বাবার বিরুদ্ধে শিশুদের যৌন নির্যাতনের ছবি রাখার অভিযোগ, ২০১৯ সালেই জানিয়েছিল লন্ডন পুলিশ

ডাচেস অব সাসেক্স মেগানের বাবা টমাস মার্কেল সিনিয়রের বিরুদ্ধে শিশুদের যৌন নির্যাতনের ছবি রাখার অভিযোগ প্রকাশ্যে আসতেই নতুন করে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। শুক্রবার লন্ডনের মেট্রোপলিটন পুলিশ জানিয়েছে, টমাসকে ঘিরে কথিত অপরাধের অভিযোগসংক্রান্ত একটি চিঠি ২০১৯ সালের জানুয়ারিতেই পেয়েছিল তারা। পরে সেই চিঠির কথা জানানো হয়েছিল মেগানকে।

স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের দাবি, চিঠিতে ব্রিটেনের বাইরে সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগ করা কয়েকটি অপরাধের উল্লেখ ছিল। বিষয়টি ডিউক ও ডাচেস অব সাসেক্সের দফতরকে জানানো হলেও অভিযোগের বিস্তারিত তথ্য অন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলির কাছে পাঠানো হয়নি।

ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য সান-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মেগানের বৈমাত্রেয় ভাই টমাস মার্কেল জুনিয়র দাবি করেছেন, ফিলিপিন্সে তাঁদের বাবার আগের বাড়িতে তিনি শিশুদের যৌন নির্যাতনের বহু ছবি খুঁজে পেয়েছিলেন। তাঁর অভিযোগ, চারটি বড় বাক্সে রাখা কম্পিউটার ও মোবাইল ফোনে ছবিগুলি ছিল।

শুক্রবার মেগান জানান, মেট্রোপলিটন পুলিশের কাছ থেকেই তিনি এই অভিযোগগুলির কথা জানতে পেরেছিলেন। ঘটনাটি তাঁকে ‘গভীরভাবে বিচলিত’ করেছে বলেও জানান তিনি।

বাবার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই সম্পর্ক নেই মেগানের। তাঁর বক্তব্য, নিজের দুই সন্তান—সাত বছরের প্রিন্স আর্চি ও পাঁচ বছরের প্রিন্সেস লিলিবেটের নিরাপত্তার কথা ভেবেই তিনি এই দূরত্ব বজায় রেখেছেন। টমাস মার্কেল সিনিয়রের সঙ্গে তাঁর দুই নাতি-নাতনির কখনও দেখাও হয়নি।

মেগান ও তাঁর স্বামী প্রিন্স হ্যারি সম্প্রতি আমেরিকা থেকে ব্রিটেনে ফিরেছেন।

এ দিকে, তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন টমাস মার্কেল সিনিয়র। ডেইলি মেল-কে তিনি এই অভিযোগগুলিকে ‘বিকৃত মিথ্যাচার’ বলে বর্ণনা করেছেন।

কী বলছে পুলিশ?

মেট্রোপলিটন পুলিশ জানিয়েছে, ২০১৯ সালে অভিযোগগুলি যেভাবে সামলানো হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ বিষয়ে পুলিশের ভূমিকা পর্যালোচনার জন্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট অফিস ফর পুলিশ কনডাক্ট (আইওপিসি)-এর কাছে বিষয়টি পাঠানো প্রয়োজন কি না, তা-ও বিবেচনা করা হচ্ছে।

পুলিশের এক মুখপাত্রের বিবৃতি অনুযায়ী, নথিপত্র বিস্তারিত পর্যালোচনার পরে নিশ্চিত হওয়া গিয়েছে, ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে একটি চিঠি এসেছিল। তাতে ব্রিটেনের বাইরে সংঘটিত হয়েছে বলে দাবি করা কয়েকটি অপরাধের উল্লেখ ছিল।

মেগানের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে চিঠিটি পুলিশের প্রোটেকশন কমান্ডে পাঠানো হয়। পরে সেটি ডিউক ও ডাচেস অব সাসেক্সের দফতরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যাতে তাঁদের বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত করা যায়।

তবে চিঠিতে উল্লিখিত অভিযোগগুলির বিস্তারিত তথ্য অন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলিকে জানানো হয়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ। কেন এবং কীভাবে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তা-ও এখন পর্যালোচনার আওতায়।

মেগানের প্রতিক্রিয়া

নিজের মুখপাত্রের মাধ্যমে প্রকাশিত বিবৃতিতে মেগান বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় প্রকাশ্যে আসা খবর তাঁকে গভীরভাবে বিচলিত করেছে। তাঁর কথায়, ‘যে শিশুরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারে, তাদের কথাই আমার মনে হচ্ছে।’

তিনি জানান, ২০১৮ সালে মেট্রোপলিটন পুলিশ এবং রয়্যালটি অ্যান্ড স্পেশালিস্ট প্রোটেকশন (রাস্প)-এর কাছে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছিল। পরে সেই চিঠি তাঁকে দেখানো হয়। তাতে তাঁর বাবার বিরুদ্ধে উদ্বেগজনক অভিযোগ ছিল বলে দাবি করেন মেগান। তাঁকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল যে, অভিযোগগুলির তদন্ত চলছে।

মেগানের বক্তব্য, বাবার সঙ্গে তাঁর দূরত্ব এবং সন্তানদের সঙ্গে তাঁর বাবাকে যোগাযোগ করতে না দেওয়ার সিদ্ধান্তের পিছনে মূল কারণ ছিল শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

তিনি বলেন, ‘আশা করি, এখন বোঝা যাবে—বছরের পর বছর কয়েকটি সংবাদমাধ্যম বিষয়টিকে বিকৃতভাবে তুলে ধরলেও, বাবার সঙ্গে আমার দূরত্ব এবং আমাদের সন্তানদের সঙ্গে তাঁকে যোগাযোগ করতে না দেওয়ার সিদ্ধান্তের কারণ ছিল একটিই: তাদের সুরক্ষিত রাখা।’

মেগানের আরও বক্তব্য, তিনি বিশ্বাস করেছিলেন যে কর্তৃপক্ষ অন্য শিশু ও পরিবারগুলির নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও একই রকম সতর্কতা অবলম্বন করছে।

ঘটনার ব্যাপকতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, সামনে আসা তথ্যের ভয়াবহতা তাঁর কল্পনারও বাইরে। তবে তাঁর আশা, পূর্ণ ন্যায়বিচার হবে এবং শিশুদের নিরাপত্তাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে।

তারিখ নিয়ে বিভ্রান্তি

মেগানের প্রথম বিবৃতিতে একটি তারিখগত অসংগতি দেখা যায়। তিনি জানান, ২০১৮ সালে পুলিশ ও রাস্পের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু পরে তিনি স্বীকার করেন, পুলিশ তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করার বছরটি মনে করতে গিয়ে ভুল করেছিলেন। সঠিক বছরটি ছিল ২০১৯।

মেগানের মুখপাত্রের বক্তব্য, সাত বছরেরও বেশি আগের কোনও ঘটনা মনে করতে গিয়ে, ডায়েরির নোট বা সমসাময়িক নথি হাতের কাছে না থাকলে, কয়েক মাসের হেরফের হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

তাঁর মতে, পুলিশের কাছে যদি চিঠি পাওয়ার ও পর্যালোচনার নির্দিষ্ট তারিখ-সহ নথি থাকে, তা হলে ঘটনাক্রম নির্ধারণের ক্ষেত্রে সেই নথিকেই নির্ভরযোগ্য ভিত্তি হিসেবে ধরা উচিত।

মুখপাত্র আরও জানান, ডায়েরিতে লিখে না রাখা এত পুরনো ঘটনার নির্দিষ্ট সময় মনে করার চেষ্টা করছিলেন মেগান। সেই কারণে সময়ের হিসাবে সামান্য ভুল হওয়া বোধগম্য।

সূত্রের দাবি, ২০১৯ সালে অভিযোগগুলির কথা জানলেও মেগান প্রকাশ্যে তা নিয়ে কথা বলতে পারেননি। তাতে ভবিষ্যতের তদন্ত ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা ছিল। প্রকাশ্যে মন্তব্য করলে তাঁর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের সম্ভাবনাও ছিল বলে সূত্রের বক্তব্য।

কী দাবি করেছেন মেগানের ভাই?

দ্য সান-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, টমাস মার্কেল জুনিয়র ফিলিপিন্সের গোয়েন্দাদের কাছে দাবি করেছেন, সেবুতে তাঁদের বাবার বাড়িতে রাখা চারটি বড় বাক্সের মধ্যে থাকা কম্পিউটার ও মোবাইল ফোনে তিনি শিশুদের যৌন নির্যাতনের ‘শত শত, এমনকি হাজার হাজার’ ছবি খুঁজে পেয়েছেন।

স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার পরে মে মাসে আমেরিকায় ফিরে যাওয়ার আগে পর্যন্ত টমাস মার্কেল সিনিয়র ওই বাড়িতে থাকতেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

৬০ বছরের টমাস মার্কেল জুনিয়র আরও দাবি করেছেন, তিনি আমেরিকার কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআইয়ের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছেন।

তবে অভিযোগগুলির সত্যতা, কথিত ছবিগুলির প্রকৃতি এবং সেগুলি নিয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। পুলিশও জানিয়েছে, ২০১৯ সালে বিষয়টি কীভাবে সামলানো হয়েছিল, তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে।