Home খবর বদলি বিতর্কে আদালতের সাফ বার্তা: ইসির ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ নয়

বদলি বিতর্কে আদালতের সাফ বার্তা: ইসির ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ নয়

0 comments 12 views
A+A-
Reset

কলকাতা হাই কোর্ট নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে দায়ের করা একটি জনস্বার্থ মামলা খারিজ করে স্পষ্ট করে দিয়েছে—নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে কমিশনের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে আদালত সহজে হস্তক্ষেপ করবে না। আইনজীবী অর্ক কুমার নাগ এই মামলা দায়ের করেছিলেন, যেখানে ১৫ মার্চ নির্বাচনী বিজ্ঞপ্তি জারির পর আইএএস ও আইপিএস আধিকারিকদের ব্যাপক বদলির সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানানো হয়েছিল। কিন্তু আদালতের মতে, এই আবেদন মৌলিকভাবেই ত্রুটিপূর্ণ।

প্রধান বিচারপতি সুজয় পল-এর বেঞ্চ পর্যবেক্ষণ করে জানায়, আবেদনকারী নিজেই স্বীকার করেছেন যে নির্বাচন কমিশনের এই ধরনের বদলি বা স্থানান্তরের ক্ষমতা রয়েছে। তিনি বলেছিলেন, এই ক্ষমতা প্রয়োগে সতর্কতা ও দায়িত্ববোধ থাকা উচিত। আদালতের মতে, এই স্বীকারোক্তিই প্রমাণ করে যে কমিশনের ক্ষমতার অস্তিত্ব নিয়ে আবেদনকারীর কোনো আপত্তি নেই। ফলে পরে সেই ক্ষমতার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ থাকে না।

আদালত আরও স্পষ্ট করে জানায়, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে তারা ‘আপিলের আসন’ গ্রহণ করতে পারে না। শুধুমাত্র তখনই হস্তক্ষেপ সম্ভব, যখন স্পষ্টভাবে স্বেচ্ছাচারিতা, কু-উদ্দেশ্য বা আইনি বিধি লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া যায়। এই মামলায় তেমন কোনো প্রমাণ আদালতের সামনে উপস্থাপিত হয়নি।

অফিসারদের বদলির ক্ষেত্রে কু-উদ্দেশ্যের অভিযোগও আদালত খারিজ করে দেয়। বিচারপতিরা জানান, কেবলমাত্র অনুমান বা অভিযোগের ভিত্তিতে আদালত হস্তক্ষেপ করতে পারে না। নির্বাচন পরিচালনা একটি বিশেষায়িত ক্ষেত্র—এখানে বিচারব্যবস্থার সংযম বজায় রাখা প্রয়োজন বলেও তারা মন্তব্য করেন।

রাজ্য সরকারের তরফে বলা হয়েছিল, এই ব্যাপক বদলির ফলে প্রশাসন কার্যত পঙ্গু হয়ে পড়েছে। কিন্তু আদালত এই যুক্তি গ্রহণ করেনি। তাদের মতে, প্রত্যেক বদলির সঙ্গে সঙ্গেই নতুন আধিকারিক নিয়োগ করা হয়েছে, ফলে প্রশাসনে কোনো অচলাবস্থা তৈরি হয়নি। শুধু বদলি হয়েছে বলেই সরকার অকার্যকর হয়ে পড়েছে—এই দাবি গ্রহণযোগ্য নয়।

পশ্চিমবঙ্গকে আলাদাভাবে নিশানা করা হয়েছে—এই অভিযোগও আদালত নাকচ করে দেয়। সর্বভারতীয় তথ্য খতিয়ে দেখে তারা জানায়, অন্যান্য রাজ্যে বদলির সংখ্যা আরও বেশি। ফলে বৈষম্য বা প্রতিহিংসার অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই।

এছাড়া, আবেদনকারী যেভাবে রাজ্য ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যে হওয়া গোপন যোগাযোগের নথি ব্যবহার করেছেন, তা নিয়েও আদালত উদ্বেগ প্রকাশ করে। বিচারপতিরা প্রশ্ন তোলেন, এই নথি তাঁর কাছে এল কীভাবে, এবং ইঙ্গিত দেন—এই মামলা জনস্বার্থের চেয়ে অন্য কোনো উদ্দেশ্যে দায়ের হয়ে থাকতে পারে।

আইনের বিভিন্ন ধারা—যেমন ১৩সিসি, ২০এ, ২০বি বা ২৮এ—নিয়ে যে যুক্তি তুলে ধরা হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজন আদালত অনুভব করেনি। কারণ, আবেদনপত্রে কমিশনের ক্ষমতার বিরুদ্ধে মৌলিক চ্যালেঞ্জই অনুপস্থিত ছিল।

সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদের প্রসঙ্গ টেনে আদালত পুনরায় জানায়, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশনের হাতে বিস্তৃত ক্ষমতা রয়েছে। ‘মোহিন্দর সিং গিল’ মামলার উল্লেখ করে বলা হয়, আইন নীরব থাকলে এই অনুচ্ছেদ পূর্ণ শক্তিতে কার্যকর হয়। শুধুমাত্র অনেক সংখ্যক আধিকারিক বদলি হয়েছে বলেই তা স্বেচ্ছাচারী—এমন বলা যায় না।

জনস্বার্থ মামলার গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও আদালত প্রশ্ন তোলে। ‘এস. পি. গুপ্তা’ মামলার রায় উল্লেখ করে তারা জানায়, পিআইএল টিকিয়ে রাখতে হলে প্রকৃত জনক্ষতির প্রমাণ প্রয়োজন। এই ক্ষেত্রে আবেদনকারী, যিনি ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত নন, তা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন।

আদালত আরও মনে করিয়ে দেয়, বদলি চাকরির একটি স্বাভাবিক অংশ। যেসব আধিকারিক ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত মনে করেন, তারা আলাদাভাবে আইনি চ্যালেঞ্জ করতে পারেন—এই রায় সেই পথ বন্ধ করছে না।

শেষ পর্যন্ত আদালত এই মামলাকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে খারিজ করে দেয় এবং জোর দিয়ে জানায়—নির্বাচন পরিচালনার সময়ে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কমিশনের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রবণতার বিরুদ্ধে এই রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles