Home DRAFT পশ্চিমবঙ্গ, বঙ্গ, না বাংলা

পশ্চিমবঙ্গ, বঙ্গ, না বাংলা

0 comments 1 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: ২০১১ সালে সর্বসম্মত প্রস্তাব পাশ হোল বিধানসভায়। নাম বদলে “পশ্চিমবঙ্গ”-ই রাখা হোক।  শুধু ইংরেজিটা বাদ গেল, আর তাতেই রাজ্যজুড়ে শুরু হল বিতর্ক।

রাজ্যের নাম “West Bengal” থেকে “পশ্চিমবঙ্গ” করার প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার পর রাজনৈতিক ঐকমত্য যেমন দেখা গেল, তেমনি জনমনে উঠল প্রশ্নের ঢেউ। ১৯ আগস্ট সর্বদলীয় বৈঠকে নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়। এই উদ্দেশ্যে গঠিত দু’সদস্যের কমিটিতে ছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের পার্থ চট্টোপাধ্যায় এবং সিপিআই(এম)-এর সূর্যকান্ত মিশ্র। তাঁদের যুক্তি ছিল পরিষ্কার— “West” শব্দটি ঔপনিবেশিক স্মৃতি বহন করে; অন্যান্য রাজ্য যেমন ব্রিটিশ আমলের ইংরেজি উপসর্গ ঝেড়ে ফেলেছে, তেমনটাই করা উচিত পশ্চিমবঙ্গেরও।

তবে এখানেই বিতর্কের শুরু।

বামফ্রন্টের প্রথম পছন্দ ছিল “বাংলা”। কিন্তু কংগ্রেসের আপত্তির কারণে সেই প্রস্তাব এগোয়নি। আপসের প্রস্তাব হিসেবে আসে “পশ্চিমবঙ্গ”—একটি নাম যা আদতে বহুদিন ধরেই বাংলাভাষায় প্রচলিত। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ব্যক্তিগতভাবে “বঙ্গভূমি” নামটি পছন্দ করলেও সর্বসম্মতির স্বার্থে “পশ্চিমবঙ্গ”-কেই মেনে নেন।

এই ঘটনায় এক ধরনের ঐতিহাসিক বিদ্রূপও আছে। ১৯৯৯ সালে জ্যোতি বসুর মুখ্যমন্ত্রীত্বকালে নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হলে তখন বামেরাই “পশ্চিমবঙ্গ” প্রস্তাব করেছিল, আর কংগ্রেস চেয়েছিল “বাংলা”। কিন্তু তৎকালীন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লালকৃষ্ণ আদবাণী সেই প্রস্তাবে বিশেষ উৎসাহ দেখাননি। যুক্তি ছিল— “বাংলা” নামটি বাংলাদেশের সঙ্গে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।

কিন্তু জনমনে যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হল, তা অনেক বেশি তীব্র।

বিখ্যাত অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “পশ্চিমবঙ্গ আর West Bengal তো একই কথা। প্রকৃতপক্ষে কোনও নামবদলই হল না।” চলচ্চিত্রকার মৃণাল সেনও একই মত প্রকাশ করেন, “পশ্চিম শব্দটা থাকা উচিত নয়। বাংলা বা বঙ্গভূমি হওয়া উচিত ছিল।”

সাধারণ মানুষের আপত্তির যুক্তিও ছিল তীক্ষ্ণ। একদিকে সরকার বলেছিল— নামের আদ্যক্ষর W থেকে P হলে কেন্দ্রীয় বৈঠকে বর্ণানুক্রমিক তালিকায় রাজ্যটির অবস্থান কিছুটা এগোবে। কিন্তু প্রশ্ন উঠল, যদি সেটাই যুক্তি হয়, তবে “বাংলা” কেন নয়? আর “পশ্চিম” শব্দটি রাখার মানে কী, যখন “পূর্ববঙ্গ” নামে এখন আর কোনও ভারতীয় রাজ্য নেই? কেউ কেউ আবার বললেন, সম্পূর্ণ বাংলা নাম হওয়ায় অ-বাংলাভাষী নাগরিকদের উচ্চারণে অসুবিধা হতে পারে।

