ঝাড়খণ্ডে বাতিল সিজিএল পরীক্ষা, চাকরি হারিয়ে পথে সদ্য নিয়োগপ্রাপ্তরা

যা জানা জরুরি
- সোমবার সকালেও রোশন ছিলেন ঝাড়খণ্ড সরকারের এক জন কর্মী।
- রাঁচীর নেপাল হাউসে সহকারী শাখা আধিকারিক হিসেবে অন্য দিনের মতোই দফতরের কাজ করেছিলেন।
- কিন্তু সন্ধ্যা নামার আগেই তাঁর সেই পরিচয় অনিশ্চিত হয়ে গেল।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
সোমবার সকালেও রোশন ছিলেন ঝাড়খণ্ড সরকারের এক জন কর্মী। রাঁচীর নেপাল হাউসে সহকারী শাখা আধিকারিক হিসেবে অন্য দিনের মতোই দফতরের কাজ করেছিলেন। কিন্তু সন্ধ্যা নামার আগেই তাঁর সেই পরিচয় অনিশ্চিত হয়ে গেল। ঝাড়খণ্ড সরকার কর্মী নিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ জেএসএসসি-সিজিএল পরীক্ষা বাতিল করার কথা ঘোষণা করতেই রোশনের মতো প্রায় দু’হাজার নবনিযুক্ত সরকারি কর্মীর পায়ের তলা থেকে কার্যত মাটি সরে যায়। পরদিন সকালে তাঁদের অনেককেই দেখা গেল ঝাড়খণ্ড সচিবালয়ের বাইরে বিক্ষোভে—সকালে কর্মচারী, সন্ধ্যায় প্রতিবাদী।
দীর্ঘ আন্দোলনের চাপে সোমবার ঝাড়খণ্ড স্টাফ সিলেকশন কমিশনের কম্বাইন্ড গ্র্যাজুয়েট লেভেল বা জেএসএসসি-সিজিএল পরীক্ষা বাতিল করে হেমন্ত সোরেন সরকার। পরীক্ষায় অনিয়ম, প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং নিয়োগ-দুর্নীতির অভিযোগ তুলে কয়েক সপ্তাহ ধরে আন্দোলন চালাচ্ছিলেন চাকরিপ্রার্থীরা। তাঁদের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল এই পরীক্ষা বাতিল করা। সরকারের সিদ্ধান্তে আন্দোলনকারীদের একাংশ যখন বিজয় উদ্যাপন করছেন, তখন একই সিদ্ধান্ত আর এক দল তরুণের জীবনে ডেকে এনেছে চরম অনিশ্চয়তা।
তাঁরা সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ইতিমধ্যেই বিভিন্ন সরকারি পদে যোগ দিয়েছিলেন। ফলে শুধু একটি পরীক্ষা বা মেধাতালিকা নয়, বাতিলের অভিঘাত সরাসরি পড়েছে তাঁদের হাতে পাওয়া চাকরির উপর।
এই তরুণদের অন্যতম রোশন। চলতি বছরের জানুয়ারিতে সহকারী শাখা আধিকারিক পদে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। ছোটবেলা থেকে অভাবের সঙ্গে লড়াই করেই পড়াশোনা। বাবা ছোট একটি পানের দোকান চালান, মা পার্শ্বশিক্ষিকা। অসুস্থতার কারণে দাদা পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। ফলে সরকারি চাকরি পাওয়ার পর রোশনের সাফল্য ছিল গোটা পরিবারের ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন। কয়েক মাসের মধ্যেই সেই স্বপ্ন এখন ধ্বংসের মুখে।
রোশনের প্রশ্ন, অনিয়মের সঙ্গে যাঁরা যুক্ত, তাঁদের চিহ্নিত করে শাস্তি দেওয়া হবে না কেন? গোটা পরীক্ষা বাতিল করে সৎ পথে চাকরি পাওয়া প্রার্থীদের কেন অপরাধীর আসনে দাঁড় করানো হচ্ছে? তাঁর বক্তব্য, নিয়োগ-প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ মেনেই তাঁরা পরীক্ষায় বসেছিলেন, উত্তীর্ণ হয়েছিলেন এবং সরকারি যাচাইয়ের পরে কাজে যোগ দিয়েছিলেন। এখন সরকারের একটি সিদ্ধান্তে তাঁদের সততা এবং যোগ্যতা—দু’টিই প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
সচিবালয়ের বাইরে সমবেত নবনিযুক্তদের মুখে একই হতাশা। কেউ বহু বছর বেসরকারি সংস্থায় কাজ করার পরে সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন। কেউ আগের চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। কারও বয়স সরকারি চাকরির পরীক্ষায় বসার ঊর্ধ্বসীমার কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে। নতুন করে পরীক্ষা হলে তাঁরা আদৌ সুযোগ পাবেন কি না, তার নিশ্চয়তা নেই। অনেকে চাকরি পাওয়ার পরে পরিবারের ঋণ শোধ করা শুরু করেছিলেন, বাড়ি ভাড়া নিয়েছিলেন কিংবা ভাইবোনের পড়াশোনার দায়িত্ব কাঁধে তুলেছিলেন। এক ঘোষণায় সেই সমস্ত পরিকল্পনা এলোমেলো।
“আমাদের অপরাধটা কী, অন্তত সেটুকু বলুন। আমাদের চাকরি থেকে ছুড়ে ফেলবেন না”—বিক্ষোভস্থলে সফল প্রার্থীদের এই আবেদনই তাঁদের অসহায়তার সারাংশ। তাঁদের দাবি, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হোক। যাঁরা টাকা দিয়ে চাকরি কিনেছেন বা দুর্নীতিতে জড়িত, তাঁদের নিয়োগ বাতিল করা হোক। কিন্তু সকলকে একই সঙ্গে শাস্তি দেওয়া ন্যায়সঙ্গত নয়।
জেএসএসসি-সিজিএল পরীক্ষা ঘিরে বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। পরীক্ষা পরিচালনা এবং ফল প্রকাশের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস, মূল্যায়নে অসঙ্গতি ও প্রভাবশালী চক্রের হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছিল। আন্দোলনকারীরা কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থাকে দিয়ে তদন্তের দাবিও জানান। টানা আন্দোলন, অনশন এবং বিধানসভা অভিযানের পরে সরকার শেষ পর্যন্ত পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়।
মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন জানিয়েছেন, চলমান সিআইডি ও বিশেষ তদন্তকারী দলের অনুসন্ধানে কিছু চমকে দেওয়ার মতো তথ্য উঠে এসেছে। সেই কারণেই মন্ত্রিসভা জেএসএসসি-সিজিএল এবং বিতর্কিত সংস্থা টিডিপিএল পরিচালিত অন্য পরীক্ষাগুলি বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে রাজ্যে হওয়া নিয়োগ পরীক্ষার অনিয়ম খতিয়ে দেখার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। পরীক্ষা-ব্যবস্থার সংস্কারের জন্য প্রবীণ আমলা অমিতাভ কৌশলের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠিত হবে।
কিন্তু সরকারের সিদ্ধান্তে একটি আন্দোলন স্তিমিত হওয়ার আগেই জন্ম নিয়েছে নতুন আন্দোলন। সফল প্রার্থীরা জানিয়েছেন, প্রশাসন সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার না করলে তাঁরা আইনি ও গণতান্ত্রিক পথে লড়াই চালাবেন। পরীক্ষাটি আগেই আদালতের বিচারাধীন ছিল বলেও তাঁদের একাংশ মনে করিয়ে দিয়েছেন।
ঝাড়খণ্ডের নিয়োগ-কাণ্ড এখন তাই এক কঠিন নৈতিক প্রশ্নের সামনে সরকারকে দাঁড় করিয়েছে। দুর্নীতিগ্রস্ত পরীক্ষা বাতিল করে চাকরিপ্রার্থীদের আস্থা ফেরানো জরুরি। কিন্তু দুর্নীতির প্রমাণ ছাড়াই ইতিমধ্যে কাজে যোগ দেওয়া প্রত্যেককে চাকরিচ্যুত করাও কি সুবিচার? আন্দোলনকারীদের জয় নিশ্চিত করতে গিয়ে অন্য এক দল নির্দোষ তরুণের ভবিষ্যৎ বলি হলে, পরীক্ষা-ব্যবস্থার সংস্কার শেষ পর্যন্ত আর একটি অন্যায়ের জন্ম দেবে। রোশনদের ক্ষোভের কেন্দ্রে রয়েছে সেই আশঙ্কাই—দুর্নীতি করেছেন অন্যেরা, অথচ মূল্য দিতে হচ্ছে তাঁদের।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



