বাংলার রাজনীতিতে “বহিরাগত” শব্দটা আজ আর অভিধানের নয়—এটা কৌশলের ভাষা। এর কোনো স্থির সংজ্ঞা নেই, কোনো নীতিগত ভিত্তি নেই। বরং এটি সম্পূর্ণ প্রয়োগনির্ভর। আপনি কোন দলে, কার পক্ষে, কোন নির্বাচনে দাঁড়াচ্ছেন—তার ওপরই নির্ভর করছে আপনি “বাঙালি” না “বহিরাগত”। আর এই দ্বিচারিতার সাম্প্রতিকতম উদাহরণ—লিয়েন্ডার পেজ।
প্রশ্নটা তাই সরাসরি করা যাক। যদি লিয়েন্ডার পেজ বহিরাগত হন, তাহলে ইউসুফ পাঠান কী? কীর্তি আজাদ কী? শত্রুঘ্ন সিনহা কী? এঁরা কি বাঙালি? নাকি তাঁদের ক্ষেত্রে “বহিরাগত” শব্দটা হঠাৎ করেই অদৃশ্য হয়ে যায়?
আসলে সমস্যাটা ভাষা বা ভূগোলের নয়—সমস্যাটা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক। তৃণমূল কংগ্রেসের অভিধানে “বাঙালি” কোনো সাংস্কৃতিক পরিচয় নয়; এটি যেন এক রাজনৈতিক সনদ। যিনি তাঁদের দলে আছেন, তিনি বাঙালি—তিনি বরোদার হোন, বিহারের হোন, দিল্লির হোন, বাংলা জানুন বা না-জানুন—কোনো সমস্যা নেই। তিনি তখন “বাংলার গর্ব”, “বাংলার বন্ধু”, “বাংলার প্রতিনিধি”।
কিন্তু একই ব্যক্তি যদি অন্য দলে যান, মুহূর্তে তাঁর পরিচয় বদলে যায়—তিনি তখন “বহিরাগত”, “বাংলা-বিরোধী”, “বাইরের লোক”।
এই দ্বিচারিতার মধ্যেই রাজনীতির এক কদর্য রূপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
লিয়েন্ডার পেজের জীবনপথের দিকে তাকালেই বিষয়টা আরও পরিষ্কার হয়। কলকাতায় জন্ম, এই শহরেই বড় হওয়া। তাঁর মা জেনিফার পেজ—বাঙালি পরিবার থেকে আসা, যেখানে মাইকেল মধুসূদন দত্তের বংশসূত্রের কথাও বহুবার উঠে এসেছে। তাঁর বাবা ভেস পেজ—ভারতের হকি দলের সদস্য, অলিম্পিয়ান। অর্থাৎ, এই পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেছে।
এমন একজন মানুষকে আপনি রাজনৈতিকভাবে সমালোচনা করতেই পারেন—তাঁর দলবদল, তাঁর অবস্থান, তাঁর অভিজ্ঞতা—সবই প্রশ্নের মুখে তোলা যায়। কিন্তু তাঁকে “বহিরাগত” বলা—এটা শুধু যুক্তির অভাব নয়, ইচ্ছাকৃত বিকৃতি।
অন্যদিকে, আমরা দেখেছি—গুজরাটের ইউসুফ পাঠান বহরমপুরে প্রার্থী হয়ে জয়ী হন, এবং তাঁকে বলা হয় “জনপ্রিয় মুখ”, “তারকা প্রার্থী”, “বাংলার উন্নয়নের সঙ্গী”।
বিহারের কীর্তি আজাদ বর্ধমানে প্রার্থী হন—তাঁকে বলা হয় “অভিজ্ঞ নেতা”।
শত্রুঘ্ন সিনহা—যাঁকে “বিহারি বাবু” বলা হয়—আসানসোলে জয়ী হয়ে ওঠেন “বাংলার কণ্ঠস্বর”।
তখন কোথায় যায় “বহিরাগত” তত্ত্ব? তখন কেন কেউ বলে না—এই মানুষগুলো বাংলার মাটি চেনেন না?
কারণ তখন তাঁরা “আমাদের”।
এই “আমাদের” আর “ওদের” বিভাজনটাই আসল সমস্যা। এখানে পরিচয় কোনো স্থির সত্য নয়; এটি রাজনৈতিকভাবে তৈরি একটি লেবেল। আপনি যদি তৃণমূলের সঙ্গে থাকেন—আপনি বাঙালি। আপনি যদি বিজেপিতে যান—আপনি বহিরাগত। সমীকরণটা এতটাই সরল, আবার এতটাই নির্মম।
এই বাস্তবতার মধ্যে এক অদ্ভুত কৌতুক আছে—যা একই সঙ্গে ভয়ঙ্করও।
বাংলার মতো ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ একটি ভূখণ্ডে “বাঙালিত্ব” আজ এমনভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যেন তা দলীয় সদস্যপদের ওপর নির্ভরশীল। আপনি বাংলা জানেন কি না, এই মাটির ইতিহাস বোঝেন কি না, এখানে বসবাস করেছেন কি না—এসব গৌণ হয়ে গেছে। আসল প্রশ্ন একটাই—আপনি কার পক্ষে?
এই যুক্তি মেনে নিলে, আগামীকাল দক্ষিণ ভারতের কোনো অচেনা শহর থেকে কেউ তৃণমূলে যোগ দিলেই তিনি “বাংলার সন্তান” হয়ে উঠবেন। আর লিয়েন্ডার পেজ—যাঁর জন্ম কলকাতায়, যার পরিবার এই শহরের সঙ্গে প্রজন্মের সম্পর্ক বহন করে—তিনি হঠাৎ “বহিরাগত” হয়ে যাবেন।
এটা রাজনীতি নয়—এটা সরলীকৃত বিভাজনের খেলা।
আরেকটা বিষয় স্পষ্ট করে বলা জরুরি। “বহিরাগত” শব্দের এই ব্যবহার কেবল একজন ব্যক্তিকে আঘাত করে না; এটি বৃহত্তর রাজনৈতিক সংস্কৃতিকেই বিকৃত করে। এটি মানুষকে শেখায়—নীতি নয়, পরিচয় দেখো; কাজ নয়, দল দেখো; যুক্তি নয়, লেবেল দেখো। আর এই প্রবণতা যত বাড়ে, গণতন্ত্র তত দুর্বল হয়।
লিয়েন্ডার পেজের সমালোচনা হোক—কঠোরভাবে হোক। প্রশ্ন উঠুক—কেন তিনি দল বদলালেন, তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান কী, তিনি বাংলার জন্য কী করতে চান।
কিন্তু তাঁকে “বহিরাগত” বলা মানে প্রকৃত বিতর্ক থেকে সরে আসা। এটি সেই সহজ পথ, যেখানে যুক্তির জায়গায় স্লোগান বসানো হয়।
সবশেষে, কথাটা একেবারে স্পষ্ট।
যদি ইউসুফ পাঠান, কীর্তি আজাদ, শত্রুঘ্ন সিনহা—এঁরা “বাংলার প্রতিনিধি” হন, তাহলে লিয়েন্ডার পেজ তাঁদের সবার তুলনায় বহু গুণ বেশি বাঙালি।
আর যদি পেজ বহিরাগত হন, তাহলে একই মানদণ্ডে বাকিদেরও বিচার করতে হবে।
একই মাপকাঠি ছাড়া রাজনীতি হয় না—সেটা হয় সুবিধাবাদ।
আর বাংলার মতো রাজনৈতিকভাবে সচেতন সমাজে, এই সুবিধাবাদ যতবার সামনে আসবে, ততবারই “বহিরাগত” শব্দটা নিজের ওজনেই ভেঙে পড়বে।