ইতিহাসবিদ সব্যসাচী ভট্টাচার্য এই নাম পরিবর্তনকে “ঐতিহাসিকভাবে অপ্রাসঙ্গিক” বলে মন্তব্য করেন। তাঁর মতে, পাঞ্জাবের ক্ষেত্রে যেমন “ইস্ট পাঞ্জাব” নামটি দ্রুত ঝরে গিয়েছিল, তেমনি এখানেও বিভক্ত পরিচয় ধরে রাখার প্রয়োজন নেই। তিনি “বঙ্গ” নামটিকেই অধিকতর ঐতিহাসিক ও যথার্থ বলে মনে করেন যা জাতীয় সঙ্গীতে “দ্রাবিড় উৎকল বঙ্গ” হিসেবে স্থান পেয়েছে এবং যার শিকড় প্রাচীন সাহিত্যে।

বঙ্গ নামের ইতিহাস দীর্ঘ ও বহুস্তরীয়। বেদে এর উল্লেখ না থাকলেও পুরাণ ও মহাকাব্যে “বঙ্গ”, “গৌড়”, “পুণ্ড্র”, “সমতট”-এর কথা আছে। রামায়ণ ও মহাভারতে বঙ্গরাজ্যের উল্লেখ পাওয়া যায়। পাল ও সেন যুগে “বঙ্গ” ও “গৌড়” প্রায় সমার্থক হয়ে ওঠে। একাদশ শতকে “বঙ্গলদেশ” শব্দের ব্যবহার দেখা যায়। মুঘল আমলে আবুল ফজল “বঙ্গ” নামের উৎপত্তি নিয়ে উল্লেখ করেন, ‘আল’ নামের উঁচু বাঁধ থেকে “বঙ্গাল” শব্দের উৎপত্তি।

“West Bengal” শব্দবন্ধের জন্ম অবশ্য ব্রিটিশ শাসনের হাতে, ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের সময়। লর্ড কার্জনের প্রশাসনিক বিভাজন রাজনৈতিক অগ্নিস্ফুলিঙ্গে পরিণত হয়েছিল। ১৯১১ সালে বিভাজন রদ হলেও ১৯৪৭ সালে আবার এক ঐতিহাসিক ছেদন ঘটে— পূর্ববঙ্গ হয় পূর্ব পাকিস্তান (পরে বাংলাদেশ), আর পশ্চিম অংশ ভারতীয় ইউনিয়নের রাজ্য “West Bengal” হিসেবে থেকে যায়।

অতএব, বর্তমান নাম পরিবর্তন কার্যত কেবল ইংরেজি সংস্করণটি বাদ দেওয়া। মুখ্যমন্ত্রী বিধানসভায় বলেন, বহু বিতর্কের পর এবার অন্তত একটি ঐকমত্যে পৌঁছানো গেছে, এবং সেটিই চূড়ান্ত।

কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, নাম কি কেবল শব্দ? নাকি নাম এক ঐতিহাসিক স্মৃতি, রাজনৈতিক অবস্থান এবং আত্মপরিচয়ের ভাষা?

“পশ্চিমবঙ্গ” নামটি ঔপনিবেশিক শব্দ মুছে দিলেও, বিভক্তির ইতিহাস কি সত্যিই মুছে গেল? নাকি আমরা কেবল উচ্চারণ বদলালাম, কিন্তু ইতিহাসকে আগের জায়গাতেই রেখে দিলাম?

আপনার কী মনে হয়— নাম পরিবর্তন প্রতীকী রাজনীতি, না কি আত্মপরিচয়ের পুনর্লিখন?

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles