সংখ্যাগরিষ্ঠতা হাতছাড়া হওয়ার মুখে। অথচ প্রধানমন্ত্রীর চেয়ার এখনও বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর দখলেই থাকছে। ইজরায়েলের ভোটে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা এই রাজনৈতিক বৈপরীত্য। প্রায় ৮৬ শতাংশ ভোট গণনার পরে ১২০ আসনের সংসদ নেসেটে নেতানিয়াহুর দক্ষিণপন্থী জোটের সম্ভাব্য আসন ৫৩, গাদি আইজেনকটের বিরোধী শিবিরের ৪৮। আরব দলগুলির সম্ভাব্য প্রাপ্তি ১৯। সংখ্যাগরিষ্ঠতার সীমা ৬১। ফলে কোনও শিবিরই নিজের শক্তিতে সরকার গড়ার জায়গায় নেই। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহুই তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে থাকবেন।

এই হিসাব চূড়ান্ত ফল নয়। বিশেষ ব্যবস্থায় দেওয়া কয়েক লক্ষ ভোটের গণনা তখনও বাকি। সেনাসদস্য, সংরক্ষিত বাহিনীর সদস্য এবং নির্ধারিত কেন্দ্রে ভোট দিতে না-পারা অন্য ভোটারদের একাংশের ব্যালট আলাদা করে যাচাই করা হয়। এই ‘ডাবল এনভেলপ’ ভোট চূড়ান্ত আসনবণ্টনে পরিবর্তন আনতে পারে। তাই ৫৩ আসনকে নেতানিয়াহুর নিশ্চিত জয় কিংবা ৪৮ আসনকে বিরোধীদের চূড়ান্ত পরাজয় হিসেবে ঘোষণা করার সময় এখনও আসেনি।

তবে ঘোষিত পূর্বাভাসের অঙ্কটি পরিষ্কার। নেতানিয়াহুর জোটের ঘাটতি আট আসন, আইজেনকটের তেরো। অন্যদিকে বিরোধী শিবির ও আরব দলগুলির সম্ভাব্য আসন যোগ করলে হয় ৬৭। অর্থাৎ সংখ্যার বিচারে বিকল্পের জায়গা রয়েছে। কিন্তু পৃথক দলের আসন যোগ করা আর তাদের এক সরকারের পিছনে দাঁড় করানো এক কাজ নয়। এখনকার সংকট সেই ব্যবধানেই।

আরব দলগুলির অবস্থানও অভিন্ন নয়। জয়েন্ট লিস্ট নেতা ইউসুফ জাবারিন জানিয়েছেন, গাজা ও দক্ষিণ লেবানন নিয়ে মতবিরোধের কারণে তাঁরা আইজেনকটের সরকারে যোগ দিতে পারবেন না; তবে বাইরে থেকে সমর্থনের সম্ভাবনা খোলা রেখেছেন। অন্যদিকে রা’আম নেতা মনসুর আব্বাস সরকারে যোগ দিতে আগ্রহী। বাধা আইজেনকটের নিজের নির্বাচনী অবস্থান: প্রচারে তিনি আরব দলগুলিকে নিয়ে সরকার গড়ার সম্ভাবনা নাকচ করেছিলেন। ফলে নেতানিয়াহুকে সরানোর ইচ্ছার সঙ্গে সেই রাজনৈতিক অঙ্গীকারের সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠছে।

এই ফলের রাজনৈতিক তাৎপর্য তাই শুধু কে এগিয়ে, কে পিছিয়ে, তাতে ধরা পড়ছে না। বিরোধীদের সামনে সিদ্ধান্তটি কঠিন: যে ভোটারদের প্রতিনিধিদের সাহায্য ছাড়া ক্ষমতার পরিবর্তন সম্ভব হচ্ছে না, তাঁদের কতটা জায়গা দেওয়া হবে? ভোটের পরে সহযোগিতার দরজা বন্ধ রাখলে সংখ্যাগরিষ্ঠতার সম্ভাবনাও কাগজে থেকে যায়। নেতানিয়াহুর সুবিধা এখানেই—তাঁকে সরানোর পক্ষে থাকা শক্তিগুলিকে আগে নিজেদের মধ্যে গ্রহণযোগ্য বোঝাপড়া তৈরি করতে হবে।

এখন সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দু রাষ্ট্রপতি। সরকারি ফল প্রকাশের পরে দলগুলির প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে তিনি কোনও সাংসদকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেবেন। রাষ্ট্রপতির দপ্তরের বিধিব্যাখ্যা অনুযায়ী, প্রথম সুযোগ পাওয়া ব্যক্তির হাতে থাকে ২৮ দিন; রাষ্ট্রপতি আরও সর্বোচ্চ ১৪ দিন সময় বাড়াতে পারেন। অর্থাৎ প্রথম প্রচেষ্টাতেই আলোচনা ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত চলতে পারে। বৃহত্তম দল বা জোট হওয়া মানেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন সরকার গঠন নয়; সংসদের আস্থা অর্জন করাই আসল পরীক্ষা।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলায় নিরাপত্তা ব্যর্থতা, দুর্নীতির মামলা এবং অতি-ধর্মীয় ইহুদিদের সেনাবাহিনীতে যোগদানের ছাড় নিয়ে বিরোধের বোঝা নিয়েই ভোটে নেমেছিলেন নেতানিয়াহু। তা সত্ত্বেও ইহুদি ভোটারদের মধ্যে প্রত্যাশার চেয়ে জোরালো সমর্থন পেয়েছেন তিনি। নানা বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এই দ্বন্দ্ব: সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর মুখেও বৃহত্তম জোটের নেতৃত্ব ধরে রেখে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার সুযোগ পেয়েছেন তিনি।

তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী বলতে এখানে কেবল দৈনন্দিন ফাইল সামলানো এক নিষ্ক্রিয় প্রশাসক বোঝালে ভুল হবে। ইজরায়েল ডেমোক্র্যাসি ইনস্টিটিউটের গবেষক গাই লুরি জানিয়েছেন, আইনের অক্ষর অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ক্ষমতা সাধারণ সরকারের মতোই। তবে তাকে সংযম দেখাতে হয়; কিছু ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা সীমিত থাকে। বিশেষত নিয়োগের মতো বিষয়ে এই সীমাবদ্ধতা প্রাসঙ্গিক। জনস্বার্থে জরুরি প্রয়োজন থাকলে সিদ্ধান্তের সুযোগ আবার অনেক বেশি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম জাতীয় নিরাপত্তা। তাখলিথ ইনস্টিটিউটের গবেষক অর অ্যাশারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, জরুরি প্রয়োজন ছাড়া সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত এড়ানোর নীতি থাকলেও তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী আইনত দেশকে যুদ্ধে নিয়ে যেতে পারেন, ইরানের বিরুদ্ধেও। নতুন সংসদের কমিটিগুলি গঠনের আগের সময়ে নজরদারিও দুর্বল থাকে। অর্থাৎ ‘তত্ত্বাবধায়ক’ শব্দটি নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা বোঝায় বটে, কিন্তু তাঁর হাতে থাকা সামরিক সিদ্ধান্তের ক্ষমতা বিলুপ্ত করে না।

এই কারণেই আইজেনকটের উদ্বেগ নিরাপত্তার প্রশ্নকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা নিয়ে। নেতানিয়াহুর দপ্তর আগেও ইরান সংঘাতকে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক লাভের জন্য ব্যবহারের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ফলে সম্ভাব্য যুদ্ধকে নিশ্চিত রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখানোর ভিত্তি নেই। কিন্তু ক্ষমতার অন্তর্বর্তী পর্যায়ে সিদ্ধান্তের বৈধতা, প্রয়োজন এবং জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্নগুলি অত্যন্ত বাস্তব।

আরেক সম্ভাবনা বৃহত্তর ঐক্য সরকার, যেখানে নেতানিয়াহু বিরোধী শিবিরের কোনও অংশকে টানতে পারেন। তাঁর প্রাক্তন উপদেষ্টা আভিভ বুশিনস্কির মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্পও এমন সমঝোতায় প্রভাব ফেলতে পারেন। তবে এটি বিশ্লেষকদের সম্ভাবনার হিসাব; কোনও চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি। বিকল্প পথ ফের নির্বাচন। সেই অনিশ্চয়তাই নেতানিয়াহুকে সময় দিচ্ছে।

আর্থিক বাজার অবশ্য এই অচলাবস্থায় স্বস্তি পায়নি। বুধবার ডলারের তুলনায় শেকেলের দাম দুই শতাংশের বেশি নেমেছে; তেল আভিভের প্রধান শেয়ারসূচক কমেছে প্রায় আড়াই শতাংশ। ভোটের আগে সরকার পরিবর্তনের প্রত্যাশা বাজারকে উৎসাহ দিয়েছিল। এখন দীর্ঘ আলোচনা, দুর্বল জোট এবং নতুন নির্বাচনের সম্ভাবনা সেই প্রত্যাশায় ধাক্কা দিয়েছে। বাজারের প্রতিক্রিয়া জনমতের বিকল্প নয়, তবে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার অর্থনৈতিক মূল্য যে আছে, তা স্পষ্ট।

নেতানিয়াহুর জন্য এটি স্বস্তির বিরতি, পূর্ণাঙ্গ বিজয় নয়। নতুন সংখ্যাগরিষ্ঠতা তাঁকে জোগাড় করতে হবে। বিরোধীদেরও তাঁর বিরুদ্ধে অবস্থান জানিয়ে কাজ শেষ হবে না; সরকার চালানোর উপযোগী সমর্থন এক জায়গায় আনতে হবে। ইজরায়েলের ভোট ক্ষমতার প্রশ্নের নিষ্পত্তি করেনি। সেই অসমাপ্ত অবস্থার বড় সুবিধাভোগী আপাতত বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী।