Home দৃষ্টিভঙ্গি বিয়ে নয়, একাই সুখী: আমেরিকায় বদলে যাচ্ছে সম্পর্কের সংজ্ঞা

বিয়ে নয়, একাই সুখী: আমেরিকায় বদলে যাচ্ছে সম্পর্কের সংজ্ঞা

একাকীত্বকে বেছে নিচ্ছেন লক্ষ লক্ষ মানুষ—কিন্তু বিয়ের আকাঙ্ক্ষাও পুরোপুরি মুছে যায়নি

0 comments 2 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: ২০২১ সাল। আট বছরের দীর্ঘ সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর টরন্টোর বাসিন্দা ক্লোই বো হঠাৎ এক অদ্ভুত কিন্তু গভীর প্রশ্নের সামনে দাঁড়ালেন—যদি তিনি সারাজীবনের জন্য বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নেন, তবে তাঁর জীবনটা কেমন হবে?

এখন ৩৩ বছর বয়সী ক্লোই তাঁর কুড়ির দশকের বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছেন এক সঙ্গীর সঙ্গে, যিনি পরে তাঁর বাগদত্তা হয়েছিলেন। সম্পর্কটি ছিল স্থায়ী, পরিচিত, নিরাপদ। কিন্তু মহামারির সময় তিনি উপলব্ধি করেন, ভেতরে ভেতরে তিনি সন্তুষ্ট নন। তবুও এতদিন তিনি সম্পর্কটিতে ছিলেন এক গভীর ভয়ের কারণে—যদি শেষ পর্যন্ত একাই থেকে যান?

কিন্তু আজ তাঁর অবস্থান সম্পূর্ণ উল্টো। একা থাকা আর ভয়ের বিষয় নয়, বরং সেটাই তাঁর লক্ষ্য—চিরকালের জন্য। “আমার চেনা কোনও সম্পর্ককেই আমি নিজের জীবনের জন্য চাই না। আমি সম্পর্কের মধ্যে থেকেছি, এখন নিজের দিকে মন দেওয়াটাই বেশি ভালো লাগে,” বলেন ক্লোই। এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার কোনও প্রশ্নই ওঠে না বলে তিনি স্পষ্ট জানান।

পরিসংখ্যান বলছে অন্য কথা

ক্লোই একা নন। আমেরিকায় একক মানুষের সংখ্যা গত কয়েক দশকে ব্যাপকভাবে বেড়েছে। পিউ(pew) রিসার্চ সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে সেখানে ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রায় ১১ কোটি ১০ লক্ষ মানুষ অবিবাহিত, যেখানে ১৯৯০ সালে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ৭ কোটি।

গবেষকদের মধ্যে এখন একটা স্পষ্ট মত তৈরি হয়েছে—বিয়ে শুধু দেরিতে হচ্ছে না, অনেকেই সেটাকে পুরোপুরি বাদ দিচ্ছেন। পিউ-এর গবেষক রিচার্ড ফ্রাই বলেন, “আগে আমরা বুঝতে পারতাম না মানুষ বিয়ে পিছিয়ে দিচ্ছে, না একেবারেই করছে না। এখন পরিষ্কার—অনেকেই বিয়ের ধারণাটাকেই বাদ দিচ্ছে।”

২০১৯ সালে আমেরিকায় বিয়ের হার ১৪০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে নেমে যায়, এবং এখনও তা পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়ায়নি। সাম্প্রতিক কিছুটা বৃদ্ধি মূলত কম ডিভোর্স আর দীর্ঘায়ুর কারণে পুরুষরা বেশি দিন বাঁচছেন, ফলে বিধবা নারীর সংখ্যা তুলনামূলক কম। মহামারির সময় এই প্রবণতা আরও তীব্র হয়েছিল। ২০২১ সালে বিয়ের হার নেমে গিয়েছিল ১৯৭১ সালের পর সবচেয়ে নিচে। যদিও পরে কিছুটা পুনরুদ্ধার হয়েছে, গবেষক ওয়েন্ডি ডি ম্যানিং-এর মতে তা এখন মহামারির আগের স্তরে ফিরে এসেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ইউএস সেন্সাস ব্যুরো জানায়, আমেরিকার মাত্র ৪৭ শতাংশ পরিবারে এখন বিবাহিত দম্পতি থাকে যেখানে ৫০ বছর আগে এই সংখ্যা ছিল ৬৬ শতাংশ।

বিয়ের বিকল্প পথ

এই পরিবর্তনের মধ্যে অনেকেই বিয়ের বিকল্প পথ খুঁজে নিচ্ছেন। একসঙ্গে থাকা অর্থাৎ লিভ-ইন—অনেকের কাছেই এখন যথেষ্ট। অনেক দম্পতি মনে করেন, তাঁরা ইতিমধ্যেই “বিবাহিতের মতো” জীবনযাপন করছেন, তাই আইনি স্বীকৃতির দরকার নেই। আবার কেউ কেউ ভেবেছিলেন বিয়ে করবেন, কিন্তু জীবনের ব্যস্ততায় তা আর হয়ে ওঠেনি।

কলোরাডোর র‍্যাচেল স্কাইওয়ার্ড, বয়স ৪১, তাঁর সঙ্গীর সঙ্গে বাড়ি কিনে থাকেন। তাঁরা বিয়ে বা বাগদানের কোনও পরিকল্পনা করেননি, কিন্তু আইনি সুরক্ষার জন্য প্রিনাপচুয়াল চুক্তি করে রেখেছেন কারণ তাঁদের রাজ্যে সহবাসকেও অনেক সময় আইনিভাবে বিবাহ হিসেবে ধরা হয়। ২০২২ সালে ডিভোর্সের পর তিনি বলেন, “আবার বিয়ে করার কোনও তাড়া নেই।”

সঙ্গী চান, কিন্তু পাচ্ছেন না

অন্যদিকে অনেক নারী বিয়ে করতে চান, কিন্তু সঠিক সঙ্গী না পাওয়ায় হতাশ। “এ সিঙ্গেল সার্ভিং পডকাস্ট”-এর সঞ্চালক শানি সিলভার বলেন, তাঁর অনেক শ্রোতা এমন নারী, যাঁদের ছোটবেলা থেকে শেখানো হয়েছিল যে বিয়ে আর পরিবার তৈরি জীবনের স্বাভাবিক ধাপ। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি। “আমরা বড় হয়েছি এই বিশ্বাস নিয়ে যে সবকিছু সময়মতো ঘটবে। কিন্তু তা হয়নি। এখন আমরা এমন এক ভবিষ্যতের মুখোমুখি, যার কোনও মানচিত্র নেই,” বলেন তিনি।

বহু নারী দীর্ঘদিন ধরে সম্পর্ক খুঁজে ব্যর্থ হয়েছেন। তাঁদের মতে, এটা মানসিকভাবে অত্যন্ত ক্লান্তিকর। সমাজ নারীদের উপর দীর্ঘদিন ধরে চাপ দিয়েছে নিজেদের ‘আদর্শ সঙ্গী’ হিসেবে গড়ে তুলতে কিন্তু পুরুষদের মধ্যে সেই সমান পরিবর্তন ঘটেনি। গৃহস্থালির কাজ, মানসিক দায়িত্ব, সব ক্ষেত্রেই ভারসাম্যহীনতা রয়ে গেছে। শানি সিলভার সরাসরি বলেন, “যদি এমন একজনকে বিয়ে করেন যাকে নিয়ে আপস করতে হয়, তাহলে সেই সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হবে—এটা আমি বিশ্বাস করি না।”

একাকীত্বে লিঙ্গবৈষম্য

এই একাকীত্বের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতেও রয়েছে বৈষম্য। নিজেকে ‘আজীবন অবিবাহিত’ বলে পরিচয় দেওয়া গবেষক পিটার ম্যাকগ্রো বলেন, পুরুষদের ক্ষেত্রে একা থাকাটা ‘কুল’, কিন্তু নারীদের ক্ষেত্রে ‘স্পিনস্টার’ শব্দটি এখনও নেতিবাচক।

তিনি মনে করিয়ে দেন, খুব বেশি দিন আগেও নারীরা স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করতে পারতেন না—ভোটাধিকার, ঋণ নেওয়া—সবকিছুর জন্য পুরুষের উপর নির্ভর করতে হত। এখন সেই প্রয়োজন নেই। তবে এর মানে এই নয় যে সম্পূর্ণ সমতা এসেছে। নারীদের এখনও সামাজিকভাবে শেখানো হয় সম্পর্কের জন্য নিজেদের বদলাতে, কিন্তু পুরুষদের ক্ষেত্রে সেই চাপ অনেক কম। পিটার ম্যাকগ্রো আরও বলেন, বিয়ের ধারণাটাই বদলে গেছে। আগে একজন সঙ্গীর কাছ থেকে সবকিছু প্রত্যাশা করা হত না। এখন সেই একজনকেই হতে হয় সেরা বন্ধু, মানসিক সহায়ক, পেশাগত পরামর্শদাতা—সবকিছু। তাঁর মতে, এই চাপ অনেকের কাছেই অস্বস্তিকর।

জেন জি কোন পথে?

২২ বছর বয়সী আলিয়া রোজ জিনেভ্রা মনে করেন, তাঁর প্রজন্ম জেন জি, ঝুঁকি নিতে অনিচ্ছুক। তাঁরা দেরিতে গাড়ি চালানো শেখেন, ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ কম করেন—এই প্রবণতা বিয়ের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে। তবে একই সঙ্গে আরেকটি প্রবণতাও আছে—ডেটিং সংস্কৃতির ক্লান্তি থেকে অনেকেই স্থায়ী সম্পর্কের আকাঙ্ক্ষা অনুভব করছেন। আলিয়া নিজে বিয়ে করতে চান, তবে সেইসঙ্গে প্রস্তুত থাকছেন—যদি তা না-ও হয়। অর্থনৈতিক বাস্তবতাও এখানে বড় ভূমিকা রাখছে বলে তিনি মনে করেন। অনেকেই চান আর্থিকভাবে স্থিতিশীল হয়ে তারপর বিয়ে করতে—কিন্তু সেই স্থিতি অর্জন করতে এখন অনেক বেশি সময় লাগছে।

বিয়ে এখনও প্রাসঙ্গিক

তবে গবেষকরা মনে করেন, এই সমস্ত পরিবর্তন সত্ত্বেও বিয়ে এখনও সমাজে গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই বিয়েকে মূল্য দেন বলেই দেরিতে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন—যখন তাঁরা প্রস্তুত। আজকের দিনে এক-তৃতীয়াংশ বিয়েতে অন্তত একজন সঙ্গীর আগেও বিয়ে হয়েছে—যা প্রমাণ করে, মানুষ বিয়েকে এখনও গুরুত্ব দেয়। ওয়েন্ডি ডি ম্যানিং বলেন, “বেশিরভাগ মানুষ এখনও বিয়ে করতে চান এবং আশা করেন যে তাঁরা কোনও এক সময়ে বিয়ে করবেন। আমেরিকায় বিয়ের প্রতি আগ্রহ এখনও প্রবল।”

গল্পটা তাই সরল নয়। একদিকে একা থাকার আত্মবিশ্বাস বাড়ছে, অন্যদিকে বিয়ের আকাঙ্ক্ষাও পুরোপুরি মুছে যায়নি। আধুনিক জীবনের এই দ্বৈত বাস্তবতাই আজকের সমাজের এক জটিল কিন্তু সত্য প্রতিচ্ছবি।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles