৭ সেপ্টেম্বর ভোররাতে ভারী অস্ত্রে সজ্জিত পুলিশের একটি কনভয় মধ্য ব্রাসেলসের ঘুমন্ত রাস্তা পেরিয়ে পৌঁছল শহরের উত্তর-পূর্ব প্রান্তের হারেন এলাকায়। গন্তব্য ২২ অ্যাভিনিউ দু বুর্জে—সামরিক দুর্গের মতো দেখতে, বাঙ্কারের আদলে তৈরি একটি ভবনচত্বর। একসময় এখানেই ছিল ন্যাটোর সদর দফতর।

১৯৬৭ সালে তড়িঘড়ি তৈরি হওয়া এই আধুনিক ভবনচত্বরের স্থাপত্যে আড়ম্বরের চেয়ে কাজের প্রয়োজনকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। এখানেই রয়েছে জাস্টিশিয়া আদালতকক্ষ, যেখানে এখন বেলজিয়ামের গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলির বিচার হয়। ২০১৫ সালের প্যারিস এবং ২০১৬ সালের ব্রাসেলসের সন্ত্রাসবাদী হামলার অভিযুক্ত ও সহযোগীদের বিচারও হয়েছিল এই আদালতে।

গত মাসে সেই ভবনের চওড়া করিডরে অ্যাসল্ট রাইফেল হাতে টহল দিচ্ছিলেন পুলিশকর্মীরা। তাঁদের দায়িত্ব, চলতি দশকের অন্যতম আলোচিত বিচার—ব্রেসার্স-কার্ভালহো মামলার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

এক মাস ধরে চলা শুনানিতে প্রধান আদালতকক্ষের বুলেটপ্রতিরোধী কাচের দেওয়ালের এক দিকে ছিলেন বিচারক, আইনজীবী, সাংবাদিক ও সাধারণ দর্শকেরা। অন্য দিকে ৩১ জন অভিযুক্ত। তাঁদের দু’পাশে পাহারায় থাকা পুলিশকর্মীদের মুখ ঢাকা ছিল, যাতে সম্ভাব্য প্রতিশোধমূলক হামলা থেকে তাঁদের পরিচয় গোপন রাখা যায়। এমন দৃশ্য সাধারণত মাফিয়াদের দাপটে বিপর্যস্ত দেশগুলিতেই বেশি দেখা যায়।

এই দীর্ঘ শুনানিতে অভিযুক্তদের মধ্যে বিশেষ ভাবে নজর কেড়েছিলেন দু’জন। প্রথম জন ৪০ বছরের ফ্লোর ব্রেসার্স। বেলজিয়ামের লিমবুর্গ প্রদেশের ৩৫ হাজার মানুষের শহর লোমেলে তাঁর জন্ম। অপরাধজগতের চেনা ছকের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঠিক মেলে না। ব্রাসেলসের ফ্রি ইউনিভার্সিটি, অর্থাৎ ভিইউবি থেকে অপরাধবিজ্ঞানে স্নাতক ব্রেসার্স। সঙ্গীরা তাঁকে প্রায়ই ডাকত ‘প্রফেসর’ বা ‘অ্যাকাডেমিক’ বলে।

কিন্তু তাঁর সবচেয়ে পরিচিত ডাকনামটি সেই মার্জিত ভাবমূর্তির সম্পূর্ণ বিপরীত—‘ফিঙ্গার কাটার’, অর্থাৎ ‘আঙুল-কাটা’।

২০২২ সালে জুরিখের বিলাসবহুল রেনেসাঁ জুরিখ টাওয়ার হোটেলের একটি পেন্টহাউসে স্ত্রীর সঙ্গে ওয়াইনের স্বাদপরীক্ষার আসরে বসেছিলেন ব্রেসার্স। সেখান থেকেই তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে অপহরণ, বেআইনি ভাবে আটকে রাখা, আগ্নেয়াস্ত্র দেখিয়ে অর্থ আদায় এবং অপরাধী সংগঠন পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, ওই সংগঠনের আর এক প্রধান ব্যক্তি ৬৮ বছরের ব্রাজিলীয় সের্জিও রোবের্তো দে কার্ভালহো। ইন্টারপোল, ইউরোপোল, ব্রাজিলের ফেডারেল পুলিশ এবং আমেরিকার ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা ডিইএ-র যৌথ অভিযানে ২০২২ সালের ২১ জুন তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টে দানিউব নদীর ধারের একটি বিলাসবহুল হোটেলে ছিলেন তিনি।

কার্ভালহোর কাজকর্মের কেন্দ্র ছিল ব্রাজিলের মাতো গ্রোসো দো সুল রাজ্য। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ও প্যারাগুয়ের সীমান্তবর্তী এই অঞ্চল দক্ষিণ আমেরিকার সংগঠিত অপরাধের অন্যতম কেন্দ্র। নিজের দেশে কার্ভালহো পরিচিত ছিলেন ‘মেজর’ নামে। একসময় সামরিক পুলিশের অফিসার ছিলেন তিনি; সেই পদ থেকেই এই নামের উৎপত্তি। জীবনের সেই পর্বেই তাঁর কর্মকাণ্ডে দুর্নীতি ও অপরাধ জড়িয়ে পড়ে। ইউরোপে অবশ্য তাঁর ডাকনাম আরও স্পষ্ট—‘ব্রাজিলের এসকোবার’।

বেলজিয়ামের কড়া নিরাপত্তায় ঘেরা আদালতে এই দুই অভিযুক্তকে ঘিরেই মূলত আবর্তিত হয়েছে বিচার। তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সামনে এনেছে লাতিন আমেরিকা থেকে ইউরোপ পর্যন্ত বিস্তৃত আন্তর্জাতিক কোকেন পাচারচক্রের চেহারা।

অভিযোগ, ব্রেসার্স ও কার্ভালহো এমন একটি সংগঠনের নেপথ্যে ছিলেন, যেটি ইউরোপে ৪৫ টন পর্যন্ত কোকেন পাঠিয়েছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।

সরকারি কৌঁসুলিদের বক্তব্য, তাঁরা আইনকে অগ্রাহ্য করে চলা একটি বহুজাতিক অপরাধচক্র পরিচালনা করতেন। আড়াল হিসেবে ব্যবহৃত বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে শত শত মিলিয়ন ডলারের লেনদেন চলত। ওই সংস্থাগুলির মধ্যে ছিল অ্যান্টওয়ার্পের জল পরিশোধন সংস্থা ক্রিভা রোকেম। এই সংস্থার নাম থেকেই মামলাটি বিকল্প একটি নাম পেয়েছে।

অভিযোগ, ক্রিপ্টোকারেন্সি, আর্থিক বাজার ও সম্পত্তিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে পাচারের টাকা বৈধ আয়ের চেহারা দেওয়া হত। সেই অর্থেই চলত কোকেন পরিবহণের জটিল ব্যবস্থা। পেরু ও বলিভিয়ায় উৎপাদিত কোকেন ব্রাজিলের প্রত্যন্ত বেআইনি পথ ধরে নিয়ে যাওয়া হত। তার পর আটলান্টিক পেরিয়ে তা ছড়িয়ে পড়ত ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। ঠিক কতগুলি দেশে এই মাদক পৌঁছত, তা স্পষ্ট নয়।

‘আঙুল-কাটা’র অতীত

২০২১ সাল থেকে ইউরোপোলের সবচেয়ে বেশি খোঁজা পলাতকদের তালিকায় ছিলেন ব্রেসার্স। সংস্থাটির বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, অপহরণ, বেআইনি ভাবে স্বাধীনতা হরণ, আগ্নেয়াস্ত্র দেখিয়ে অর্থ আদায় এবং অপরাধী সংগঠনে অংশগ্রহণের অভিযোগে তাঁকে খোঁজা হচ্ছিল।

২০১০ সালের একটি মামলায় অভিযোগ উঠেছিল, পুরনো শত্রুতার প্রতিশোধ নিতে তিনি একটি হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেই ঘটনায় আক্রান্ত ব্যক্তির একটি আঙুল গাছের ডাল ছাঁটার কাঁচি দিয়ে কেটে ফেলা হয়। সেখান থেকেই ব্রেসার্সের ‘আঙুল-কাটা’ ডাকনামের জন্ম। তবে প্রমাণের অভাবে ২০১৫ সালে ওই মামলায় তিনি খালাস পান।

পাঁচ বছর পরে, ২০২০ সালে, প্রতিশোধমূলক আর একটি ঘটনায় তিনি দোষী সাব্যস্ত হন। এক ডাচ মাদক ব্যবসায়ীকে অপহরণ করা হয়েছিল। কোকেনের একটি চালান উধাও হওয়ার দায় তাঁর উপর চাপানো হয়। তাঁকে মারধর করা হয়, প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় এবং রেজর ব্লেড দিয়ে শরীর কেটে দেওয়া হয়। এর পর ব্রেসার্স পালিয়ে যান। দু’বছর পলাতক ছিলেন তিনি।

দক্ষিণ আমেরিকার দেশ গায়ানায় ঘটে যাওয়া আরও একটি হিংসাত্মক ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে তাঁর নাম উঠেছিল। সেখানে এক চালের পাইকারি ব্যবসায়ীর মৃত্যু হয়। ওই ব্যবসায়ীর আটক করা একটি চালানে কোকেন পাওয়া গিয়েছিল। মনে করা হয়, পাচারচক্রের কাজকর্মের তথ্য যাতে ফাঁস না হয়, তা নিশ্চিত করতেই তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল। তবে সেই মামলাও বিচারের পর্যায়ে পৌঁছয়নি।

‘ব্রাজিলের এসকোবার’-এর উত্থান

ব্রেসার্সের কথিত সহযোগী কার্ভালহো সম্ভবত ব্রাজিলের চেয়ে ইউরোপেই বেশি পরিচিত। ব্রাজিলের আদালতের নথি অনুযায়ী, তিনি এমন একটি গোষ্ঠী পরিচালনা করতেন, যারা পেরু ও বলিভিয়ায় উৎপাদিত কয়েক দশ টন কোকেন কিনে ব্রাজিলের মধ্য-পশ্চিমাঞ্চল দিয়ে পারানাগুয়া ও নাটাল বন্দরে নিয়ে যেত। সেখান থেকে জাহাজে করে মাদক পাঠানো হত ইউরোপে।

১৯৫৮ সালে ব্রাজিলের দক্ষিণাঞ্চলীয় পারানা রাজ্যের ইবিপোরাঁয় জন্ম কার্ভালহোর। বড় হয়েছেন মাতো গ্রোসো দো সুলে। ওই রাজ্যে পুলিশ অফিসার হিসেবে কর্মরত থাকতেই অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়েন তিনি। মাদক পাচারের অভিযোগে ১৯৯৮ সালে প্রথম বার তাঁর ১৫ বছরের কারাদণ্ড হয়। কিন্তু পুলিশ থেকে তাঁকে বরখাস্ত করা হয় আরও অনেক পরে, ২০১০ সালে।

লাতিন আমেরিকায় বসে কারবার চালিয়ে যাওয়ার বদলে ‘ব্রাজিলের এসকোবার’ চলে আসেন ইউরোপে। প্রথমে পর্তুগাল, তার পর স্পেনে আত্মগোপন করেন।

স্পেনের পুলিশের বক্তব্য, কোস্তা দেল সোলের মারবেইয়ায় ২০ লক্ষ ইউরো দামের একটি প্রাসাদোপম বাড়িতে থাকতে শুরু করেন তিনি। পরিচয় ব্যবহার করছিলেন পল ওয়াউটার নামে এক ধনী সুরিনামি নাগরিকের। আন্তর্জাতিক কোকেন পাচারের পরিচিত কেন্দ্র স্পেনের এই ঘাঁটি থেকেই ২০১৭ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে পর্তুগাল ও স্পেনজুড়ে বিস্তৃত একটি অপরাধচক্রের কাজকর্ম সমন্বয় করতেন তিনি—এমনই অভিযোগ সরকারি কৌঁসুলিদের।

চক্রটি মূলত বন্দর দিয়ে মাদক পাচারে দক্ষ ছিল। লিসবনের কাছে সেতুবাল, উত্তর পর্তুগালের লেইশোঁইশ এবং লিসবন বিমানবন্দর ছাড়াও রটারডাম ও অ্যান্টওয়ার্প বন্দর ব্যবহার করা হত।

পর্তুগালের পুলিশের সন্দেহ ছিল, ব্রাজিলের প্রধান অপরাধী সংগঠন প্রিমেইরো কোমান্দো দা ক্যাপিটাল—সংক্ষেপে পিসিসি, ইংরেজিতে ‘ফার্স্ট ক্যাপিটাল কমান্ড’—এর সঙ্গে কার্ভালহোর যোগাযোগ রয়েছে।

২০২০ সালের নভেম্বরে এক সমন্বিত অভিযানে কার্ভালহো প্রায় কোণঠাসা হয়ে পড়লেও গ্রেফতার হননি। পর্তুগাল, স্পেন, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, রোমানিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহির এক হাজারেরও বেশি পুলিশকর্মী এবং ইউরোপোল ওই অভিযানে অংশ নেয়। গ্রেফতার করা হয় ৪৫ জনকে। বাজেয়াপ্ত হয় এক কোটি ত্রিশ লক্ষ ইউরোরও বেশি নগদ অর্থ—ব্রিটিশ মুদ্রায় প্রায় এক কোটি দশ লক্ষ পাউন্ড—৭০টি বিলাসবহুল গাড়ি, ৩৭টি বিমান এবং ১৩৬টি স্থাবর সম্পত্তি।

আদালতে জানানো হয়েছে, ওই বছরই নিজের মৃত্যুর নাটক সাজিয়েছিলেন বলে অভিযোগ কার্ভালহোর বিরুদ্ধে। ওয়াউটার নামে তাঁর ব্যবহৃত পরিচয়ের জন্য একটি মৃত্যুর শংসাপত্র সংগ্রহ করা হয়েছিল। সেখানে দাবি করা হয়, কোভিডজনিত জটিলতায় ওয়াউটারের মৃত্যু হয়েছে।

এর পর কার্ভালহো চলে যান বুদাপেস্টে। ২০২২ সালে সেখানে গ্রেফতারের সময় তিনি গিইয়ের্মো দিয়াস ফ্লোরেস নামে এক মেক্সিকান নাগরিকের পরিচয় ব্যবহার করছিলেন। অভিযোগ, গ্রেফতার হওয়ার আগে অন্তত ১০টি ভুয়ো পরিচয় ব্যবহার করেছিলেন তিনি। ২০২৩ সালের জুনে তাঁকে বেলজিয়ামে প্রত্যর্পণ করা হয় এবং উচ্চ নিরাপত্তার একটি কারাগারে পাঠানো হয়।

আদালতে মুখোমুখি দুই অভিযুক্ত

শেষ পর্যন্ত আদালতে মুখোমুখি হন কার্ভালহো ও তাঁর কথিত সহযোগী ‘আঙুল-কাটা’। দু’জনের বিরুদ্ধেই একটি আন্তর্দেশীয় অপরাধী সংগঠন পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে।

বিচারে নিজের বক্তব্য পেশ করার সময় ব্রেসার্স কোনও অভিযোগই স্বীকার করেননি। তাঁর দাবি, সংবাদমাধ্যম পরিকল্পিত ভাবে তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। তিনি বলেন, “আমার দৃঢ় ধারণা, এই সবই কর্তৃপক্ষের সাজানো।”

ব্রেসার্সের আইনজীবীরা প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে মামলা খারিজের আবেদন করেছেন। তাঁর প্রধান আইনজীবী হান্স রিডারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত তিনি কোনও মন্তব্য করেননি। বিচার চলাকালীন অভিযুক্তপক্ষের অভিযোগ ছিল, সংবাদমাধ্যম “আমাদের মক্কেলকে সম্পূর্ণ দানবীয় চেহারায় তুলে ধরছে”।

স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে কার্ভালহো সব শুনানিতে হাজির হতে পারেননি। তিনিও নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করেছেন। তাঁর বক্তব্য, ব্রাজিলের কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে হয়রানি করছে। শুনানিতে তিনি বলেন, “আমি পাঁচ বছর ধরে জেলে আছি, আর কেউ আমার কথা শুনছে না। এই অপরাধগুলি করেছে আমারই নামের আর এক ব্যক্তি, আমি নই।”

কার্ভালহোর আইনজীবী ফ্রেদেরিক থিয়েবো ও রেনাট লান্ডাউটের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাঁরা উত্তর দেননি। মামলাটির দায়িত্বে থাকা বেলজিয়ামের ফেডারেল কৌঁসুলিও মন্তব্য করতে অস্বীকার করেন।

৯ অক্টোবর মামলার শুনানি শেষ হয়েছে। ১৫ ডিসেম্বর রায় ঘোষণার সম্ভাবনা রয়েছে। দোষী সাব্যস্ত হলে ব্রেসার্সের সর্বোচ্চ ২০ বছর এবং কার্ভালহোর সর্বোচ্চ ১৫ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।

ইউরোপে লাতিন আমেরিকার অপরাধচক্রের বিস্তার

গত এক দশকে ব্রেসার্স-কার্ভালহো মামলার মতো ঘটনা বহুগুণ বেড়েছে। বিভিন্ন দেশের পুলিশ, ইউরোপোল ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলি পর্তুগাল, স্পেন, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, ইতালি, নর্ডিক দেশ, পূর্ব ইউরোপ ও বলকান অঞ্চলে লাতিন আমেরিকার মাদক পাচারকারী গোষ্ঠীগুলির শাখা শনাক্ত করেছে। উত্তর আফ্রিকাতেও তাদের উপস্থিতি ধরা পড়েছে।

ইউরোপোলের গুরুতর ও সংগঠিত অপরাধ দমন কেন্দ্রের প্রধান অ্যান্ডি ক্রাগের বক্তব্য, স্থানীয় ‘দালাল’ বা মাদকচক্রের সদস্যদের মাধ্যমে এই অপরাধী সংগঠনগুলি ইউরোপে শিকড় গেড়েছে। এরা “ইউরোপে কোকেন উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কিত বিশেষ পরিষেবা দেয়। তার মধ্যে রয়েছে, কোকেন বহনে ব্যবহৃত বিভিন্ন উপাদান থেকে মাদকটি নিষ্কাশন করা অথবা পাচার করে আনা কোকা পেস্ট প্রক্রিয়াকরণ”।

ক্রাগ বলেন, “এই কাজের সঙ্গে লাতিন আমেরিকার অপরাধীরা ব্যাপক ভাবে যুক্ত। আমরা দেখছি, ইউরোপে লাতিন আমেরিকার অপরাধীদের উপস্থিতি বাড়ছে। তাদের কাজকর্মের গুরুত্বও ক্রমশ বাড়ছে।”

তাঁর কথায়, “আগে ব্যাপারটা ছিল উল্টো দিকে। এখন যাতায়াত দু’দিকেই। কয়েক দশক ধরেই আমরা দেখেছি, ইউরোপের বড় মাপের অপরাধীরা লাতিন আমেরিকায় ঘাঁটি গেড়ে বসবাস করছে। এখন আরও বেশি সংখ্যায় লাতিন আমেরিকার অপরাধীদেরও ইউরোপে স্থায়ী বা দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তিতে সক্রিয় থাকতে দেখা যাচ্ছে।”

ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের সূত্রের বক্তব্য, ক্রিপ্টোকারেন্সি, জুয়া সংস্থা এবং অর্থ ও সম্পত্তির বাজারকে কাজে লাগিয়ে এই গোষ্ঠীগুলি বাস্তব ও ডিজিটাল—দুই অর্থনীতিতেই নিজেদের কাজকর্ম এবং প্রভাব বাড়াচ্ছে।

বুয়েনস আইরেসের ইউনিভার্সিদাদ দি তেলা-র আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক এবং লাতিন আমেরিকার সংগঠিত অপরাধ বিশেষজ্ঞ হুয়ান গাব্রিয়েল তোকাতলিয়ানের মতে, কলম্বিয়ায় ‘মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ চালানোর ফলে মাদকচক্রগুলি আরও আঘাতসহনশীল ও গতিশীল হয়ে উঠেছিল। নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং আন্তর্জাতিক স্তরে বিস্তারের ক্ষমতার ব্যাখ্যা সেখানেই। তোকাতলিয়ান নিজে ২০ বছর কলম্বিয়ায় ছিলেন।

তিনি বলেন, “সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ইউরোপ এমন একটি জায়গা হয়ে উঠেছে, যেখানে মাদকের ব্যবহার বিশেষ ভাবে বেড়েছে। রাষ্ট্রপুঞ্জের প্রতিবেদনগুলি দেখলে বোঝা যায়, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার। আশির দশকে, বিশেষ করে কোকেনের ক্ষেত্রে, ইউরোপের তেমন গুরুত্ব ছিল না।”

তোকাতলিয়ানের বক্তব্য, “এক দিকে ইউরোপের চাহিদা, অন্য দিকে অসংগত মাদকবিরোধী নীতি—যে নীতি দমনপ্রক্রিয়াকে সামরিক রূপ দেয়, আবার পরে মাদকচক্রের সঙ্গে সহাবস্থানও করে। এই পটভূমিতে এমন সব পরিস্থিতি তৈরি হয়, যা শেষ পর্যন্ত সংগঠিত অপরাধকেই আরও শক্তিশালী করে।”

কার্ভালহোর মতো পিসিসি, ত্রেন দে আরাগুয়া, সিনালোয়া কার্টেল, ক্লান দেল গলফো ও লস লোবোসের মতো অপরাধী সংগঠনের বহু কথিত নেতা ইউরোপের বিভিন্ন কারাগারে বন্দি। আবার কাউকে খুঁজছে বিভিন্ন দেশের পুলিশ বা ইউরোপোল। কারও নাম রয়েছে ইন্টারপোলের সবচেয়ে বেশি খোঁজা ব্যক্তিদের লাল তালিকায়।

ইউরোপে কোকেন পাচার, লাতিন আমেরিকায় অস্ত্র ও কৃত্রিম মাদক পাচার এবং বলকান অঞ্চলের অপরাধী সংগঠন বা ইতালির ’এনদ্রাংঘেতা মাফিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগে তাঁদের খোঁজা হচ্ছে।

প্যারিসের সিয়ঁস পো বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানী এবং ফ্রান্সের ন্যাশনাল সেন্টার ফর সায়েন্টিফিক রিসার্চ বা সিএনআরএস-এর গবেষণা অধিকর্তা গাব্রিয়েল ফেলত্রানের বক্তব্য, পিসিসি বা সিনালোয়ার মতো গোষ্ঠীগুলি আলবেনিয়ার অপরাধী সংগঠন কিংবা ’এনদ্রাংঘেতার মতো ইউরোপীয় চক্রের সঙ্গে ‘যৌথ উদ্যোগ’ গড়ে তুলছে।

তাঁর ব্যাখ্যা, এই গোষ্ঠীগুলি লাতিন আমেরিকার উৎপাদকদের কাছ থেকে সরাসরি কোকেন কিনছে এবং সরবরাহব্যবস্থার একেবারে শেষ প্রান্তে তা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষমতা রাখছে। ফলে মাদকের মালিকানা আর সরবরাহশৃঙ্খলের প্রতিটি ধাপে হাতবদল হচ্ছে না।

ফেলত্রান এই প্রবণতাকে বলছেন সংগঠিত অপরাধের ‘প্ল্যাটফর্মায়ন’। অর্থাৎ, অ্যামাজন, গুগল ও মেটার মতো বহুজাতিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলির ধাঁচে মাদকচক্রগুলি নিজেদের পরিকাঠামো ও ব্যবসার মডেল একত্র করছে। উদ্দেশ্য, লাতিন আমেরিকার প্রত্যন্ত অঞ্চলে উৎপাদন থেকে ইউরোপের রাস্তায় বিক্রি পর্যন্ত মাদক পাচারের গোটা শৃঙ্খল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখা।

এর ফলে যোগাযোগ, অর্থপ্রদান, মাদক তৈরির প্রয়োজনীয় রাসায়নিক উপাদান, পরীক্ষাগার এবং পরিবহণের ব্যবস্থাপনা—সব কিছুর নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীভূত হচ্ছে শীর্ষ স্তরে। অন্য দিকে, মাদক বহনকারী এবং স্থানীয় স্তরে কাজ করা ব্যক্তিদের অনেক সময় অজান্তেই ভাড়ায় পরিষেবা দেওয়ার কাজে যুক্ত করা হচ্ছে। অনেকটা উব্‌রের চালকদের মতো।

ফেলত্রানের মতে, এই প্ল্যাটফর্মায়নের আগে পাচারব্যবস্থা নির্ভর করত নির্দিষ্ট কিছু পথ এবং একাধিক মধ্যস্থতাকারীর উপর। সরবরাহশৃঙ্খলের প্রতিটি ধাপে এক-এক জন মধ্যস্থতাকারী মাদকের মালিক হতেন। এখন, তাঁর কথায়, “এ ধরনের যৌথ উদ্যোগগুলি শীর্ষ স্তরে একজোট হয়, উৎপাদকের কাছ থেকে সরাসরি কেনে এবং শেষ প্রান্তে সরাসরি পৌঁছে দেয়। তাদের আর মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যেতে হয় না।”

তিনি আরও বলেন, “মাদকের মালিকানা আর হাতবদল হয় না। তারা সব কিছু এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত করে, কাজের দক্ষতা অনেক বাড়ায় এবং খুব দ্রুত বড় হয়ে ওঠে। যত বেশি মানুষ তাদের পরিষেবা ব্যবহার করে, ততই তাদের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এটাই নেটওয়ার্কের প্রভাব।”