বাংলাস্ফিয়ার: কেন বুদ্ধিমত্তা মানেই প্রজ্ঞা নয়? ইতিহাসে বারবার একটা ভুল ধারণা দেখা যায় যে মানুষ খুব বুদ্ধিমান, সে নাকি জীবনের সব ক্ষেত্রেই ভালো সিদ্ধান্ত নেবে। কথাটা শুনতে যুক্তিযুক্ত মনে হয়। যিনি জটিল বৈজ্ঞানিক সমস্যা সমাধান করতে পারেন, তিনি নিশ্চয়ই বাস্তব জীবনের সমস্যাও ভালোভাবে সামলাতে পারবেন। কিন্তু বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা থাকলেও মানুষ ভুল করতে পারে এবং কখনও কখনও তা হতে পারে খুব বড় কোনো ভুল।
সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণগুলোর মধ্যে একজন হলেন আইজ্যাক নিউটন। তিনি গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানে বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন, ক্যালকুলাস আবিষ্কার করেছিলেন, এবং গ্রহের গতির নিয়ম ব্যাখ্যা করেছিলেন। কিন্তু ১৭২০ সালে তিনি South Sea Bubble নামে এক শেয়ার বাজারের ধসে বিপুল টাকা হারান। প্রথমে লাভ করলেও পরে আবার বেশি দামে শেয়ার কিনে ফেলেন, আর তারপর বাজার ভেঙে পড়ে। তিনি নাকি বলেছিলেন, তিনি নক্ষত্রের গতি হিসাব করতে পারেন, কিন্তু মানুষের পাগলামি হিসাব করতে পারেন না।
এই ঘটনা দেখায়, অসাধারণ বৈজ্ঞানিক প্রতিভা থাকলেও বাস্তব জীবনের বিচারবুদ্ধি সবসময় নিখুঁত হয় না।
একইভাবে, লাইনাস পলিং, যিনি দুবার নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন, জীবনের শেষ দিকে বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে অতিরিক্ত ভিটামিন C খেলে বড় বড় রোগ সারানো যায়। কিন্তু পরে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয়, এই ধারণা ভুল।
আবার, দাবার কিংবদন্তি ববি ফিশার, যিনি দাবার ইতিহাসে অন্যতম সেরা খেলোয়াড়, জীবনের পরবর্তী সময়ে নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাস করতে শুরু করেন। আর জন ভন নিউম্যান, যিনি কম্পিউটার বিজ্ঞান থেকে অর্থনীতি, সব ক্ষেত্রেই অবদান রেখেছেন, তিনি নাকি গাড়ি চালাতে খুব খারাপ ছিলেন এবং প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটাতেন।
এই ঘটনাগুলো একটা গুরুত্বপূর্ণ সত্যি সামনে আনে, তা হলো – কোনো একটা ক্ষেত্রে অসাধারণ বুদ্ধিমান হওয়া মানে এই নয় যে মানুষ সব ক্ষেত্রেই সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে।
বুদ্ধিমত্তা শুধু সত্য খুঁজে পায় না, গল্পও বানায়।
আমরা সাধারণত ভাবি, বুদ্ধিমত্তা মানে সত্য খুঁজে পাওয়ার ক্ষমতা। কিন্তু আসলে বুদ্ধিমত্তা আরেকটা কাজেও খুব দক্ষ- নিজের বিশ্বাসকে যুক্তি দিয়ে সমর্থন করা।
অর্থাৎ, একজন বুদ্ধিমান মানুষ ভুল বিশ্বাস ধরে রাখলেও, সে সেই ভুল বিশ্বাসকে সমর্থন করার জন্য শক্তিশালী যুক্তি তৈরি করতে পারে। এতে করে সে নিজের ভুল বুঝতেই পারে না।
মানুষ সাধারণত আগে একটা বিশ্বাস তৈরি করে, তারপর সেই বিশ্বাসকে সমর্থন করার জন্য প্রমাণ খোঁজে। বুদ্ধিমান মানুষ এটা আরও দক্ষতার সঙ্গে করে। তারা এমন যুক্তি তৈরি করতে পারে, যা শুনতে খুব বিশ্বাসযোগ্য লাগে, এমনকি যদি সেটার ভিত্তি দুর্বল হয়।
অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের ফাঁদ
খুব বুদ্ধিমান মানুষদের আরেকটা বড় সমস্যা হল অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস। তারা জীবনে এতবার সঠিক হয়েছে যে তারা ধরে নেয়, এবারও তারা সঠিক। এই আত্মবিশ্বাস ধীরে ধীরে একটা ফাঁদ হয়ে দাঁড়ায়। তারা ভুল হলেও সেটা স্বীকার করতে চায় না। বরং নিজের ভুলকে সঠিক প্রমাণ করার চেষ্টা করে। গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক সময় বিশেষজ্ঞরাও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে খুব সঠিক ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারেন না। বরং যারা নমনীয়ভাবে চিন্তা করে এবং নিজের ভুল স্বীকার করতে পারে, তারা বেশি সঠিক হয়।
জটিল চিন্তার আরেকটা বিপদ
বুদ্ধিমান মানুষ সাধারণত জটিল চিন্তা করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। এটা অনেক ক্ষেত্রে উপকারী। কিন্তু কখনও কখনও এটা সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। সহজ ব্যাখ্যা সঠিক হলেও, তারা জটিল ব্যাখ্যার দিকে ঝোঁকে, কারণ সেটা বেশি “বুদ্ধিদীপ্ত” মনে হয়। এতে করে তারা বাস্তব সত্যি থেকে দূরে সরে যেতে পারে।
আরেকটা সামাজিক সমস্যা হল, যারা সবসময় “সবচেয়ে বুদ্ধিমান” হিসেবে পরিচিত, তারা অন্যদের থেকে শেখার ব্যাপারে কম আগ্রহী হয়। এতে তাদের ভুল সংশোধনের সুযোগ কমে যায়।
বুদ্ধিমত্তা আর প্রজ্ঞা এক জিনিস নয়
বুদ্ধিমত্তা মানে দ্রুত চিন্তা করা, সমস্যা সমাধান করা, এবং নতুন ধারণা তৈরি করা।
প্রজ্ঞা মানে নিজের সীমাবদ্ধতা বোঝা, ভুল স্বীকার করা, এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া।
প্রজ্ঞা মানে এটা জানা যে আপনি সবকিছু জানেন না।
নিউটনের জীবন আমাদের কী শেখায়
নিউটন পদার্থবিজ্ঞানে বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি বহু বছর ধরে alchemy নিয়ে কাজ করেছিলেন যা পরে সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হয়।
এই ঘটনা দেখায়, একজন মানুষ একই সঙ্গে অসাধারণ প্রতিভাবান এবং একই সঙ্গে বড় ভুলের শিকার হতে পারেন।
শেষ কথা
এই বিষয়টা শুধু নিউটন বা অন্য প্রতিভাবান মানুষদের জন্য প্রযোজ্য নয়, এটা আমাদের সবার ক্ষেত্রেই সত্যি।
বুদ্ধিমত্তা আপনাকে চিন্তা করার ক্ষমতা দেয়।
কিন্তু প্রজ্ঞা আপনাকে শেখায় – কখন নিজের চিন্তাকেও প্রশ্ন করতে হয়।
সবচেয়ে বুদ্ধিমান মানুষও কোনো না কোনো ক্ষেত্রে ভুল করতে পারেন।
আর আপনি যদি নিজেকে খুব বুদ্ধিমান মনে করেন, তাহলে সেই ভুলটা হয়তো আপনার ধারণার চেয়েও কাছেই আছে।