Home দৃষ্টিভঙ্গিমগজাস্ত্রে শান ম্যাগনেশিয়াম: মিরাকেল না মিথ?

ম্যাগনেশিয়াম: মিরাকেল না মিথ?

0 comments 0 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: ম্যাগনেশিয়াম মানবদেহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খনিজ। শরীরের শত শত জৈব-প্রক্রিয়ায় এর ভূমিকা রয়েছে। হৃদস্পন্দন স্বাভাবিক রাখা, রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা এবং রক্তচাপ স্থিতিশীল রাখতে এই খনিজটি সহায়তা করে। পাশাপাশি ডিএনএ ও প্রোটিন তৈরির জন্যও ম্যাগনেশিয়াম অপরিহার্য।

শুধু শারীরিক প্রক্রিয়াতেই নয়, মস্তিষ্কের কার্যক্রমেও এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ম্যাগনেশিয়াম সেরোটোনিন নামের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিউরোকেমিক্যাল তৈরিতে সাহায্য করে। এই রাসায়নিক ঘুম, ক্ষুধা এবং মেজাজ নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা পালন করে।

সাধারণত শরীরের প্রয়োজনীয় ম্যাগনেশিয়ামের বড় অংশই আসে খাদ্য থেকে। শাকপাতা, ডাল, বাদাম, কলা, দুধ এবং পূর্ণ শস্যজাত খাবারে এই খনিজ প্রচুর পরিমাণে থাকে। তবু সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ম্যাগনেশিয়াম সাপ্লিমেন্টের বাজার দ্রুত বেড়েছে। নানা প্রচারক দাবি করেন, এই সাপ্লিমেন্ট ঘুমের মান উন্নত করতে পারে, মানসিক চাপ ও অবসাদ কমাতে সাহায্য করতে পারে, এমনকি হৃদ্‌রোগজনিত সমস্যাতেও কিছু উপকার দিতে পারে।

কিন্তু এই দাবিগুলির পক্ষে বৈজ্ঞানিক গবেষণা আসলে কী বলছে?

ঘুমের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য উপকার

ঘুমের মান উন্নত করতে ম্যাগনেশিয়ামের ভূমিকা নিয়ে সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া গেছে, যদিও সেগুলির বেশির ভাগই ছোট পরিসরে পরিচালিত। ২০২৫ সালের অগাস্টে Nature and Science of Sleep পত্রিকায় প্রকাশিত একটি গবেষণায় খারাপ ঘুমে ভোগা ৬৯ জন অংশগ্রহণকারীকে প্রতি রাতে একটি ম্যাগনেশিয়াম যৌগ খাওয়ানো হয়। চার সপ্তাহ পর দেখা যায়, যাঁরা প্লাসেবো খেয়েছিলেন তাঁদের তুলনায় ম্যাগনেশিয়াম নেওয়া অংশগ্রহণকারীরা সামান্য ভালো ঘুমিয়েছেন। গবেষকেরা মনে করেন, পেশি শিথিল করতে ম্যাগনেশিয়ামের ভূমিকার কারণেই এই উন্নতি হতে পারে। তবে এই উন্নতি সীমিত ছিল—অনিদ্রা সম্পূর্ণ দূর করার মতো নয়।

আরও একটি শিল্পপৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত পরীক্ষায় অপেক্ষাকৃত বিস্তৃত উপকারের ইঙ্গিত মিলেছে। সেখানে ৩৮ জন মার্কিন প্রাপ্তবয়স্ককে প্রতি রাতে এক গ্রাম ম্যাগনেশিয়াম এল-থ্রিওনেট দেওয়া হয়—এটি এমন একটি যৌগ, যা তুলনামূলকভাবে সহজে মস্তিষ্কে শোষিত হয় বলে ধারণা করা হয়। অন্য ৩৮ জনকে দেওয়া হয় প্লাসেবো।

২০২৪ সালে Sleep Medicine: X পত্রিকায় প্রকাশিত এই গবেষণায় দেখা যায়, ম্যাগনেশিয়াম এল-থ্রিওনেট গ্রহণকারীদের গভীর ঘুম এবং REM sleep—দুটিই উন্নত হয়েছে। পাশাপাশি সতর্কতা, শক্তি ও কর্মদক্ষতার সূচকেও তাঁরা উল্লেখযোগ্য ভাবে ভালো স্কোর করেছেন। একটি বিশেষ ফল গবেষকদের নজর কেড়েছে—অংশগ্রহণকারীদের মেজাজও উন্নত হয়েছিল।

