃষি সব চালাতে হয়। পশ্চিমবঙ্গের মোট ঋণের বোঝা ২০১১ সালে ছিল ১.৯৭ লাখ কোটি টাকা; ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬.৯৩ লাখ কোটি টাকায়। গত চোদ্দ বছরে ঋণ বেড়েছে সাড়ে তিনগুণেরও বেশি। নীতি আয়োগের ফিসক্যাল হেলথ ইনডেক্স ২০২৬ অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গ ১৮টি মূল্যায়িত রাজ্যের মধ্যে তৃতীয় সর্বনিম্ন স্থানে। সহজ কথায়, আর্থিক স্বাস্থ্যের বিচারে বাংলা তলার দিকে।

তুলনামূলক চিত্র: TMC-র ভাতার খরচ ইতিমধ্যে কতটা চাপ ফেলেছে

টিএমসি সরকারের লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পে বর্তমানে সাধারণ মহিলারা মাসে পান ১,৫০০ টাকা, এসটি-এসসি পান ১,৭০০ টাকা। ২০২৫-২৬ বাজেটে শুধু এই প্রকল্পেই বরাদ্দ ২৬,০০০ কোটি টাকা। বিজেপি দ্বিগুণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে — তাহলে শুধু এই একটি প্রকল্পেই খরচ কমপক্ষে ৫০,০০০ থেকে ৬০,০০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। পশ্চিমবঙ্গের মাথাপিছু আয় ২০২৫-২৬ সালে ছিল ১,৭১,১৮৪ টাকা, যা জাতীয় গড়ের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ কম। দেশের রাজ্যগুলির মধ্যে মাথাপিছু জিডিপিতে বাংলার স্থান ২১তম। এটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য — কারণ কম মাথাপিছু আয়ের মানে হল রাজ্যের কর সংগ্রহের ভিত্তিও দুর্বল। বাড়তি ভাতার টাকা যোগাড় করতে হলে হয় ঋণ নিতে হবে, নয়তো কেন্দ্রের মুখাপেক্ষী হতে হবে।

“কেন্দ্র দেবে” — এই যুক্তি কতটা বাস্তব?

বিজেপি বলতে পারে, কেন্দ্রে তারা ক্ষমতায় থাকায় কেন্দ্রীয় অনুদান বাড়বে। কিন্তু এই যুক্তির দুটো সমস্যা আছে। প্রথমত, কেন্দ্র থেকে রাজ্যের অনুদান ও কর ভাগাভাগি মিলিয়ে আসে মোট রাজস্বের ৫৪ শতাংশ। কিন্তু কেন্দ্রীয় তহবিল কোনো নির্দিষ্ট রাজ্যের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণের জন্য ঢেলে দেওয়া যায় না — সেটা আর্থিক সংবিধানের বাইরে। প্রতিটি রাজ্যকে তার ন্যায্য হিস্যাই দিতে হয়। দ্বিতীয়ত, কেন্দ্রের নিজের আর্থিক অবস্থাও চাপে। ২০২৪-২৫ সালে কেন্দ্রীয় রাজকোষ ঘাটতি জিডিপির ৪.৮ শতাংশ। রাজ্যের ভাতার বোঝা কেন্দ্র নেবে — এটা কোনো আইনি বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি নয়, বরং একটি নির্বাচনী বাগাড়ম্বর।

শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান: বাস্তব চিত্র কী বলছে?

বিজেপি বলছে, শিল্পায়ন করে রাজস্ব বাড়ানো হবে। কিন্তু পরিসংখ্যান ভিন্ন কথা বলে। ২০১৯ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে মোট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) এসেছে মাত্র ১৫,২৫৬ কোটি টাকা। বারবার ‘গ্লোবাল বিজনেস সামিট’-এর পরেও শিল্পের আগমন কার্যত হয়নি। রাজ্যের অর্থনীতিতে উৎপাদন খাতের অবদান মাত্র ১৮.৮ শতাংশ, যা জাতীয় গড়ের নিচে। একটি দুর্বল শিল্পভিত্তির রাজ্যে ভাতার অর্থায়নের জন্য রাতারাতি কর সংগ্রহ বাড়বে — এটা কল্পনাবিলাস।

তাহলে প্রতিশ্রুতিগুলো কি আদৌ পালনযোগ্য?

সৎভাবে বলতে গেলে — না, অন্তত যেভাবে ঘোষণা করা হয়েছে সেভাবে নয়। এর কারণ তিনটি। প্রথমত, ঘোষিত প্রতিশ্রুতিগুলো পালন করতে বার্ষিক যা খরচ হবে, তা রাজ্যের নিজস্ব রাজস্ব আয়ের চেয়ে বেশি হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল — কোনো ফান্ডিং মডেল ইশতেহারে নেই। দ্বিতীয়ত, রাজ্যের মূলধন ব্যয় মাত্র জিএসডিপির ১.৯ শতাংশ, যা জাতীয় গড়ের বহু নিচে। মূলধন বিনিয়োগ ছাড়া উৎপাদনশীলতা বাড়বে না, কর সংগ্রহ বাড়বে না, ভাতার অর্থায়নও হবে না। তৃতীয়ত, বিজেপি এই একই রণকৌশল অনুসরণ করেছে মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা এবং অসম নির্বাচনেও। মহারাষ্ট্রে মহিলাদের মাসে ২,১০০ টাকা, কৃষকদের ঋণ মকুব, জ্যেষ্ঠ নাগরিকদের পেনশন বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। অসমে মহিলাদের ভাতা ১,২৫০ থেকে ৩,০০০ এ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি, কৃষকদের বার্ষিক ১১,০০০ টাকা সহায়তার ঘোষণা। প্রতিটি রাজ্যে অর্থায়নের রূপরেখা অনুপস্থিত ছিল।

ভাতার রাজনীতি: আসল বিপদ কোথায়?

ভাতা দেওয়া খারাপ নয়। দারিদ্র্য-বিধ্বস্ত পরিবারের কাছে সরাসরি নগদ সহায়তার বাস্তব মূল্য আছে। সমস্যা হয় যখন এটা পরিকল্পনাহীন ঋণের উপর দাঁড়িয়ে থাকে। পশ্চিমবঙ্গে পরিবারের আর্থিক দায় ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ১০২ শতাংশ বেড়েছে, কিন্তু সম্পদ বেড়েছে মাত্র ৪৮ শতাংশ — অর্থাৎ প্রতি ১ টাকা সঞ্চয়ের বিপরীতে ঋণ বাড়ছে ২ টাকা করে। এই পরিবেশে মাসিক ভাতার টাকা অনেক পরিবারের হাতে পৌঁছালেও দীর্ঘমেয়াদে রাজ্যের ঋণ বৃদ্ধি পরিবারগুলোর উপরই ফিরে আসে — শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বিনিয়োগ কমে, পরিকাঠামো পিছিয়ে পড়ে, কর্মসংস্থান তৈরি হয় না। ভাতা সামাজিক বীমার বিকল্প হতে পারে, কিন্তু উন্নয়নের বিকল্প হতে পারে না।

উপসংহার: বিশ্বাসযোগ্যতার পরীক্ষা

একটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিকে বিশ্বাসযোগ্য করতে হলে তিনটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়: টাকা কোথা থেকে আসবে? কতদিনে কার্যকর হবে? আর আগের একই ধরনের প্রতিশ্রুতি কতটা পালিত হয়েছে? বিজেপির সংকল্প পত্রে এই তিনটি প্রশ্নের কোনোটির সৎ উত্তর নেই। টিএমসিও ভাতার রাজনীতিতে অভিজ্ঞ — লক্ষ্মীর ভাণ্ডার তার প্রমাণ। কিন্তু বিজেপির ঘোষণা সেই একই পথে আরও বড় পদক্ষেপ, আরও বেশি অঙ্কের প্রতিশ্রুতি, আরও কম হিসাব। প্রতিযোগিতামূলক ভাতার এই লড়াইয়ে যে দলই জিতুক, বাংলার সরকারি কোষাগার আরও গভীর সংকটে পড়বে — আর সেই সংকটের দায় শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকেই বহন করতে হবে। ভোটার হিসেবে প্রশ্ন তোলার অধিকার আছে: শুধু কত টাকা দেবে নয়, সেই টাকা আসবে কোথা থেকে?​​​​​​​​​​​​​​​​