খবর

ভোটের আগে গণহারে বদলিঃ কীভাবে দেখব এই খেলাকে

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • পশ্চিমবঙ্গে ভোট এলেই এক অদ্ভুত নাটক মঞ্চস্থ হয়, এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
  • নির্বাচন কমিশন হঠাৎ করে ডিএম, এসপি, কমিশনার, এমনকি থানার ওসি পর্যন্ত বদলি করে দিচ্ছে, আর শাসক দল চিৎকার করছে!
  • গণতন্ত্র খুন হচ্ছে!” দৃশ্যটা এতটাই পরিচিত যে, মনে হয় যেন স্ক্রিপ্ট আগে থেকেই লেখা।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

পশ্চিমবঙ্গে ভোট এলেই এক অদ্ভুত নাটক মঞ্চস্থ হয়, এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। নির্বাচন কমিশন হঠাৎ করে ডিএম, এসপি, কমিশনার, এমনকি থানার ওসি পর্যন্ত বদলি করে দিচ্ছে, আর শাসক দল চিৎকার করছে! “চক্রান্ত! গণতন্ত্র খুন হচ্ছে!” দৃশ্যটা এতটাই পরিচিত যে, মনে হয় যেন স্ক্রিপ্ট আগে থেকেই লেখা। কমিশন তার সাংবিধানিক ক্ষমতার দোহাই দিয়ে পুরো প্রশাসনিক কাঠামো ঝাঁকিয়ে দিচ্ছে, আর মমতা বলছেন এটা বিজেপি-কমিশনের  হাতিয়ার।

 

কিন্তু সমস্যাটা একটু গভীরে। কারণ এই ক্ষোভটা তখনই বিশ্বাসযোগ্য শোনায় যখন ধরে নেওয়া যায় যে এতদিন প্রশাসন ছিল নিরপেক্ষ, নির্লিপ্ত, নিখুঁতভাবে পেশাদার। বাস্তব অভিজ্ঞতা কিন্তু অন্য কথা বলে। পশ্চিমবঙ্গের ভোট মানেই বহু বছর ধরে একটা নির্দিষ্ট “ইকোসিস্টেম”—যেখানে স্থানীয় পুলিশ, ব্লক প্রশাসন, এবং নিচুতলার আমলারা শুধু প্রশাসনিক কর্মচারী নন, বরং বাস্তবে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হয়ে ওঠেন। বুথের বাইরে কে দাঁড়াবে, কে ঢুকতে পারবে, কোথায় টেনশন তৈরি হবে আর কোথায় “শান্তিপূর্ণ ভোট” হবে,এই সূক্ষ্ম নিয়ন্ত্রণের ভিতরেই তো নির্বাচন জেতার অঙ্ক লুকিয়ে থাকে।

 

এই বাস্তবতা নতুন নয়। উদাহরণস্বরূপ ২০১৮ এবং ২০২৩-এর পঞ্চায়েত ভোটের কথা ধরা যাক যেখানে অসংখ‍্য বিরোধী প্রার্থীকে মনোনয়নপত্র পর্যন্ত জমা দিতে দেওয়া হয়নি।কিংবা ২০২১ সালের বিধানসভা ভোট পরবর্তী হিংসা।এর কোনওটাই বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়  ঘটনা শুধু বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং শাসকের হাতে যত্নে তৈরি হওয়া একটি নির্বাচনী কাঠামোর অবিচ্ছেদ‍্য অংশ।অর্থাৎ ভোটের সময় পুলিশ ও নীচুতলার আমলাতন্ত্র তৃণমূলের ক্যাডার অথবা হার্মাদের মতো আচরণ করে। একটি দীর্ঘদিনের অভিযোগের অংশ,  এই অভিযোগ বিরোধীদের মুখে যেমন শোনা যায়, তেমনি রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কাছেও এটি একটি পরিচিত থিম।

 

এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচন কমিশনের এবারের গণহারে বদলি,যা অনেকেই “অভূতপূর্ব” বলছেন,আসলে একধরনের কঠোর বার্তা। যেন কমিশন বলছে: “আমরা জানি, এই ব্যবস্থার ভেতরে কীভাবে খেলা চলে।” তাই এবার আগাম সেই খেলার মাটিটাই বদলে দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় নেটওয়ার্ক ভেঙে দিয়ে, পরিচিত অফিসারদের সরিয়ে দিয়ে, প্রশাসনিক ধারাবাহিকতার দফারফা করে কমিশন যেন বাংলার শাসক দলকে স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে, বারবার ঘুঘুকে ধান খেতে দেওয়া হবেনা।

 

এখানেই আসে সেই তীর্যক সত্য—যেটা অনেকেই মুখে বলবেন না, কিন্তু মনে মনে স্বীকার করেন: শেঠ শাঠ‍্যং সমাচরেৎ।কারণ যদি দীর্ঘদিন ধরে একটি রাজনৈতিক দল প্রশাসনিক যন্ত্রকে নিজের সুবিধামতো ব্যবহার করে থাকে, তাহলে একদিন সেই যন্ত্রটাই যখন বাইরে থেকে পুনর্গঠিত হবে, তখন সেটাকে “চক্রান্ত” বলা কতটা বিশ্বাসযোগ্য? বরং এটাকে বলা যেতে পারে ধর্মের কল বাতাসে নড়া।

 

তবে এটাও ঠিক, এই গণ-অপসারণের উদ‍্যোগের মধ‍্যেও যে  সমস্যা নেই, তা নয়। এত ব্যাপক বদলি প্রশাসনিক দক্ষতাকে আঘাত করে,নতুন অফিসাররা স্থানীয় বাস্তবতা বোঝার আগেই ভোট এসে যায়। ফলে একধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়, যা কখনও কখনও উল্টো ফলও দিতে পারে। অর্থাৎ নিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠার প্রয়াস নিজেই একধরনের প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা তৈরি করে।

 

কিন্তু রাজনৈতিকভাবে এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় পরিহাস হোল যে দল এতদিন প্রশাসনের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত, তারাই এখন প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে সবচেয়ে জোরে প্রতিবাদ করছে। যেন বহুদিন ধরে ব্যবহৃত এক যন্ত্র হঠাৎ করে নিজের মালিকানা বদলে ফেলেছে, আর পুরনো মালিক সেটাকে “অন্যায়” বলছেন।

 

শেষ পর্যন্ত বিষয়টা দাঁড়ায় একেবারে খোলামেলা এক বাস্তবতা। পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন শুধু ভোট নয়, এটি নিয়ন্ত্রণের খেলা, ভোটের মাঠ, ভোটের ভাষ‍্য, প্রশাসন, সব কিছুর ওপর নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ। আর যখন সেই নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ার এক বড় অংশ নির্বাচন কমিশন নিজের হাতে তুলে নেয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই ক্ষমতাসীনদের অস্বস্তি বাড়ে।

 

এবং সেই অস্বস্তির মধ্যেই লুকিয়ে আছে এই ঘটনার প্রকৃত তাৎপর্য গণতন্ত্রের লড়াই শুধু ব্যালট বাক্সে হয় না, তা হয় সেই বাক্স গন্তব‍্য পর্যন্ত পৌঁছন এবং গননার প্রক্রিয়াটিকে কে কতটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে, তার ওপরও।

 

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

বিষয়:
লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

পার্বণ

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles