সুমন চট্টোপাধ্যায়: যে সমাজে বুদ্ধিজীবীরা দু’ ভাগে ভাগ হয়ে যায়—একদল উচ্চকণ্ঠ স্তাবক, আরেকদল নীরব দর্শক—সেই সমাজে সত্য নিজে থেকে সামনে আসে না। সেখানে সত্যকে তৈরি করা হয়। গড়া হয়। ছাঁটা হয়। সাজানো হয়।
অর্থাৎ সেখানে তৈরি হয়, ন্যারেটিভ।
ন্যারেটিভ মানে শুধু গল্প নয়; এটি একটি ফ্রেম। একটি ব্যাখ্যার কাঠামো। আপনি কোনও ঘটনাকে কীভাবে দেখবেন, কোন দিকটি গুরুত্ব পাবেন, কোন দিকটি অদৃশ্য হয়ে যাবে, এই সবকিছুই নির্ধারণ করে ন্যারেটিভ।
এই ন্যারেটিভ তৈরি করার কাজটি কোনও একক ব্যক্তি করে না। এটি একটি সমষ্টিগত প্রক্রিয়া—যেখানে রাজনীতি, মিডিয়া, এবং বুদ্ধিজীবী সমাজ একসঙ্গে কাজ করে।
এই প্রক্রিয়াটিকে যদি আমরা একটু খোলসা করে দেখি, তাহলে বোঝা যাবে—এটি প্রায় একটি “কারখানা”-র মতো কাজ করে।
প্রথম ধাপ—ঘটনা নির্বাচন।
সব ঘটনা সমান গুরুত্ব পায় না। কোনও একটি ঘটনার উপর আলো ফেলা হবে, আর কোনও একটি ঘটনাকে প্রায় সম্পূর্ণ অদৃশ্য রাখা হবে, এই সিদ্ধান্তটাই প্রথম ধাপ।
এখানে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তারা ঠিক করেন, কোন বিষয় নিয়ে লিখবেন, কোন বিষয় নিয়ে বলবেন, কোন বিষয় নিয়ে নীরব থাকবেন।
এই নির্বাচনটাই অনেক সময় পুরো আলোচনার দিক নির্ধারণ করে দেয়।
দ্বিতীয় ধাপ—ভাষা নির্বাচন।
একই ঘটনাকে আপনি বিভিন্নভাবে বর্ণনা করতে পারেন আপনি বলতে পারেন“বিক্ষোভ”।অথবা “উচ্ছৃঙ্খলতা”। আপনি বলতে পারেন“প্রতিরোধ”।অথবা“বাধা”।
এই শব্দগুলির মধ্যে পার্থক্য শুধু অভিধানের নয়, এটি নৈতিকতার পার্থক্য। যখন কোনও বুদ্ধিজীবী একটি নির্দিষ্ট শব্দ বেছে নেন, তখন তিনি শুধু একটি ভাষাগত সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না; তিনি একটি নৈতিক অবস্থানও নিচ্ছেন। এই ভাষার মাধ্যমেই ন্যারেটিভ ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে।
তৃতীয় ধাপ—প্রসঙ্গ নির্মাণ।
কোনও ঘটনাকে আপনি আলাদা করে দেখাতে পারেন, আবার একটি বৃহত্তর প্রেক্ষাপটের মধ্যে বসিয়েও দেখাতে পারেন।
ধরা যাক, একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। আপনি যদি সেটিকে কেবল একটি স্থানীয় সমস্যা হিসেবে দেখান, তাহলে তার গুরুত্ব কমে যায়। কিন্তু যদি সেটিকে বৃহত্তর রাজনৈতিক বা সাংবিধানিক প্রেক্ষাপটে বসান, তাহলে তার গুরুত্ব বেড়ে যায়।
ন্যারেটিভ তৈরির ক্ষেত্রে এই প্রসঙ্গ নির্মাণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এখানে বুদ্ধিজীবীরা একটি বড় ভূমিকা পালন করেন—কারণ তারা সেই প্রেক্ষাপটটি তৈরি করতে পারেন।
চতুর্থ ধাপ—পুনরাবৃত্তি।
একটি কথা একবার বলা হলে তা মতামত।
একটি কথা বারবার বলা হলে তা “সত্য” হয়ে ওঠে।
এই পুনরাবৃত্তিই ন্যারেটিভকে শক্তিশালী করে।
যখন একই ধরনের যুক্তি, একই ধরনের ভাষা, একই ধরনের ব্যাখ্যা বিভিন্ন জায়গা থেকে বারবার আসতে থাকে তখন মানুষ সেটিকে স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করতে শুরু করে।
এখানেই তৈরি হয় ইংরেজিতে যাকে বলে “echo chamber”যেখানে একই শব্দ বারবার প্রতিধ্বনিত হয় এবং ভিন্ন শব্দ ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়।
পঞ্চম ধাপ—বিকল্পকে অবৈধ করা।
একটি শক্তিশালী ন্যারেটিভ কখনও শুধু নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে না,এটি বিকল্পকেও দুর্বল করে। যদি কেউ ভিন্নভাবে কথা বলে, তাকে সন্দেহ করা হয়, তাকে আক্রমণ করা হয়, কখনও কখনও তাকে “ভুল” বা “অনৈতিক” বলে চিহ্নিত করা হয়।
ফলে ভিন্নমত প্রকাশ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই পুরো প্রক্রিয়াটির মধ্যে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা অত্যন্ত সূক্ষ্ম, কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা সরাসরি নির্দেশ দেয় না কিন্তু তারা ভাষা দেয়। তারা ফ্রেম তৈরি করে। তারা সেই আবহ তৈরি করে, যেখানে একটি নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা স্বাভাবিক বলে মনে হয়।
এখানেই আসে সবচেয়ে তীর্যক প্রশ্ন—কবিতা, গান, সাহিত্য—এই সব কি তবে ন্যারেটিভের অংশ হয়ে যাচ্ছে?
