জলবায়ু পরিবর্তনের আলোচনা এখন আর শুধু আবহাওয়া বা তাপমাত্রার বিষয় নয়।
বাংলাস্ফিয়ার: বছরের শেষ দিকে এক ধরনের নীরবতা নেমে আসে। সবকিছু একটু ধীরে চলে, আর সেই বিরতিতেই আমরা এমন চিন্তার মুখোমুখি হই, যেগুলোকে এতদিন এড়িয়ে চলছিলাম। যেন থেমে থাকা সময় আমাদেরকে বাধ্য করে ফিরে তাকাতে—পেছনের দিকে এবং সামনে আসা দিনের দিকে।
তাই স্বাভাবিকভাবেই, আমি শেষ হয়ে যাওয়া বছরটা আর সামনে আসা বছরটা নিয়ে ভাবছিলাম।
আমার নিজের জীবনেও বহু বছর ধরে জলবায়ু পরিবর্তন এমন এক আলোচনার কেন্দ্র হয়ে ছিল, যা আমি বেছে নিইনি, কিন্তু ছাড়তেও পারিনি। পেশা, ভ্রমণ, ব্যক্তিগত কথোপকথন—সব জায়গায় যেন অদৃশ্যভাবে এই বিষয়টি উপস্থিত ছিল। ধীরে ধীরে সেটা শুধু একটি ইস্যু নয়, আমার দৃষ্টিভঙ্গির অংশ হয়ে উঠেছিল।
তারপর, এই বছরের শেষের দিকে এসে বুঝলাম, আমাকে থামতেই হবে।
পৃথিবী অবশ্য উষ্ণ হওয়া বন্ধ করেনি। সংকটও কোথাও যায়নি। কিন্তু “জলবায়ু পরিবর্তন” শব্দটি যেন আর পুরো বাস্তবতাকে ধারণ করতে পারছে না।
এটা অনেকটা এমন, যেন আপনার হাতে একটা মানচিত্র আছে, যেটা একসময় ঠিক ছিল। কিন্তু এখন রাস্তা বদলে গেছে। আপনি যতই মানচিত্র মেনে চলুন, তবুও পথ হারিয়ে ফেলবেন। মানচিত্র মিথ্যা বলছে না কিন্তু বাস্তবের সঙ্গে আর মেলে না।
“জলবায়ু পরিবর্তন” বললেই কী হয়, খেয়াল করুন
হঠাৎ করে চারপাশ ভরে যায় নানা সমাধানের কথায়—কার্বন ক্যাপচার, জিওইঞ্জিনিয়ারিং, টেকসই উন্নয়ন, লক্ষ্য আর গ্রাফ। সমস্যাটাকে এমনভাবে দেখানো হয়, যেন এটা একটা প্রযুক্তিগত সমস্যা, যেটা নতুন যন্ত্র বানিয়ে সমাধান করা যাবে। যেন আমরা একটা মরে যাওয়া শরীরের পাশে দাঁড়িয়ে তর্ক করছি কোন ওষুধ দেব, কিন্তু জিজ্ঞেসই করছি না শরীর খারাপের কারণটা কী।
কারণ আসলে এটা শুধু একটা “সমস্যা” নয়, যেটা ঠিক করে ফেলা যাবে। এটা একটা “অবস্থা”, যেটার সঙ্গে আমাদের মানিয়ে নিতে হবে।
সমস্যার সমাধান থাকে। কিন্তু এমন অবস্থার ফলাফল থাকে।
আমরা যখন “জলবায়ু পরিবর্তন” দিয়ে কথা শুরু করি, তখন আমরা এমন একটা খেলায় ঢুকে পড়ি, যেখানে প্রতিটা বিপদকে ব্যবসার সুযোগ হিসেবে দেখা হয়। নতুন প্রযুক্তি তৈরি হয়, আরও সম্পদ ব্যবহার হয়, আর ব্যবস্থাটি ক্রমশ ভারী হয়ে ওঠে।
কিন্তু আসল সমস্যাটা অন্য জায়গায়।
আমরা এমন গতিতে পৃথিবীর সম্পদ ব্যবহার করছি, যেটা পৃথিবী পুনরুদ্ধার করতে পারছে না।
শক্তি। মাটি। জল। সময়। মনোযোগ।
এই সত্য অস্বস্তিকর, তাই আমরা প্রায়ই বাস্তবতার মুখোমুখি না হয়ে তার চারপাশে ঘুরি। তাই আমরা দেওয়ালের দিকে ছুটতে ছুটতে গতি নিয়ে তর্ক করছি, কিন্তু দেওয়ালটার অস্তিত্বই অস্বীকার করছি।
অনেক পরিকল্পনা ইতিমধ্যেই চলছে। জিওইঞ্জিনিয়ারিং, সীমান্ত বন্ধ করা, দেওয়াল তোলা, মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা। সবকিছুই একটাই উদ্দেশ্যে—আমাদের পরিচিত পৃথিবীটাকে যেকোনো মূল্যে ধরে রাখা।
কিন্তু আমরা যে পৃথিবীটাকে চিনি, সেটার শেষ মানেই পৃথিবীর শেষ নয়।
যদি আমরা এই পার্থক্যটা না বুঝি, তাহলে আমরা ভবিষ্যৎকে পুড়িয়ে ফেলব, শুধু বর্তমানকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য।
মূল সংক্রমণটা অন্য জায়গায়। “জলবায়ু পরিবর্তন” শব্দটা এখন খুব ছোট হয়ে গেছে। এটা অনেকটা একটা বড় গাড়ি দুর্ঘটনাকে “পরিবহন সমস্যা” বলার মতো—টেকনিক্যালি ঠিক, কিন্তু সত্যি নয়।
প্রভাব ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান—বন্যা, তাপপ্রবাহ, অস্বাভাবিক আবহাওয়া, ভেঙে পড়া হিমবাহ, বদলে যাওয়া ঋতুচক্র। এই সংকেতগুলো স্পষ্ট। কিন্তু আমরা এখনো ভান করছি যে আমাদের বর্তমান পদ্ধতি কাজ করছে।
আজ আমরা একটা মোড়ে দাঁড়িয়ে।
একটি পথ প্রযুক্তির উপর সম্পূর্ণ নির্ভরতার—যেখানে বলা হয় সব আগের মতোই চলবে।
অন্য পথটি সংযমের—কম নিয়ে বাঁচা, দক্ষতা বাড়ানো, পারস্পরিক নির্ভরতা গড়ে তোলা।
প্রথম পথটা সহজ, কারণ কিছু ত্যাগ করতে হয় না। দ্বিতীয় পথটা কঠিন, কারণ এটা বাস্তবকে মেনে নিতে বলে।
আসল সমস্যার নাম: অতিরিক্ত ব্যবহার (Overshoot)
জলবায়ু পরিবর্তন আসলে মূল সমস্যা নয়। এটা একটা লক্ষণ।
মূল সমস্যা হলো আমরা পৃথিবী থেকে যতটা নিচ্ছি, তার চেয়ে কম ফিরিয়ে দিতে পারছি।
জলবায়ু পরিবর্তন জ্বর। অতিরিক্ত ব্যবহার সংক্রমণ। জ্বর কমানো সম্ভব, কিন্তু সংক্রমণ থাকলে অসুখ ফিরে আসবে।
আমাদের সভ্যতা শক্তির উপর দাঁড়িয়ে। শক্তি ছাড়া কোনো অর্থনীতি, প্রযুক্তি বা সমাজ টিকে থাকতে পারে না।
আমাদের সভ্যতা শক্তির উপর দাঁড়িয়ে। শক্তি যত বাড়ে, বৃদ্ধি তত বাড়ে। কিন্তু বৃদ্ধি সীমাহীন নয়—পৃথিবীও নয়।
আমরা উন্নতি করতে করতে সেই ভিত্তিকেই দুর্বল করছি, যার উপর আমাদের অস্তিত্ব দাঁড়িয়ে।
আমরা একই সঙ্গে নিজেদের বাঁচিয়ে রাখার মেশিন বানাচ্ছি আর সেই মেশিনের ভিত্তিটাকেই ভেঙে ফেলছি
এই ব্যবস্থার মধ্যে পতন আগে থেকেই লুকিয়ে আছে। যখন শক্তির প্রবাহ কমে যায়, তখন অর্থনীতি দুর্বল হয়, রাজনীতি অস্থির হয়, সমাজ ভেঙে পড়ে।
শেষ প্রশ্নটি তাই রয়ে যায়— যদি জলবায়ু সংকট না-ও থাকত, তবুও কি প্রকৃতি ধ্বংস করা ন্যায্য হতো?
সম্ভবত না।
কারণ আসল প্রশ্নটা জলবায়ু নয়। আসল প্রশ্নটা হলো আমরা কি সত্যিই বুদ্ধিমানের মতো এই গ্রহে বাস করছি? যদি উত্তর “না” হয়, তাহলে কাজটা শুধু কার্বন কমানো নয়। কাজটা হলো নতুনভাবে বাঁচতে শেখা।
পৃথিবীর সীমার মধ্যে এবং একে অপরের সঙ্গে।