Home দৃষ্টিভঙ্গি স্বাধীন চিন্তার ভ্রম

স্বাধীন চিন্তার ভ্রম

যখন অ্যালগরিদম ঠিক করে দেয় তোমার মত

by Shibangi Bose
0 comments 12 views
A+A-
Reset

সোশ্যাল মিডিয়ায় একটু বেশি সময় কাটালেই একটা প্যাটার্ন চোখে পড়ে।

হঠাৎ একটা ব্রেকিং নিউজ এলো—সুপ্রিম কোর্টের কোনো জটিল রায়, মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে নতুন বৈজ্ঞানিক গবেষণা, বা এমন কোনো সেলিব্রিটি কেলেঙ্কারি যার নামও এক ঘণ্টা আগে বেশিরভাগ মানুষ জানত না।

কিন্তু মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই সবার মতামত তৈরি। তাও এমন ভরসা নিয়ে বলা হচ্ছে, যেন বছরের পর বছর ধরে বিষয়টা নিয়ে গবেষণা করেছে।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার?
তুমি যদি জানো লোকটা কোন “ট্রাইব”-এর, তার মত কী হবে আগে থেকেই আন্দাজ করা যায়।

প্রগ্রেসিভ টেক কর্মী একরকম বলবে, কনজারভেটিভ অভিভাবক আরেকরকম, লিবার্টারিয়ান অর্থনীতিবিদ তৃতীয়রকম। সবাই নিজের মতের পক্ষে কারণ দেবে। অনেক কারণ। শুনলে যুক্তিযুক্তই লাগে। আর তারা সত্যিই বিশ্বাস করে—এই কারণগুলো তাদের নিজের।

ওরা মিথ্যে বলছে না।

কিন্তু ব্যাপারটা একটু অন্যরকম হতে পারে।

আগে মত, পরে যুক্তি

মনোবিজ্ঞানে একটা ধারণা আছে—কনফ্যাবুলেশন। মানে, আমরা আগে অবচেতনভাবে একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি, তারপর সেটার পক্ষে সুন্দর ব্যাখ্যা বানাই।

স্প্লিট-ব্রেন রোগীদের নিয়ে পরীক্ষায় দেখা গেছে, মস্তিষ্কের এক পাশ কোনো কাজ করায়, আর যখন জিজ্ঞেস করা হয় “কেন করলে?”, তখন তারা এমন যুক্তি দেয় যার সঙ্গে আসল কারণের কোনো সম্পর্কই নেই। মস্তিষ্ক ফাঁক পছন্দ করে না—তাই গল্প বানিয়ে ফাঁক ভরে দেয়।

অনলাইনে প্রায় একই জিনিস হয়।

নতুন কোনো খবর দেখলে আমাদের মাথা খুব দ্রুত একটা হিসেব করে—
“আমার দলে যারা প্রভাবশালী, তারা এ নিয়ে কী ভাবছে?”

অনেক সময় উত্তরটা আগেই টাইমলাইনে ভাসে। না থাকলেও আন্দাজ করা যায়। এতদিনে আমরা নিজেদের গোষ্ঠীর প্যাটার্ন মুখস্থ করে ফেলেছি।

ফলাফল?
মতামত আসে মুহূর্তে।
যুক্তি আসে পরে।

লিবার্টারিয়ান হলে সম্পত্তির অধিকার আর সরকারের বাড়াবাড়ির কথা বলবে।
প্রগ্রেসিভ হলে সিস্টেমিক অসমতা বা ক্ষতি কমানোর যুক্তি দেবে।
কনজারভেটিভ হলে ঐতিহ্য বা সামাজিক স্থিতির কথা তুলবে।

এই যুক্তিগুলো খারাপ না। অনেক সময় ঠিকও হতে পারে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—এগুলো কি সত্যিই বিশ্বাসের আসল কারণ?
নাকি আগেই নেওয়া সিদ্ধান্তের পরের ব্যাখ্যা?

প্যাকেজড মতামত

একটা মজার জিনিস খেয়াল করো—একজন মানুষের একেবারে আলাদা আলাদা ইস্যুতে মতামতগুলোও অদ্ভুতভাবে মিল খায়।

কেন ট্রান্স অ্যাথলিট নিয়ে মতামত কারো অর্থনৈতিক নীতির অবস্থানও বলে দেয়?
কেন পুলিশ ফান্ডিং নিয়ে অবস্থান পারমাণবিক শক্তি নিয়ে মতের সঙ্গে মিল খায়?

এই বিষয়গুলোর মধ্যে সরাসরি কোনো যৌক্তিক সম্পর্ক নেই।
তবু মিল আছে।

সবচেয়ে সহজ ব্যাখ্যা—আমরা আলাদা আলাদা করে ভাবছি না। আমরা একটা “প্যাকেজ” নিচ্ছি। আমাদের ট্রাইব যেসব মত ধরে, সেগুলোর বান্ডেলটাই নিচ্ছি।

তারপর সেটাকে নিজের চিন্তা বলে বিশ্বাস করছি।

চিন্তার ছদ্মবেশে সিগন্যালিং

তা হলে কি সব অনলাইন তর্কই বাজে?

পুরোপুরি না। মাঝে মাঝে মানুষ সত্যিই মত বদলায়—যদিও সেটা বেশিরভাগ সময় প্রাইভেট চ্যাটে হয়, পাবলিক ঝগড়ায় না। কখনও কখনও তাড়াহুড়োর যুক্তির মধ্যেও আসল কোনো বিষয় থাকে।

কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যা দেখি, সেটা হলো ট্রাইবাল সিগন্যালিং—নিজের দলে আছি, এটা দেখানো। বাইরে থেকে মনে হয় গভীর বিশ্লেষণ চলছে। ভেতরে আসলে প্যাটার্ন ম্যাচিং।

একটা নীতি প্রস্তাব এলো। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হাজার হাজার মত বেরিয়ে গেল। প্রায় সবই দাগ কেটে কেটে গোষ্ঠীভাগে পড়ে।

আর সবাই ভাবে—“আমি নিজের মতো ভেবেই এই সিদ্ধান্তে এসেছি।”

এই সত্য নিয়ে কী করবে?

এটা বুঝে গেলে অস্বস্তি লাগে। কারণ কেউই ভাবতে চায় না যে সে শুধু দলের বুলি আওড়াচ্ছে। আমরা সবাই নিজেদের স্বাধীন চিন্তক ভাবতে ভালোবাসি।

তা হলে উপায়?

একটা পথ—সোশ্যাল মিডিয়া ছেড়ে দেওয়া।
আরেকটা পথ—পোস্ট করার আগে একটু থামা, নিজেকে জিজ্ঞেস করা: “আমি কি সত্যিই ভেবেছি, নাকি শুধু রিঅ্যাক্ট করছি?”

কিন্তু এগুলো কঠিন।

হয়তো সবচেয়ে বাস্তবসম্মত কাজ হলো—নিজের মতামত একটু ঢিলে করে ধরা। সব বিষয়ে সঙ্গে সঙ্গে রায় না দেওয়া। মাঝে মাঝে স্বীকার করা—“এই বিষয়টা নিয়ে আমি আসলে খুব বেশি জানি না।”

এই স্বীকারোক্তিটাই হয়তো সবচেয়ে কঠিন।

কারণ সোশ্যাল মিডিয়ার দুনিয়ায় দ্রুত নিশ্চিত হওয়াই সবচেয়ে বড় পুরস্কার।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles