ইরানের নির্ধারিত নিয়ম অমান্য করে হরমুজ প্রণালী পেরোলে জাহাজগুলিকে ‘শাস্তি’ দেওয়া হবে। শুক্রবার এমনই হুঁশিয়ারি দিল ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। এর মধ্যেই বেআইনি ভাবে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ পেরোনোর চেষ্টার অভিযোগে একটি তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ট্যাঙ্কারে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরানের নৌবাহিনী। তেহরানের দাবি, হামলার পর জাহাজটিতে ভয়াবহ আগুন ধরে যায়।
তবে ইরানের দাবির সঙ্গে মেলে এমন একটি পৃথক ঘটনার খবরও সামনে এসেছে। রয়টার্স জানিয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরশাহির আল জাজিরার প্রায় ১৩ নটিক্যাল মাইল পশ্চিমে একটি জাহাজে অজ্ঞাত কোনও ক্ষেপণাস্ত্র বা গোলার আঘাত লাগে বলে জানিয়েছে ব্রিটেনের সামুদ্রিক বাণিজ্য পর্যবেক্ষণ সংস্থা ইউকেএমটিও। আগুন ধরে গেলেও পরে তা নিভিয়ে ফেলা হয়। তবে এই ঘটনা এবং ইরানের দাবি করা ট্যাঙ্কারে হামলা একই কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
‘প্রতি রাতেই অভিযান’
আইআরজিসির নৌবাহিনীর রাজনৈতিক বিভাগের উপপ্রধান আলি মহম্মদির দাবি, যুদ্ধের শুরু থেকেই দেশের স্বার্থ রক্ষায় প্রতি রাতে হরমুজ প্রণালীতে অভিযান চালাচ্ছে ইরানি বাহিনী।
ফারস সংবাদ সংস্থাকে তিনি বলেন, “যুদ্ধের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত প্রতি রাতে দেশের স্বার্থ রক্ষায় এই অভিযান চালিয়েছে আইআরজিসির নৌবাহিনী।”
মহম্মদির আরও দাবি, সংঘাতের প্রথম দিন থেকেই এই জলপথে ‘সম্পূর্ণ ও নিরঙ্কুশ নজরদারি’ বজায় রেখেছে আইআরজিসি। তাদের নির্ধারিত নিয়ম লঙ্ঘন করছে বলে মনে হলে যে কোনও জাহাজের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করার ক্ষমতাও রয়েছে বাহিনীর।
বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যে চাপ
উপসাগরীয় অঞ্চলকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌবাণিজ্য পথ ঘিরে প্রায় আট মাস ধরে চলা সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও অস্থিরতা বেড়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা ও ইজরায়েলের ইরানে হামলার পর সংঘাত আরও তীব্র হয়। ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর পর পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিগুলিতে হামলা চালায় তেহরান এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করে। তার পর থেকেই জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
এক দিকে হরমুজে জাহাজ চলাচলের উপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চাইছে তেহরান, অন্য দিকে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল ফের স্বাভাবিক করতে চাপ দিচ্ছে ওয়াশিংটন।
যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালী দিয়ে যেত। ফলে সেখানে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। বেড়েছে পরিবহণ ও বিমার খরচও। বিশ্ববাজারে তেলের দামের ওঠানামা আরও তীব্র হয়েছে।
বিকল্প পথেও আপত্তি তেহরানের
হরমুজ প্রণালীর ওমানের দিকের জলসীমার কাছাকাছি বিকল্প নৌপথ চালুর প্রচেষ্টাতেও আপত্তি জানিয়েছে ইরান। তেহরানের বক্তব্য, জাহাজগুলিকে তাদের অনুমোদিত পথ ধরেই চলতে হবে।
রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা আধিকারিকদের দাবি, আঞ্চলিক দেশগুলিকে সতর্ক করেছে ইরান। তেল রফতানির বিকল্প পথ চালুর চেষ্টা হলে তাকে শত্রুতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হতে পারে বলে জানিয়েছে তেহরান।
এক সপ্তাহে ১২টি হামলার ঘটনা
তিনটি সামুদ্রিক নিরাপত্তা সূত্রের তথ্যের ভিত্তিতে রয়টার্স জানিয়েছে, ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে ৫ অক্টোবরের মধ্যে হরমুজ প্রণালী ও তার আশপাশে তেল, এলএনজি এবং এলপিজিবাহী ট্যাঙ্কারকে নিশানা করার অন্তত ১২টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর কোনও এক সপ্তাহে এটিই সর্বোচ্চ সংখ্যা।
এই তালিকায় সরাসরি হামলার পাশাপাশি হামলার চেষ্টা ও জাহাজকে হয়রানি করার ঘটনাও রয়েছে। জাহাজের উপর দিয়ে ড্রোন ওড়ানো, নজরদারি চালানো এবং বেতারবার্তায় সতর্ক করার ঘটনাও এর অন্তর্ভুক্ত।
এর প্রভাব পড়েছে জাহাজ চলাচলেও। তথ্য বিশ্লেষণকারী সংস্থা কেপলারের হিসাব অনুযায়ী, ৬ অক্টোবর মাত্র সাতটি পণ্যবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করেছে। দু’মাসেরও বেশি সময়ের মধ্যে এক দিনে জাহাজ চলাচলের এটিই সর্বনিম্ন সংখ্যা।
রয়টার্সের উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ চলাকালীন সর্বোচ্চ স্তরের তুলনায় এই জলপথ দিয়ে অপরিশোধিত তেলের পরিবহণ ২৭ শতাংশ কমে দৈনিক অন্তত ১ কোটি ১ লক্ষ ব্যারেলে নেমেছে।
জাহাজে হামলার দাবি, চলাচলে বিধিনিষেধ এবং বিকল্প নৌপথ নিয়ে বিরোধ—সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালী এখন আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম উদ্বেগের কেন্দ্র। এই জলপথে উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে তার প্রভাব পড়তে পারে তেলের সরবরাহ, পরিবহণ খরচ এবং বিশ্ববাজারের দামের উপর।