উত্তরটি অস্বস্তিকর হলেও স্পষ্ট।অনেক ক্ষেত্রেই হ্যাঁ।
কারণ সাহিত্য কেবল ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার প্রকাশ নয় এটি একটি সামাজিক ভাষা। যখন সেই ভাষা একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে মিলে যায়, তখন তা ন্যারেটিভের অংশ হয়ে ওঠে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় খেয়াল করা দরকার—এই প্রক্রিয়াটি সবসময় সচেতন নয়।
অনেক সময় বুদ্ধিজীবীরা নিজেরাই বিশ্বাস করেন তারা সঠিক কাজ করছেন। তারা মনে করেন তারা ন্যায়বিচারের পক্ষে দাঁড়াচ্ছেন, তারা মানবিকতার পক্ষে কথা বলছেন।কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন এই মানবিকতা নির্বাচিত হয়ে ওঠে। যখন কিছু মানুষের জন্য তা জোরালো, আর কিছু মানুষের জন্য তা নীরব।
এই নির্বাচিত মানবিকতাই ন্যারেটিভের মূল চালিকাশক্তি।
এটি এমন একটি কাঠামো তৈরি করে, যেখানে কিছু প্রশ্ন স্বাভাবিক আর কিছু প্রশ্ন “অস্বস্তিকর”।এই অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলিই ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যায়। ফলে আমরা এমন একটি সমাজে পৌঁছে যাই, যেখানে সবকিছু নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি নিয়ে নয়।
এই অবস্থায় সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা কোথায়?
বাস্তবতায়।
কারণ যখন ন্যারেটিভ বাস্তবতাকে ছাপিয়ে যায়, তখন আমরা আর বাস্তবতাকে সরাসরি দেখি না। আমরা সেটিকে একটি নির্দিষ্ট ফ্রেমের মধ্যে দিয়ে দেখি। এই ফ্রেম আমাদের বলে দেয়—কী গুরুত্বপূর্ণ, কী নয়; কে সঠিক, কে ভুল; কোথায় দাঁড়াতে হবে, কোথায় নয়।
এই নির্ভরতা যত বাড়ে, আমাদের স্বাধীন চিন্তার ক্ষমতা তত কমে যায়।
এখানেই ন্যারেটিভের সবচেয়ে বড় সাফল্য। কারণ তখন আর কাউকে কিছু চাপিয়ে দিতে হয় না। মানুষ নিজেই সেই কাঠামোর মধ্যে চিন্তা করতে শুরু করে।
আজকের বাংলা মিডিয়া, কাগজ অথবা টেলিভিশন আজ এই ন্যারেটিভ তৈরির সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র হয়ে উঠেছে। জীবনের জ্বলন্ত সম্যাবলীর দিকে তাদের দৃকপাত করার সময় নেই, যা বলে গেলে শাসক অথবা বিরোধীদের নির্মিত ন্যারেটিভ আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা যায়, জ্ঞানে অথবা অজ্ঞানে তারা একমাত্র সেই কাজেই মগ্ন। ফলে তলিয়ে দেখা দরকার কীভাবে এই পুরো প্রক্রিয়াটি একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক ইকোসিস্টেমের মধ্যে কাজ করে—মিডিয়া, মঞ্চ, পুরস্কার, এবং প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা ।
কারণ কোনও ন্যারেটিভ একা তৈরি হয় না, এটি একটি পুরো ব্যবস্থার ফল।
চলবে…