ঐতিহাসিক হারে ভোট পড়লেও মঙ্গলবার রাতে ইজরায়েলের নির্বাচনে কোনও পক্ষেরই স্পষ্ট জয়ের ইঙ্গিত মিলল না। দেশের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বলে বর্ণিত এই নির্বাচনে ইজরায়েলি আরব ভোটারদের অংশগ্রহণও ছিল রেকর্ড মাত্রায়।

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় প্রকাশিত বুথফেরত সমীক্ষাগুলির পূর্বাভাস, ইজরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রাক্তন চিফ অব স্টাফ গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলগুলির জোট সামান্য ব্যবধানে নেসেটে বেশি আসন পেতে পারে। প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর দক্ষিণপন্থী ও অতি-দক্ষিণপন্থী জোটকে তারা পিছনে ফেললেও একক বৃহত্তম দল হিসেবে উঠে আসতে পারে নেতানিয়াহুর লিকুদ।

কে জোট সরকার গড়তে পারবেন, তা নিয়ে এ বার কয়েক সপ্তাহ ধরে দর-কষাকষি চলার সম্ভাবনা। তার পরেই হয় নতুন প্রধানমন্ত্রীর নাম চূড়ান্ত হবে, নয়তো ফের নির্বাচনের ডাক পড়বে। তবে এই ফলের ইঙ্গিত নেতানিয়াহুর প্রতি ভোটারদের তীব্র অনাস্থারই প্রকাশ।

সারা দিন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ভোটকেন্দ্রে ইজরায়েলিদের ঢল নামার পরে বুথফেরত সমীক্ষা দেখিয়েছে, বিপুলসংখ্যক মানুষ নেতানিয়াহুকে প্রত্যাখ্যান করলেও লিকুদের অনুগত ভোটারদের একটি বড় অংশের উপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ এতটুকু শিথিল হয়নি।

ইজরায়েলি আরব দলগুলি সব মিলিয়ে সর্বোচ্চ ১৮টি আসন পেতে পারে বলে পূর্বাভাস। সরকার গঠনের দীর্ঘ আলোচনায় তারাই নির্ণায়ক হয়ে উঠতে পারে। অন্য দিকে, নতুন জোট সরকার গড়ার জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থন নেতানিয়াহুর নাগালের বাইরেই থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা।

তাত্ত্বিক ভাবে আরব দলগুলিকে নিয়ে সরকার গড়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেন আইজেনকট। কিন্তু নির্বাচনের আগেই সেই সম্ভাবনা খারিজ করে দিয়েছিলেন তিনি।

বুথফেরত সমীক্ষার পূর্বাভাস সঠিক হলে ১২০ আসনের নেসেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথ খুঁজতে লিকুদ এবং আইজেনকটের দল ইয়াশার—দু’পক্ষকেই কঠিন লড়াই করতে হবে। তবে লিকুদের সম্ভাব্য ফল আবারও ভোটের আগের অনেক পূর্বাভাসকে ভুল প্রমাণ করতে চলেছে।

এই অচলাবস্থা অবশ্য শেষ পর্যন্ত নেতানিয়াহুর পক্ষেও যেতে পারে। তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন তিনি। তবে এটুকু স্পষ্ট, নতুন জনাদেশ পেয়েছেন বলে দাবি করার অবকাশ তাঁর আর নেই। তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তায় ঝুলছে।

বুথফেরত সমীক্ষা প্রকাশের পরেই বিরোধী নেতারা একে নেতানিয়াহুর পরাজয় বলে তুলে ধরতে শুরু করেন। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইয়ার লাপিদ বলেন, “নেতানিয়াহুর জোটের শোচনীয় পরাজয় হয়েছে। এ এক সম্পূর্ণ ধস। মানুষ ওদের বিদায় নিতে বলেছেন।”

আইজেনকটের কথায়, এই পূর্বাভাস আসলে “নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে অনাস্থার রায়”। তিনি বলেন, “চূড়ান্ত ফল যদি এটাই হয়, তবে তা ইজরায়েলের মূলধারার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সম্পূর্ণ জয়। জাতির ইচ্ছাকে কার্যকর করতে, যত দ্রুত সম্ভব নেতানিয়াহুর সরকার বদলাতে, আমি অবিলম্বে কাজ শুরু করব।”

রাত ১০টায় ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার কথা ছিল। শেষ মুহূর্তে নেতানিয়াহু এবং আরও কয়েকটি দল সেই সময়সীমা বাড়ানোর চেষ্টা করলেও কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি তা খারিজ করে দেয়। এর পরেই প্রকাশিত হয় বুথফেরত সমীক্ষা। প্রধানমন্ত্রী প্রকাশ্যে অভিযোগ করেছিলেন, “বামপন্থী ও আরবরা” নির্বাচন চুরি করার চেষ্টা করছে। নির্বাচন কমিটি সেই অভিযোগ নাকচ করে জানায়, পরিকল্পিত ও সংগঠিত কারচুপির কোনও প্রমাণ তারা পায়নি।

দীর্ঘদিন ধরে চলা দুর্নীতির মামলায় জড়িয়ে থাকা নেতানিয়াহু এবং তাঁর অতি-দক্ষিণপন্থী জোট ভোটের প্রচারে জাতিবিদ্বেষী ভয় উসকে দিয়েছিল। তিনি ক্ষমতায় না থাকলে ইজরায়েল পরমাণু হামলার মুখে অসহায় হয়ে পড়বে—এমন আশঙ্কাও ছড়ানো হয়েছিল।

মঙ্গলবারের নির্বাচনে গত ৫০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ হারে ভোট পড়েছে। এই ভোটকে দেখা হচ্ছিল বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর প্রায় ১৭ বছরের একটানা শাসনের উপর গণভোট হিসেবে। বিশেষত গত তিন বছরে তাঁর নেতৃত্বে দেশ দেখেছে নজিরবিহীন সংঘাত, অস্থিরতা এবং ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা।

এ বার ভোটাধিকার ছিল ৭০ লক্ষেরও বেশি মানুষের। সন্ধ্যা ৬টার মধ্যেই ভোটদানের হার পৌঁছে যায় ৭৭.১ শতাংশে—আগের নির্বাচনের তুলনায় প্রায় ৯ শতাংশ বেশি। কর্মরত সেনাসদস্যদের ভোটদানও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। খবর পাওয়া যায়, ভোট দিতে গত কয়েক দিনে বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছেন কয়েক দশ হাজার ইজরায়েলি। মঙ্গলবারও অনেকে বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে নেমে ভোট দিতে গিয়েছেন।

তেল আভিভ ও হাইফা-সহ বেশ কয়েকটি বড় শহরে বিপুল ভোট পড়েছে। কিছু বিশ্লেষকের মতে, এই প্রবণতা বিরোধীদের সুবিধা করে দিতে পারে। কোথাও কোথাও ভোট দেওয়ার জন্য দীর্ঘ লাইন দেখা গিয়েছে। একই ছবি ছিল ইজরায়েলি আরব অধ্যুষিত শহরগুলিতেও, যেগুলির অনেক জায়গায় দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন বয়কট করার ইতিহাস রয়েছে।

মঙ্গলবার ভোটগ্রহণ শুরু হতেই নেতানিয়াহু এবং তাঁর অতি-দক্ষিণপন্থী জোটসঙ্গীরা সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে টেনে আনতে এমন এক প্রচার শুরু করেন, যাকে সমালোচকেরা আতঙ্ক ছড়ানোর চেষ্টা বলে নিন্দা করেছেন। বিপুলসংখ্যক ইজরায়েলি আরব ভোট দিতে যাচ্ছেন—এই সতর্কবার্তা ছড়িয়ে ফের সেই পরিচিত বর্ণবিদ্বেষী কৌশল নেওয়া হয়। ২০১৫ সালেও সমর্থকদের একজোট করতে একই ধরনের দাবি করেছিলেন নেতানিয়াহু।

ভোটারদের উদ্দেশে একটি রেকর্ড করা বার্তায় নেতানিয়াহু অভিযোগ করেন, আরব ও বামপন্থীরা নির্বাচন চুরি করার চেষ্টা করছে। লিকুদের দাবি, ইজরায়েলি আরবদের ব্যবহৃত কয়েকশো ভোটকেন্দ্রে অনিয়মের সন্দেহ রয়েছে।

প্যালেস্টাইনি বংশোদ্ভূত ইজরায়েলি নাগরিকেরা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ।

নেতানিয়াহুর এই বক্তব্যের পর তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকট অভিযোগ করেন, নির্বাচনের ফল চ্যালেঞ্জ করার জমি তৈরি করছেন প্রধানমন্ত্রী।

আইজেনকট বলেন, “ভোটারদের টানতে নেতানিয়াহু আবার তাঁর সেই পুরনো কৌশল, মিথ্যাচার আর ভয় দেখানোর পথে ফিরেছেন। আগের নির্বাচনী প্রচারগুলিতেও আমরা এই একই মিথ্যে দেখেছি।”

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইজরায়েলের দক্ষিণের জনপদগুলিতে হামাসের প্রাণঘাতী হামলার জন্য বহু মানুষ নেতানিয়াহুর ব্যর্থতাকেই দায়ী করেছিলেন। সেই হামলার পর থেকে ইজরায়েল গাজাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে; প্রাণ হারিয়েছেন ৭৪ হাজারেরও বেশি প্যালেস্টাইনি। একই সময়ে লেবাননে হিজবুল্লার সঙ্গে যুদ্ধ করেছে ইজরায়েল, সিরিয়ার নতুন ভূখণ্ড দখল করেছে এবং আমেরিকার সঙ্গে মিলে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছে।

অধিকৃত ওয়েস্ট ব্যাঙ্কে ইজরায়েলের কার্যকলাপের জন্যও আন্তর্জাতিক নিন্দার মুখে পড়েছেন নেতানিয়াহু এবং তাঁর অতি-দক্ষিণপন্থী জোটসঙ্গীরা। সেখানে উগ্র ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে প্যালেস্টাইনিদের উপর সংগঠিত গণহিংসা এবং জাতিগত উচ্ছেদ অভিযানের অভিযোগ উঠেছে।

দেশের সামনে এত সমস্যা থাকা সত্ত্বেও নির্বাচনী প্রচারের বড় অংশ জুড়ে ছিল প্রধান দুই দলনেতার চরিত্রগত বৈপরীত্য। এক দিকে কূটকৌশলী, চমকপ্রদ ভঙ্গিতে জনসমক্ষে নিজেকে তুলে ধরতে অভ্যস্ত নেতানিয়াহু, যিনি দুর্নীতির মামলায় বিচারাধীন। অন্য দিকে সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা, রাজনীতির মঞ্চে তুলনায় কম চোস্ত প্রাক্তন সেনাপ্রধান আইজেনকট।

ইজরায়েলের মানদণ্ডেও এ বারের প্রচার ছিল অস্বাভাবিক রকম উত্তপ্ত। ভোট শুরুর প্রাক্কালে চাপে থাকা নেতানিয়াহু এমন একটি ছবি পোস্ট করেন, যাতে দেখা যায় পরমাণু বিস্ফোরণে ধ্বংস হচ্ছে তেল আভিভ।

মঙ্গলবার কট্টর ধর্মনিষ্ঠ ইহুদি ভোটারদের উৎসাহিত করতে গিয়ে ফের সর্বনাশের আশঙ্কা উসকে দেন নেতানিয়াহু। দীর্ঘদিন ধরেই নিজের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক অস্তিত্বের সঙ্গে ইজরায়েলের অস্তিত্বকে এক করে দেখিয়েছেন তিনি। এ দিন তাঁর বক্তব্য, “ইহুদি রাষ্ট্র ধ্বংসের কিনারায় দাঁড়িয়ে।”

দুর্নীতির গুরুতর মামলার বিচার আদালতে চলছে অত্যন্ত ধীর গতিতে। তার মধ্যেই একাধিক মধ্য-দক্ষিণপন্থী দলের সম্মিলিত চ্যালেঞ্জে নেতানিয়াহুকে বিচলিত দেখিয়েছে। এই দলগুলির ঐক্যের মূল সুর ছিল একটিই—“নেতানিয়াহু ছাড়া যে কেউ”।

ভোট দেওয়ার পরে সাংবাদিকদের নেতানিয়াহু বলেন, “এ এক অত্যন্ত আবেগঘন এবং ভাগ্যনির্ধারক মুহূর্ত।” নির্বাচনের ফলের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে যে আরব দলগুলি, তারা “বিপুল, সত্যিই বিপুল সমর্থন পাচ্ছে… অভূতপূর্ব সংখ্যায় মানুষ ভোটকেন্দ্রে যাচ্ছে” বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

মঙ্গলবার রাতের পূর্বাভাস যা-ই হোক, ইজরায়েলের বহুধাবিভক্ত রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বহু দল নিজেদের অবস্থান মজবুত করতে দর-কষাকষিতে নামবে। ফলে ভবিষ্যৎ সরকারের চেহারা কী হবে, এবং তার নেতৃত্বে কে থাকবেন, তা স্পষ্ট হতে সম্ভবত আরও কিছুটা সময় লাগবে।

এই পরিস্থিতিতেই গুরুত্ব আরও বেড়েছে ইজরায়েলি আরব দলগুলির। সরকার গঠনের ভাগ্যনিয়ন্তা হয়ে উঠতে পারে তারাই।

ইসলামপন্থী রা’আম দলের প্রধান মনসুর আব্বাস ভোট দিতে গিয়ে বলেন, “আমাদের ভোট সরকার বদলে দেবে।” আরব অধ্যুষিত এলাকাগুলিতে ভোটদানের হার ৭০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

ইজরায়েলের অতি-দক্ষিণপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির অবশ্য বলেন, নেতানিয়াহু এবং তাঁর মিত্রেরা হারলে “সেটা হবে মনসুর আব্বাসের সরকার”। প্যালেস্টাইনি বন্দিদের বিদ্রুপ করা এবং গাজার কিছু প্যালেস্টাইনি “মানুষই নয়” বলে মন্তব্য করার জন্য পরিচিত বেন-গভির।

দেশ যে এক নির্ধারক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, সেই অনুভূতিকেই সামনে এনে বামঘেঁষা সংবাদপত্র হারেৎজ একটি সম্পাদকীয়তে ইজরায়েলিদের ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল। বিপুলসংখ্যায় ভোট দিয়ে সেই আহ্বানে সাড়া দিয়েছেন মানুষ।

সম্পাদকীয়তে বলা হয়, “নেতানিয়াহুর অধীনে আরও চার বছর কাটানোর সামর্থ্য ইজরায়েলের নেই। তার সঞ্চিত শক্তি নিঃশেষিত। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে তার গ্রহণযোগ্যতার ক্ষয় বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছেছে। আর দেশের ক্লান্ত নাগরিকদের সহ্যক্ষমতাও একেবারে শেষ সীমায় এসে ঠেকেছে।”