Home খবর ইরানের পাহাড়ে ৩৬ ঘণ্টা: আহত মার্কিন পাইলটের বেঁচে ফেরার কাহিনি

ইরানের পাহাড়ে ৩৬ ঘণ্টা: আহত মার্কিন পাইলটের বেঁচে ফেরার কাহিনি

0 comments 121 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: ইরানের আকাশে তখন আগুন জ্বলছিল। মিসাইল আর অ্যান্টি-এয়ারক্রাফ্ট ফায়ারের মধ্য দিয়ে ছুটে চলা একটি মার্কিন F-15E যুদ্ধবিমান হঠাৎ আঘাত পেয়ে কেঁপে ওঠে। ককপিটে বেজে ওঠে অ্যালার্ম। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হয় — বাঁচতে হলে এখনই বেরোতে হবে। পাইলট এবং তাঁর সঙ্গী ইজেক্ট করেন। আকাশে ভেসে নামতে নামতেই তাঁরা বুঝতে পারেন, নিচে অপেক্ষা করছে শত্রু ভূখণ্ড। নামার পর থেকেই শুরু হয় সময়ের বিরুদ্ধে এক অসম লড়াই।

পাইলটকে তুলনামূলকভাবে দ্রুত উদ্ধার করা গেলেও তাঁর সঙ্গীর ভাগ্যে জোটে ভয়াবহ এক বাস্তবতা। তিনি পড়েন ইরানের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে, যেখানে প্রতিটি পাথর, প্রতিটি গিরিখাত তাঁর জন্য সম্ভাব্য মৃত্যুফাঁদ।

মাটিতে পড়েই তিনি বুঝে যান, আহত শরীর নিয়ে যতক্ষণ সেখানে থাকবেন ততক্ষণ বিপদ কেবল বাড়বে। দাঁড়াবার মতো শক্তি না থাকলেও তিনি হামাগুড়ি দিয়ে, কখনও পাথর আঁকড়ে, কখনও রক্তাক্ত পা টেনে টেনে উপরের দিকে উঠতে শুরু করেন। এরই মধ্যে নিচে ছড়িয়ে পড়ে খবর — একজন মার্কিন সেনা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন, তাঁকে ধরিয়ে দিলে মিলবে মোটা পুরস্কার। ফলে শুধু সেনাবাহিনী নয়, স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং সাধারণ মানুষও শিকারি হয়ে ওঠে।

প্রায় সাত হাজার ফুট উচ্চতায় উঠে তিনি শেষ পর্যন্ত আশ্রয় নেন একটি সরু পাহাড়ি ফাটলে — এতটাই সংকীর্ণ যে বাইরে থেকে সহজে চোখে পড়ে না। সেখানেই তিনি নিজেকে গুটিয়ে ফেলেন। দিনের বেলা নিঃশ্বাস আটকে থাকেন, রাতে সামান্য নড়াচড়া করেন। চারপাশে মাঝেমাঝে শোনা যায় লোকজনের হাঁকডাক, খোঁজার শব্দ, পাথরে পায়ের আওয়াজ। তিনি জানেন একবার ধরা পড়লেই সব শেষ।

তৃষ্ণা, ব্যথা আর আতঙ্ক একসঙ্গে শরীরকে গ্রাস করতে থাকে। কিন্তু তাঁর প্রশিক্ষণ তাঁকে ভেঙে পড়তে দেয় না। সুযোগ বুঝে তিনি একটি জরুরি বীকন চালু করেন অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য, যাতে সিগন্যাল ধরা পড়ে কিন্তু শত্রুর হাতে ধরা না পড়েন তিনি। সেই ক্ষুদ্র সংকেতই হাজার মাইল দূরে বসে থাকা মার্কিন কমান্ডকে জানিয়ে দেয় তিনি এখনও বেঁচে আছেন।

তখনই শুরু হয় আরেকটি যুদ্ধ যা বন্দুক দিয়ে নয়, বুদ্ধি দিয়ে লড়া হয়। গোয়েন্দারা দ্রুত বুঝে যান, সরাসরি গিয়ে তুলে আনা সম্ভব নয়, আগে শত্রুকে ভুল পথে চালিত করতে হবে। তাই ইরানের ভেতরে ইচ্ছাকৃতভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয় একটি মিথ্যা খবর — মার্কিন সেনাকে নাকি ইতিমধ্যেই উদ্ধার করে অন্য পথে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এই তথ্য দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে এবং খোঁজের বড় অংশ সরে যায় অন্য দিকে। ঠিক এই ফাঁকটিরই দরকার ছিল।

রাত নামতেই শুরু হয় প্রকৃত উদ্ধার অভিযান। একশোরও বেশি বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কমান্ডো নিঃশব্দে সীমান্ত পেরিয়ে ঢুকে পড়েন। আকাশে ড্রোন নজর রাখছে, রেডিও সিগন্যাল জ্যাম করা হচ্ছে, রাস্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশে আঘাত হেনে শত্রুর গতি কমানো হচ্ছে — সবকিছু যেন দাবার বোর্ডে একের পর এক সুনির্দিষ্ট চাল। কিন্তু বাস্তব যুদ্ধ কখনও পুরোপুরি পরিকল্পনা মেনে চলে না। হঠাৎ করেই দুটি পরিবহন বিমান বিকল হয়ে যায়, একটি হেলিকপ্টার গুলির আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কয়েক মুহূর্তের জন্য মনে হয় পুরো অপারেশনটাই  ব্যার্থ হবে। তবে সেই মুহূর্তেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় পিছু হটা নয়, ঝুঁকি বাড়িয়ে এগোনো। দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা করা হয়, ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে নতুন বিমান আনা হয়, আর অভিযান অব্যাহত থাকে।

অবশেষে কমান্ডোরা পৌঁছান সেই পাহাড়ি অঞ্চলে, যেখানে অন্ধকারে লুকিয়ে আছেন সেই একাকী মানুষটি। চারপাশে নিস্তব্ধতা, কেবল ঠান্ডা হাওয়া আর দূরের ক্ষীণ শব্দ। ফাটলের ভেতরে তিনি অপেক্ষা করছেন সম্ভবত শেষ শক্তিটুকু দিয়ে। কমান্ডোরা প্রথমে সতর্কভাবে পরিচয় যাচাই করেন, কারণ শত্রু ফাঁদ পাততে পারে। সবকিছু মিলিয়ে নেওয়ার পর যখন নিশ্চিত হওয়া যায়, তখনই তাঁকে তুলে নেওয়া হয় — প্রায় অচেতন শরীর, কিন্তু জীবিত।

ফেরার পথও নিরাপদ ছিল না। তবে এবার সময়ের বিরুদ্ধে দৌড় শুরু হয়ে গেছে। ধাপে ধাপে দলগুলো বেরিয়ে আসে। যেসব বিমান বিকল হয়েছিল সেগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হয়, যাতে শত্রুর হাতে সামরিক প্রযুক্তি না যায়। আকাশে আর মাটিতে তখনও খোঁজ চলছে, কিন্তু দলটি ফাঁক গলে বেরিয়ে আসে, সীমান্ত পেরিয়ে নিরাপদ অঞ্চলে পৌঁছায়। সেখান থেকে আহত অফিসারকে দ্রুত চিকিৎসার জন্য সরিয়ে নেওয়া হয়। প্রায় ছত্রিশ ঘণ্টা পাহাড়ের ফাটলে লুকিয়ে থাকা, চারদিক থেকে শিকার হওয়া এক মানুষ অবশেষে ফিরে আসেন নিজের দেশে।

এই পুরো ঘটনা শেষ পর্যন্ত প্রমাণ করে, যুদ্ধ শুধু অস্ত্রের শক্তিতে জেতা যায় না, জেতা যায় ধৈর্য, প্রশিক্ষণ আর ঠান্ডা মাথায় নেওয়া সিদ্ধান্ত দিয়ে। একদিকে ছিলেন একা, আহত, লুকিয়ে থাকা একজন মানুষ। অন্যদিকে ছিল গোটা রাষ্ট্রযন্ত্র। কিন্তু এই দুইয়ের মাঝখানে যে সুতোটা তাঁকে বাঁচিয়ে রাখল, সেটা ছিল তাঁর অদম্য বেঁচে থাকার ইচ্ছা আর নিখুঁতভাবে পরিকল্পিত এক দুঃসাহসিক উদ্ধার অভিযান।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles