Home খবর মমতার ‘অ্যাজেন্ডা ক্যাপচার’ কৌশলে চাপে বিজেপি

মমতার ‘অ্যাজেন্ডা ক্যাপচার’ কৌশলে চাপে বিজেপি

Authored By পার্বণ
87 views 3 minutes read
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে কৌশলগত লড়াইয়ে এই মুহূর্তে সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্নটি হল—মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুচিন্তিত ন্যারেটিভ কৌশলের ফাঁদে বিজেপি কি আদৌ পা দিয়েছে?  এই প্রশ্নের উত্তর সরল নয়, কিন্তু ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, অন্তত আংশিকভাবে বিজেপি সেই ফাঁদের ভেতরে ঢুকে পড়েছে এবং সেটিই এই নির্বাচনের এক বড় কৌশলগত মোড়।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই নির্বাচনে প্রয়োগ করেছেন একটি “ইস্যু সাবস্টিটিউশন স্ট্র্যাটেজি”। এই কৌশলে তিনি নির্বাচনের কেন্দ্রীয় আলোচনাকে ইচ্ছাকৃতভাবে ঘুরিয়ে দিয়েছেন SIR এবং ভোটার তালিকা সংশোধনের মতো একটি উচ্চ-আবেগপ্রবণ বিষয়ের দিকে। এই ইস্যু সরাসরি ভোটারের অস্তিত্ব ও অধিকারকে স্পর্শ করে, ফলে তা দ্রুত রাজনৈতিক মেরুকরণ ঘটাতে সক্ষম।

এর বিপরীতে বিজেপির মূল আক্রমণের জায়গা ছিল গত পনেরো বছরের শাসনের ব্যর্থতা—দুর্নীতি, কর্মসংস্থান সংকট, শিল্পহীনতা এবং প্রশাসনিক পক্ষপাতিত্ব। অর্থাৎ, গভর্ন্যান্স ক্রিটিক ছিল বিজেপির স্বাভাবিক সুবিধাজনক ক্ষেত্র। কিন্তু মমতার কৌশল সেই ক্ষেত্রটিকেই কার্যত সরিয়ে দিয়েছে।

তবে এটাকে নিছক “ফাঁদে পা দেওয়া” বললে বিশ্লেষণ অসম্পূর্ণ থাকবে। কারণ বিজেপির সামনে বিকল্পও খুব সীমিত ছিল। প্রথম ধাক্কাটি খায় বিজেপি ঠিক এখানেই। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার অভিযোগ বড় আকার নিলে সেটিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা রাজনৈতিকভাবে আত্মঘাতী হতো। তাই বিজেপি বাধ্য হয় নিজেদের প্রচারের ফোকাস বদলাতে। SIR নিয়ে অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা, ভোটার তালিকার নিরপেক্ষতা, এই সব প্রশ্নে তারা সরাসরি প্রতিক্রিয়া দিতে শুরু করে। তারা এক দ্বৈত সংকটে পড়ে যায়—একদিকে এই ইস্যুতে কথা বলতে হবে, অন্যদিকে এটিকে কেন্দ্রীয় ইস্যুতে পরিণত হতে দেওয়া যাবে না। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এই ভারসাম্য তারা পুরোপুরি রক্ষা করতে পারেনি।

মমতার ন্যারেটিভ কৌশল আরও গভীরভাবে কাজ করছে এই কারণে যে, বিজেপি যাই বলুক না কেন, তা তাঁর তৈরি করা ফ্রেমের ভেতরেই পড়ে যাচ্ছে। বিজেপি যদি SIR নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তাহলে তারা কার্যত মমতার তোলা ইস্যুকেই বৈধতা দিচ্ছে। আবার যদি এটিকে তুচ্ছ করে, তাহলে তারা এমন একটি সংবেদনশীল বিষয়ে উদাসীন বলে চিহ্নিত হওয়ার ঝুঁকি নিচ্ছে। সহজ কথায়, খেলার নিয়মটাই নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে এবং বিজেপি সেই নিয়ম মেনেই খেলতে বাধ্য হচ্ছে।

তবে এই চিত্রের আরেকটি দিকও রয়েছে। বিজেপি সম্পূর্ণভাবে নিজেদের মূল আক্রমণের জায়গা ছেড়ে দেয়নি। তারা এখনও দুর্নীতি, বিশেষ করে শিক্ষা নিয়োগ কেলেঙ্কারি এবং প্রশাসনিক পক্ষপাতিত্বের বিষয়গুলি সামনে আনছে। কিন্তু মিডিয়া, সামাজিক মাধ্যম এবং রাজনৈতিক বক্তব্য, সব জায়গাতেই SIR এবং ভোটাধিকার প্রশ্নটি বেশি জায়গা দখল করে নেওয়ায় বিজেপির আক্রমণগুলি তুলনামূলকভাবে কম দৃশ্যমান হয়ে পড়ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই পরিস্থিতিকে বলছেন “অ্যাজেন্ডা ক্যাপচার” যেখানে একটি দল পুরো নির্বাচনী আলোচনার এজেন্ডা নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই কাজটি করতে পেরেছেন বলে তাঁরা মনে করছেন, এবং বিজেপি সেই এজেন্ডার বাইরে গিয়ে আলাদা করে আলোচনার কেন্দ্র তৈরি করতে এখনও পুরোপুরি সফল হয়নি।

তবে বিশ্লেষকরা এটাও মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, এটি চূড়ান্তভাবে বিজেপির পরাজয় নির্দেশ করে না। ন্যারেটিভের লড়াই এবং ভোটের ফলাফল সবসময় এক জিনিস নয়। অনেক সময় ভোটাররা প্রকাশ্যে যে ইস্যু নিয়ে আলোচনা করেন, ভোটের সময় অন্য বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেন। বিজেপি যদি শেষ পর্যন্ত ভোটারদের মনে শাসনের ব্যর্থতার প্রশ্নটিকে জীবিত রাখতে পারে, তাহলে তারা এই ন্যারেটিভ ফাঁদ থেকে আংশিকভাবে বেরিয়ে আসতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে স্পষ্ট যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় খেলার প্রথম পর্বে এগিয়ে আছেন। তিনি সফলভাবে আলোচনার কেন্দ্র বদলে দিয়েছেন এবং বিজেপিকে প্রতিক্রিয়াশীল অবস্থানে ঠেলে দিয়েছেন। বিজেপি পাল্টা আক্রমণ করছে, কিন্তু সেটি অনেকাংশেই প্রতিরক্ষামূলক কাঠামোর ভেতরে আটকে যাচ্ছে।

শেষ পর্যন্ত এই নির্বাচনের ফলাফল নির্ভর করবে একটাই প্রশ্নের উত্তরে—ভোটারের মনে কোন প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে? “আমার ভোটাধিকার নিরাপদ কি না”, নাকি “এই সরকার আমাকে কী দিয়েছে বা দেয়নি?” প্রথম প্রশ্নটি প্রাধান্য পেলে মমতার কৌশল কার্যকর হবে। দ্বিতীয়টি সামনে এলে বিজেপি তাদের হারানো মাটি ফিরে পেতে পারে। এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই এগিয়ে চলেছে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles