সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং পবিত্র ধর্মস্থানগুলির নিরাপত্তা রক্ষায় ‘প্রয়োজনীয় সব সহায়তা’ দিচ্ছে পাকিস্তান। ভবিষ্যতেও এই সহায়তা জারি থাকবে। ইয়েমেনের হুতিদের হামলা ঘিরে আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যে এমনই বার্তা দিলেন পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী। তবে সৌদি আরবকে কী ধরনের বা কতটা সামরিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, তা স্পষ্ট করেননি তিনি।
রবিবার, ১৮ অক্টোবর, আরবি ভাষার ডিজিটাল সংবাদপত্র ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট আরাবিয়া’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে চৌধুরী বলেন, সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং দুই পবিত্র মসজিদের নিরাপত্তা পাকিস্তানের কাছে ‘সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ’। এই বিষয়ে কোনও আপসের প্রশ্ন নেই বলেও জানান তিনি।
চৌধুরীর কথায়, “সেই লক্ষ্য পূরণে যা যা সহায়তা প্রয়োজন, তা দেওয়া হচ্ছে এবং দেওয়া হবে।” হুতিদের হামলায় পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়া ছিল ‘ক্ষোভের’, জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য, সৌদি আরব এবং পবিত্র ধর্মস্থানগুলির নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনও ‘যদি-কিন্তু’ থাকতে পারে না।
প্রতিরক্ষার জন্যই জোট?
গত আগস্টে পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্ক একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে। চুক্তি অনুযায়ী, তিন দেশের কোনও একটির উপর হামলাকে তিনটি দেশের উপরই হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
এই জোটের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্নের উত্তরে চৌধুরী বলেন, তিনটি দেশই স্পষ্ট করে জানিয়েছে, চুক্তির কোনও আক্রমণাত্মক উদ্দেশ্য নেই। এটি ‘সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক’। ইরান বা ইজরায়েলকে লক্ষ্য করে এই জোট গঠন করা হয়েছে বলে যে খবর প্রকাশিত হয়েছে, তা-ও নাকচ করেন তিনি।
রাষ্ট্রপুঞ্জের সনদের ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদের উল্লেখ করে পাকিস্তানের সেনা মুখপাত্র বলেন, সম্মিলিত প্রতিরোধব্যবস্থার মাধ্যমে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হচ্ছে—তিন দেশের যে কোনও একটির বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ হামলা হলে তার জবাব যৌথ ভাবে দেওয়া হবে।
চৌধুরীর কথায়, “এই প্রতিরোধক্ষমতা যদি হামলা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়, তা হলে তিনটি দেশের হাতে থাকা সব উপায় কাজে লাগিয়ে সেই প্রতিরোধক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে।”
তাঁর দাবি, সম্মিলিত প্রতিরোধব্যবস্থা ইতিমধ্যেই কার্যকর রয়েছে এবং সৌদি আরবের নিরাপত্তা রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে এই ব্যবস্থার আওতায় ঠিক কী ধরনের সামরিক পদক্ষেপ করা হতে পারে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি তিনি।
ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে ইসলামাবাদ
হুতিদের সমর্থনকারী ইরানকে পাকিস্তান কোনও সতর্কবার্তা দিয়েছে কি না, জানতে চাওয়া হলে চৌধুরী বলেন, উত্তেজনা কমানো এবং সংযম বজায় রাখার লক্ষ্যে ইরান-সহ সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে ইসলামাবাদ।
তিনি বলেন, “বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে সমস্ত যোগাযোগ এবং আলোচনার লক্ষ্যই হল উত্তেজনার মাত্রা কমানো।”
চৌধুরীর মতে, সংঘাতকে হুতিদের বিরুদ্ধে বা অন্য কোনও এলাকায় ছড়িয়ে দিলে সংকটের সমাধান হবে না। বরং তাতে লাভ হবে তাদেরই, যারা এই অঞ্চলে অস্থিরতা তৈরি করতে চায়। মুসলিম দেশগুলির মধ্যে ঐক্যের প্রয়োজনীয়তার উপরেও জোর দেন তিনি।
তাঁর কথায়, “আমরা যদি আলোচনার মাধ্যমে কোনও সমাধানে পৌঁছতে না পারি এবং সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ি, তা হলে মক্কা জোটের এই সম্মিলিত প্রতিরোধব্যবস্থা অবশ্যই কার্যকর হবে—যেমন এখনই হচ্ছে।”
সামুদ্রিক নিরাপত্তাতেও নজর
বাব আল-মান্দেব ও হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলের উপর হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে সৌদি আরব একটি বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট গঠন করেছে বলেও জানান চৌধুরী। পাকিস্তানের নৌবাহিনীর এক কর্মকর্তা ওই জোটের উপপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
জোটের সম্প্রসারণের সম্ভাবনা নিয়েও কথা বলেন পাকিস্তানের সেনা মুখপাত্র। তাঁর বক্তব্য, যে দেশগুলি সম্মিলিত প্রতিরোধের নীতিকে সমর্থন করে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার অভিন্ন লক্ষ্য মেনে চলে, তাদের জন্য জোটের দরজা খোলা রয়েছে।
মিশর ও সিরিয়া এই জোটে যোগ দেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে বলে প্রকাশিত খবর সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে চৌধুরী বলেন, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে তিন সদস্যদেশের রাজনৈতিক, কৌশলগত ও সামরিক নেতৃত্ব।
একই সঙ্গে আঞ্চলিক সংঘাত আরও না বাড়িয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খোঁজার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখাই জোটের লক্ষ্য; সেই লক্ষ্যের প্রতি হুমকি তৈরি হলে সম্মিলিত প্রতিরোধব্যবস্থা সক্রিয় হবে।