ইজরায়েলে নির্বাচনের অঙ্ক বড় জটিল। ১২০ আসনের নেসেটে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া কোনও দলের পক্ষেই সহজ নয়। ফলে ভোটের ফলের পাশাপাশি সরকার গঠনের জন্য কোন দল কার সঙ্গে জোট বাঁধছে, তার উপরেও নির্ভর করবে ক্ষমতার সমীকরণ। মঙ্গলবারের নির্বাচন ঘিরে তাই একাধিক প্রশ্ন—কে হবেন পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী? কোন দলগুলি সরকার গড়ার দৌড়ে এগিয়ে? আর এই নির্বাচনের ফল গাজা ও প্যালেস্টাইনিদের ভবিষ্যৎকে কোন পথে নিয়ে যাবে?

মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ভোট দিচ্ছেন ইজরায়েলের নাগরিকেরা। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে হামলা এবং তার পর গাজা, ইরান, লেবানন, সিরিয়া ও ইয়েমেনে সংঘাতের পর এই প্রথম সাধারণ নির্বাচন হচ্ছে দেশে।

শুক্রবার প্রকাশিত জনমত সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে জোর টক্কর চলছে ইজরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রাক্তন প্রধান গাদি আইজেনকটের। তবে সমীক্ষার ইঙ্গিত, কোনও পক্ষই নেসেটের ১২০টি আসনের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারবে না। ফলে সরকার গঠনের চূড়ান্ত ছবি স্পষ্ট হতে কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কয়েক মাসও লেগে যেতে পারে।

নেসেটের ভোটের অঙ্ক

ইজরায়েলের সংসদ নেসেটের আসনসংখ্যা ১২০। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৬১টি আসনের সমর্থন।

দেশে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে নির্বাচন হয়। অর্থাৎ, কোনও দল যত অনুপাতে ভোট পায়, সংসদে আসন পাওয়ার ক্ষেত্রেও সেই অনুপাত গুরুত্বপূর্ণ। এই ব্যবস্থায় এখনও পর্যন্ত কোনও দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। ফলে সরকার গড়তে একাধিক দলকে হাত মেলাতে হয়।

ভোটের পর দলগুলির মধ্যে শুরু হয় জোট গঠনের আলোচনা। কোনও পক্ষ ৬১ বা তার বেশি আসনের সমর্থন নিশ্চিত করতে পারলেই সরকার গঠনের পথ খুলে যায়।

কোনও দল বা জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও সংখ্যালঘু সরকার গঠনের চেষ্টা হতে পারে। সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে ফের নির্বাচন ডাকার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তত দিন অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে থাকবেন নেতানিয়াহু।

কে কার বিরুদ্ধে

আইজেনকট গত বছর নিজের দল ইয়াশার গঠন করেন। সামরিক বাহিনীতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং রাজনীতিতে তুলনামূলক নতুন মুখ হিসেবে পরিচিতি তাঁর অন্যতম শক্তি। গাজা যুদ্ধের প্রথম কয়েক মাসের মধ্যেই তাঁর সেনাসদস্য ছেলে নিহত হন।

নেতানিয়াহুর যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন আইজেনকট। তবে যুদ্ধ পরিচালনার পদ্ধতি নিয়ে মতবিরোধের জেরে ২০২৪ সালে পদত্যাগ করেন তিনি। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামলা ঠেকাতে ব্যর্থতার জন্য জবাবদিহির দাবি তাঁর নির্বাচনী প্রচারের অন্যতম প্রধান বিষয়।

বিরোধী শিবিরে রয়েছেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট এবং আভিগদর লিবারম্যান। দু’জনেই দক্ষিণপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং নিরাপত্তার প্রশ্নে কঠোর অবস্থানের সমর্থক। এ ছাড়া রয়েছেন বামঘেঁষা প্রাক্তন সেনা জেনারেল ইয়াইর গোলান। নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করতে তাঁরা আইজেনকটের সঙ্গে জোট বাঁধতে পারেন।

অন্য দিকে, ইজরায়েলের ইতিহাসে অন্যতম কট্টর দক্ষিণপন্থী সরকারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন নেতানিয়াহু। ক্ষমতায় ফিরতে হলে তাঁকে অতি দক্ষিণপন্থী শরিকদের সমর্থনের উপর নির্ভর করতে হতে পারে। এই শরিকদের একাংশ পশ্চিম তীরকে ইজরায়েলের সঙ্গে যুক্ত করার পক্ষে। গাজা থেকে প্যালেস্টাইনিদের সরিয়ে দেওয়ার দাবিও তুলেছেন তাঁরা। এমন পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে তা জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির আশঙ্কা তৈরি করতে পারে।

ইজরায়েলের জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আরব নাগরিক। তাঁদের অনেকেই নিজেদের ইজরায়েলের প্যালেস্টাইনি নাগরিক হিসেবে পরিচয় দেন। এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে দুটি আরব দলীয় জোট। সরকার গঠনের অঙ্কে তাদের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে প্রধান ইহুদি দলগুলির মধ্যে মাত্র একটি বাদে বাকিরা তাদের সঙ্গে কাজ করার সম্ভাবনা নাকচ করেছে।

নিরাপত্তা, সেনা ও মূল্যবৃদ্ধি

নির্বাচনী প্রচারের কেন্দ্রে রয়েছে নিরাপত্তার প্রশ্ন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা ঠেকাতে ব্যর্থতার জন্য নেতানিয়াহুকে আক্রমণ করছেন বিরোধীরা। ওই হামলায় প্রায় ১,২০০ মানুষ নিহত হন এবং ২৫১ জনকে পণবন্দি করে গাজায় নিয়ে যাওয়া হয়।