অবসাদ কমাতে ভূমিকা

ম্যাগনেশিয়াম কি বিষণ্নতা বা অবসাদ কমাতে সাহায্য করতে পারে? কিছু ছোট গবেষণা সে সম্ভাবনার কথাই বলছে।

২০২৩ সালে Frontiers in Psychiatry পত্রিকায় প্রকাশিত একটি পর্যালোচনায় সাতটি র‌্যান্ডমাইজড ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা হয়। মোট ৩২৫ জন বিষণ্নতায় আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্ক সেখানে অংশ নিয়েছিলেন। দেখা যায়, যাঁদের ম্যাগনেশিয়াম যৌগ দেওয়া হয়েছিল তাঁদের অবসাদের স্কোর পরিসংখ্যানগত ভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হারে কমেছে।

গবেষকদের মতে, ম্যাগনেশিয়াম শরীরে প্রদাহ কমানোর সঙ্গে যুক্ত। পাশাপাশি এটি এমন কিছু এনজাইমের কার্যকলাপ দমন করতে পারে, যেগুলি মানসিক চাপ ও মেজাজজনিত সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করা হয়।

মাইগ্রেন কমাতেও সম্ভাবনা

মাইগ্রেনের ক্ষেত্রেও ম্যাগনেশিয়ামের কিছু উপকার পাওয়া যেতে পারে। এর একটি কারণ হতে পারে, ম্যাগনেশিয়াম মস্তিষ্কে গ্লুটামেটের মতো ব্যথা-সংকেতবাহী রাসায়নিকের অতিরিক্ত সঞ্চালন কমাতে সাহায্য করে।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে Neurological Sciences পত্রিকায় প্রকাশিত চারটি র‌্যান্ডমাইজড কন্ট্রোল্ড ট্রায়ালের একটি পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রতিদিন ১২২ থেকে ৬০০ মিলিগ্রাম ম্যাগনেশিয়াম সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করলে মাইগ্রেনের তীব্রতা কমতে পারে। পাশাপাশি মাসে গড়ে প্রায় আড়াইবার আক্রমণের সংখ্যা কমতেও দেখা গেছে।

হৃদ্‌রোগের ক্ষেত্রে প্রমাণ দুর্বল

তবে হৃদ্‌রোগ সংক্রান্ত উপকারের ক্ষেত্রে প্রমাণ এতটা শক্ত নয়। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, ম্যাগনেশিয়াম সাপ্লিমেন্ট রক্তচাপ কমাতে পারে। কিন্তু এই উপকার মূলত তাঁদের ক্ষেত্রেই স্পষ্ট, যাঁদের আগে থেকেই উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে বা যাঁদের শরীরে ম্যাগনেশিয়ামের ঘাটতি আছে—যাকে হাইপোম্যাগনেসেমিয়া বলা হয়।

স্ট্রোকের ক্ষেত্রেও কিছু পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় বেশি ম্যাগনেশিয়াম গ্রহণের সঙ্গে কম ঝুঁকির সম্পর্ক দেখা গেছে। তবে গবেষকেরা মনে করেন, সেখানে খাদ্যাভ্যাস বা জীবনযাত্রার মতো অন্য কারণও ভূমিকা রাখতে পারে।

খাদ্যই প্রধান উৎস

সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞদের মত, অধিকাংশ মানুষের জন্য সুষম খাদ্য থেকেই পর্যাপ্ত ম্যাগনেশিয়াম পাওয়া সম্ভব। তবে যাঁদের খাদ্যতালিকায় এই খনিজ পর্যাপ্ত পরিমাণে নেই, তাঁদের ক্ষেত্রে সাপ্লিমেন্ট কিছু উপকার দিতে পারে।

২০২৬ সালের ৬ জানুয়ারি নাগাদ করা ম্যাগনেশিয়াম সংক্রান্ত তথ্যপত্রে মার্কিন সংস্থা National Institutes of Health জানিয়েছে, আমেরিকার প্রায় অর্ধেক মানুষ প্রয়োজনের তুলনায় কম ম্যাগনেশিয়াম গ্রহণ করেন। গবেষকদের মতে, অতিমাত্রায় প্রক্রিয়াজাত খাবারের বাড়তি ব্যবহারের কারণেই এই ঘাটতি তৈরি হচ্ছে—কারণ খাদ্য প্রক্রিয়াকরণের সময় ম্যাগনেশিয়ামের বড় অংশই নষ্ট হয়ে যায়।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles