মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে বৈঠকের পর রাশিয়া, আমেরিকা ও ইউক্রেনের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় আলোচনা ফের শুরু করতে নীতিগত সম্মতি জানিয়েছিলেন ভ্লাদিমির পুতিন। তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যাপক হামলা চালাল রাশিয়া। এই আক্রমণকে নিজেদের সামরিক শক্তি ও যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার অভিপ্রায় প্রদর্শনের পদক্ষেপ হিসেবেই দেখছেন অনেকে।

রাতভর রুশ হামলায় কিয়েভে অন্তত দু’জন নিহত এবং ২২ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে চারটি শিশু রয়েছে। হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নিপার নদীর উপর দক্ষিণের সেতু, সাধারণ মানুষের বাড়িঘর, জ্বালানি পরিকাঠামো, একটি অ্যাম্বুল্যান্স কেন্দ্র, বিভিন্ন দফতরের ভবন এবং একটি চিকিৎসাকেন্দ্র।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, তিনটি ক্ষেপণাস্ত্রে গুচ্ছবোমাবাহী ওয়ারহেড ছিল। একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে পেচেরস্কি জেলায়। সেখানে একটি মঠ-সহ একাধিক ঐতিহাসিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

জেলেনস্কির কথায়, “এই হামলা আরও একবার অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য প্রকাশ করে দিল। কারণ, এর কোনও কিছুই ঘটনাচক্রে ঘটেনি। অস্ত্র বেছে নেওয়া হয়েছে সচেতনভাবে; কোন এলাকায় আঘাত করা হবে, তা-ও সচেতনভাবে ঠিক করা হয়েছে। সাধারণ মানুষের যত বেশি সম্ভব প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি ঘটানোর উদ্দেশ্যও ছিল সুচিন্তিত।”

তাঁর মতে, এই হামলাই প্রমাণ করে যে শান্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়ে রাশিয়া আন্তরিক নয়। জেলেনস্কি বলেন, “আরও এক দফা আলোচনার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই রাশিয়া এমন একটি হামলা চালাল, যার মাধ্যমে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে। এর অর্থ, যা ঘটছে, সে বিষয়ে তাদের মনোভাবের কোনও প্রকৃত পরিবর্তন হয়নি।”

বুধবার সেন্ট পিটার্সবার্গে পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের সময় তাঁকে প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়েছিলেন উইটকফ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমার প্রেসিডেন্ট, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে একজন মানবদরদি, সে কথা আপনি এতবার বলেন। আপনিও একজন মানবদরদি, স্যার। এ জন্য আপনাকে কুর্নিশ জানাই।”

বৃহস্পতিবার ভোরের হামলার পর সমাজমাধ্যমে তীব্র শ্লেষাত্মক জবাব দেন জেলেনস্কি। তিনি লেখেন, “গত সন্ধ্যা থেকে রাশিয়ার ‘মানবদরদিরা’ তিন দফায় কিয়েভে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। তারা ব্যবহার করেছে ২১টি ক্ষেপণাস্ত্র।”

ইউক্রেনের পশ্চিমি সহযোগীদের মধ্যে যাঁরা “পরিস্থিতিকে তার প্রকৃত চেহারায় দেখছেন” এবং ক্রেমলিনের যুদ্ধ থামানোর ইচ্ছা যে সামান্যই, সেই “বাস্তবতা স্বীকার করছেন”, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান জেলেনস্কি। একই সঙ্গে তিনি আরও শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রুশ ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসে সক্ষম প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর এবং মস্কোর বিরুদ্ধে আরও নিষেধাজ্ঞার দাবি জানান।

ইউক্রেনের বিদেশমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহার বক্তব্য, “তোষণ, দাসসুলভ আনুগত্য আর চাটুকারিতা” দিয়ে রাশিয়ার আগ্রাসন থামানো যাবে না।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর দফতর ডাউনিং স্ট্রিটও পুতিন সম্পর্কে উইটকফের এই বর্ণনার সঙ্গে একমত নয় বলে জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য, রুশ প্রেসিডেন্ট “হাজার হাজার” ইউক্রেনীয় এবং যুদ্ধের সামনের সারিতে থাকা নিজের দেশের সেনাদের মৃত্যুর জন্য দায়ী।

বুধবার ক্রেমলিনের বিদেশনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা ইউরি উশাকভ জানিয়েছিলেন, রাশিয়া, আমেরিকা ও ইউক্রেনকে নিয়ে ত্রিপক্ষীয় আলোচনা ফের শুরু করতে পুতিন “নীতিগতভাবে” সম্মত হয়েছেন। আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনের এক সপ্তাহ পর, অর্থাৎ ১০ নভেম্বরের পরে, এই আলোচনা হতে পারে বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু কিয়েভের আধিকারিকদের আশঙ্কা, আগামী কয়েক সপ্তাহে ইউক্রেনের জ্বালানি পরিকাঠামো ধ্বংস করাই রাশিয়ার লক্ষ্য। এর ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষকে বিদ্যুৎহীন অবস্থায় প্রবল ঠান্ডার মধ্যে দিন কাটাতে হতে পারে।

জেলেনস্কি জানিয়েছেন, রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া আবার শুরু করেছে আমেরিকা।

এদিকে, বৃহস্পতিবার ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, ইলন মাস্ককে ফোন করে স্টারশিল্ডের গতি কমিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে বলেছেন ট্রাম্প। মাস্কের উপগ্রহভিত্তিক ইন্টারনেট পরিষেবা স্টারলিঙ্কের সামরিক সংস্করণ হল স্টারশিল্ড। এই ব্যবস্থার গতি কমে যাওয়ায় শত্রুপক্ষের ড্রোন প্রতিহত করা এবং যুদ্ধক্ষেত্রে মাঝারি পাল্লার আঘাত হানার ক্ষেত্রে ইউক্রেনের সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল বলে অভিযোগ।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, কয়েক জন ইউক্রেনীয় আধিকারিক সংবাদপত্রটিকে জানিয়েছেন, ট্রাম্পের ফোনের পর থেকে ব্যবস্থাটি কিছুটা ভালো কাজ করছে। তবে অন্যদের বক্তব্য, এর উপর এখনও ব্যাপক বিধিনিষেধ রয়েছে।

নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদনেও দাবি করা হয়েছে, গত সপ্তাহে স্টারশিল্ডের গতি কমিয়ে দেওয়ার পর রাশিয়ার সামরিক লক্ষ্যবস্তুর দিকে এগিয়ে যাওয়া কয়েক ডজন সশস্ত্র ড্রোন আকাশ থেকে পড়ে যায়। সংবাদপত্রটির বক্তব্য, স্টারশিল্ডের সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হতেই ড্রোনগুলির যাত্রাপথ দেখানো সরাসরি ভিডিওচিত্র হঠাৎ ঝাপসা হয়ে যায়।

কিয়েভের সুরক্ষায় নিয়োজিত একটি আকাশ প্রতিরক্ষা ইউনিটের কমান্ডার ভ্লাদিমির জানিয়েছেন, মার্কিন বিধিনিষেধের কারণে রুশ ড্রোন প্রতিহত করার ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাঁর কথায়, “অবশ্যই এতে আমাদের কাজে বাধা পড়ছে। শত্রুপক্ষের লক্ষ্যবস্তুকে আটকাতে যে গতিতে পৌঁছনো দরকার, আমাদের ড্রোন আর সেই গতিতে পৌঁছতে পারছে না।”

ওয়াশিংটন তাঁদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে বলেও মনে হচ্ছে তাঁর।

ইউক্রেনের ড্রোন কর্মসূচির সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত করার এই সিদ্ধান্ত এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন ওয়াশিংটন ও কিয়েভের মধ্যে তীব্র বিরোধ চলছে। প্রায় পাঁচ বছর আগে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকে দুই দেশের সম্পর্কে এটিই সবচেয়ে গুরুতর সংঘাত বলে বর্ণনা করা হচ্ছে।

আমেরিকায় জ্বালানির দাম কমাতে রাশিয়ার ডিজেলের উপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার ঘোষণা করেছিলেন ট্রাম্প। সেই সিদ্ধান্তকে জেলেনস্কি “দুর্বল” পদক্ষেপ বলে সমালোচনা করার পর থেকেই বিরোধের সূত্রপাত।

ট্রাম্প প্রশাসন অবশ্য ইচ্ছাকৃতভাবে রাশিয়াকে সাহায্য করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। কিন্তু ইউরোপীয় কূটনীতিকদের একাংশের মতে, আমেরিকার অবস্থান যেন বদলে গিয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, এর পরিণতি ভোগ করতে হচ্ছে ইউক্রেনের সাধারণ মানুষকে।

এদিকে, রাশিয়া জানিয়েছে, রাতের হামলায় ইউক্রেনের পাঠানো কয়েকশো ড্রোন গুলি করে নামিয়েছে তারা। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের দাবি, রাশিয়ার বেলগোরোদ অঞ্চলে ইউক্রেনের আকাশপথে হামলায় এক ব্যক্তি নিহত এবং অন্য এক জন আহত হয়েছেন।

যুদ্ধের অন্য ফ্রন্টে, ইউক্রেনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর কুপিয়ানস্কে সুড়ঙ্গপথে চালানো একটি পাল্টা অভিযানের বিবরণও প্রকাশ্যে এসেছে। শহরটির একাংশ এখনও রাশিয়ার দখলে। ইউক্রেনীয় বাহিনীর দাবি, ‘অপারেশন ভেলেস’-এর অংশ হিসেবে খার্তিয়া কোর মাটির নীচ দিয়ে এগিয়ে শত্রুপক্ষের পিছনের এলাকায় ১৫ কিলোমিটার ঢুকে পড়ে। তাদের দাবি, এটিই বিশ্বের প্রথম ভূগর্ভস্থ পাল্টা আক্রমণ।

খার্তিয়ার কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইহর ওবোলেনস্কি ইউক্রেনীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “শত্রুপক্ষ মাটির নীচে কীভাবে কাজ করে, আমরা তা পর্যবেক্ষণ করেছি এবং তাদের পদ্ধতি খতিয়ে দেখেছি। আমাদের বাহিনীর পিছনের দিকে অনুপ্রবেশের জন্য গ্যাসের পাইপলাইন ব্যবহার করতে চেয়েছিল রুশরা। তাই আমরাই মাটির নীচে নেমে পড়ি।”

যোগাযোগব্যবস্থা, জিপিএস কিংবা আলো ছাড়াই ইউক্রেনীয় সেনারা সুড়ঙ্গের মধ্যে দিয়ে ১৫ কিলোমিটার হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়েছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে। তার আগে পথ চিনে এগোনো এবং ওই পরিবেশে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিও তৈরি করে নিয়েছিলেন তাঁরা।

খার্তিয়া কোরের দাবি, এই অভিযানে প্রায় ১০০ জন রুশ সেনা নিহত হয়েছেন এবং ৩০ জনকে বন্দি করা হয়েছে। তবে এই হতাহতের দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।