নেতানিয়াহু অবশ্য নিজেকে দেশের নিরাপত্তার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য রক্ষক হিসেবে তুলে ধরছেন। ২০২৩ সালের পর বিভিন্ন সংঘাতে ইজরায়েলের সামরিক সাফল্যকেই নিজের পক্ষে যুক্তি হিসেবে দেখাচ্ছেন তিনি।

বিতর্কের আর একটি বড় বিষয় বাধ্যতামূলক সামরিক পরিষেবা। পূর্ণসময়ের ধর্মীয় শিক্ষায় যুক্ত অতি গোঁড়া ইহুদি পুরুষদের দীর্ঘদিন ধরে সামরিক পরিষেবা থেকে ছাড় দেওয়া হয়েছে। যুদ্ধের পর এই ছাড়ের ন্যায্যতা নিয়ে ইজরায়েলের অভ্যন্তরে বিভাজন আরও বেড়েছে।

বিচারব্যবস্থার সংস্কারও ভোটারদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের প্রস্তাবিত পরিবর্তন নিয়ে বিরোধীদের অভিযোগ, এর ফলে আদালতের স্বাধীনতা দুর্বল হবে এবং দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের উদ্বেগের অন্যতম কারণ জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়। খাদ্য ও আবাসনের খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা নির্বাচনী লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

গাজার ভবিষ্যৎ কোন পথে?

নির্বাচনের ফল শুধু ইজরায়েলের রাজনীতিতেই নয়, প্যালেস্টাইনিদের ভবিষ্যতেও প্রভাব ফেলতে পারে। গাজায় যুদ্ধবিরতির এক বছর পরেও ইজরায়েল প্রায় প্রতিদিন হামলা চালাচ্ছে এবং ভূখণ্ডটির অর্ধেকেরও বেশি এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে।

হামাস পরিচালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় ৭৪ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। রাষ্ট্রপুঞ্জ এই পরিসংখ্যানকে নির্ভরযোগ্য বলে বিবেচনা করে।

পশ্চিম তীরেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। রাষ্ট্রপুঞ্জের নথি অনুযায়ী, সেখানে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের হামলা রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক আইনে বেআইনি বলে বিবেচিত এই বসতিগুলির সম্প্রসারণও অব্যাহত রয়েছে।

গাজা নিয়ে আইজেনকটের অবস্থান অনেকাংশেই নেতানিয়াহুর কাছাকাছি। আমেরিকার নেতৃত্বাধীন শান্তি পরিকল্পনার মাধ্যমে অথবা প্রয়োজনে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে ১৮ মাসের মধ্যে গাজায় হামাসের শাসনের অবসান ঘটানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।

সাধারণভাবে ইহুদি বসতি স্থাপনের পক্ষে থাকলেও পশ্চিম তীরের ‘ই১’ প্রকল্পের বিরোধিতা করেছেন আইজেনকট। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে পশ্চিম তীরের উত্তর ও দক্ষিণ অংশের মধ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। উগ্রপন্থী বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষেও তিনি।

প্যালেস্টাইনিদের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে তাঁর প্রস্তাব অবশ্য বিতর্কিত। ইজরায়েলের নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণের অধীনে প্যালেস্টাইনিদের স্বায়ত্তশাসন অথবা পূর্ণ রাষ্ট্রের চেয়ে কম মর্যাদার কোনও ব্যবস্থার কথা বলেছেন তিনি।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, প্রধান ইহুদি দলগুলির কোনওটিই নির্বাচনী প্রচারে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানকে নিজেদের মূল লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরেনি।

কবে জানা যাবে ফল?

ভোটের দিন স্থানীয় সময় রাত ১০টায়, অর্থাৎ গ্রিনিচ সময় রাত ৮টায়, ইজরায়েলের সম্প্রচারমাধ্যমগুলি বুথফেরত সমীক্ষা প্রকাশ করবে। তবে এই সমীক্ষার সঙ্গে চূড়ান্ত ফলের পার্থক্য থাকতে পারে। শুক্রবারের জনমত সমীক্ষাও ইঙ্গিত দিচ্ছে, কোনও পক্ষের স্পষ্ট জয় নিশ্চিত নয়।

ভোটের পরের দিন প্রাথমিক ফল প্রকাশিত হওয়ার কথা। আনুষ্ঠানিক ফল ঘোষণার নির্ধারিত দিন ৪ নভেম্বর।

এর পর প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হার্ৎসগ বিভিন্ন দলের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করবেন। তাঁর বিবেচনায় যে নেতার সরকার গঠনের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি, তাঁকেই দায়িত্ব নেওয়ার আমন্ত্রণ জানাবেন। এই প্রক্রিয়া শেষ হতে এক মাসেরও বেশি সময় লাগতে পারে।

প্রথম নেতা সরকার গড়তে ব্যর্থ হলে প্রেসিডেন্ট অন্য কাউকে সুযোগ দিতে পারেন। দ্বিতীয় প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হলে নেসেটের সদস্যেরা তৃতীয় কোনও নেতাকে সুযোগ দেওয়ার জন্য আবেদন করতে পারেন। সেই চেষ্টাও সফল না হলে নতুন করে নির্বাচন ডাকার পরিস্থিতি তৈরি হবে।

ইজরায়েলের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন অচলাবস্থা নতুন নয়। জোট গঠনে বারবার ব্যর্থতার জেরে ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে দেশটিতে পাঁচ বার নির্বাচন হয়েছিল। ফলে এবারের ভোটে কে কত আসন পেলেন, তার পাশাপাশি নির্বাচনের পর কে কার সঙ্গে হাত মেলাচ্ছেন, সেটাই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করতে পারে ইজরায়েলের পরবর্তী সরকারের ভবিষ্যৎ।