রুশ দমনপীড়নের চাপে স্থায়ীভাবে বন্ধ হচ্ছে নোবেলজয়ী দিমিত্রি মুরাতভের স্বাধীন সংবাদপত্র। দপ্তর, অনুদান সংগ্রহের পথ এবং প্রকাশনার আইনি অধিকার—এক এক করে সবই হারিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি।
রাশিয়ার অন্যতম পরিচিত স্বাধীন সংবাদপত্র নোভায়া গাজেতা আর প্রকাশিত হবে না। আগামী মাসে স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা ঘোষণা করেছে সংবাদমাধ্যমটি। পত্রিকাটির প্রাক্তন প্রধান সম্পাদক দিমিত্রি মুরাতভ ২০২১ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে সরকারি চাপ, আইনি বাধা এবং আর্থিক সংকটের সঙ্গে লড়াই চালানোর পর শেষ পর্যন্ত কাজ বন্ধের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে তারা।
পত্রিকাটির বর্তমান প্রধান সম্পাদক সের্গেই সোকোলভ ওয়েবসাইটে লিখেছেন, “এ শুধু আমাদের নিজেদের কাহিনি নয়; এ এমন একটি দেশ ও সমাজের কাহিনি, যাদের পরিকল্পিতভাবে পিষে ফেলা হচ্ছে।”
নব্বইয়ের দশকে পথচলা শুরু নোভায়া গাজেতার। দীর্ঘদিন সংবাদপত্রটির অর্থসংস্থানের একটি অংশ জুগিয়েছিলেন প্রয়াত সোভিয়েত নেতা মিখাইল গর্বাচভ। দুর্নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং সামাজিক নানা সমস্যা নিয়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ও বিশদ প্রতিবেদন প্রকাশের জন্য পরিচিত হয়ে উঠেছিল পত্রিকাটি। বছরের পর বছর ধরে এই সংবাদমাধ্যমের ছয় জন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে অন্যতম আন্না পলিতকভস্কায়া। ২০০৬ সালে মস্কোয় নিজের আবাসনের সিঁড়িতে তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সরকারি দমনপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়েছে নোভায়াকে। কিন্তু ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিসর আরও সংকুচিত হয়ে পড়ে। রাশিয়ার সংবাদমাধ্যম জগতেও নেমে আসে বিপর্যয়। দেশের ভিতরে থেকে কাজ চালিয়ে যাওয়া সমালোচনামুখর শেষ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের অন্যতম ছিল নোভায়া।
সোকোলভ লিখেছেন, “প্রায় পাঁচ বছর ধরে *** চলাকালীন নিরাপত্তা সংস্থাগুলির সম্পূর্ণ ঘেরাটোপে থেকেও আমরা কাজ চালিয়ে যেতে পেরেছিলাম। এখন তার অবসান। আমরা এসে পড়েছি এক ‘হত্যাক্ষেত্রে’।”
উল্লেখ্য, এখানে ‘যুদ্ধ’ শব্দটির জায়গায় তারকা চিহ্ন ব্যবহার করা হয়েছে। রুশ আইন অনুযায়ী, সাংবাদিকদের ইউক্রেনের যুদ্ধকে ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ হিসেবে উল্লেখ করতে হয়। অন্যথায় তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
ইউক্রেনে রুশ আক্রমণ শুরুর কয়েক দিনের মধ্যেই রুশ ও ইউক্রেনীয়—দুই ভাষায় একটি বিশেষ সংস্করণ প্রকাশ করেছিল নোভায়া। আক্রমণের বিরুদ্ধে সেটিই ছিল সংবাদপত্রটির প্রথম প্রতিক্রিয়া। প্রথম পাতায় যুদ্ধকে বলা হয়েছিল ‘উন্মাদনা’। এর পরেই ক্রেমলিন কঠোর সেন্সরশিপ আইন চালু করে। নতুন আইনে সংঘাত সম্পর্কে শুধু রুশ সরকারের বক্তব্যই প্রকাশ করার জন্য সংবাদমাধ্যমগুলিকে কার্যত বাধ্য করা হয়।
নোভায়ার সংবাদ ও জনসংযোগ বিভাগের প্রধান নাদেঝদা প্রুসেনকোভা বলেন, “আমরা বলেছিলাম, এটা সাংবাদিকতা নয়, আর আমরা তা করব না।”
সরকারি নির্দেশ মেনে ঘুরিয়ে কথা বলা কিংবা মিথ্যা তথ্য প্রকাশের বদলে অভিনব প্রতিবাদের পথ নেয় সংবাদপত্রটি। প্রতিবেদনের পাতায় ইচ্ছাকৃত ভাবে সাদা জায়গা ফাঁকা রাখা শুরু হয়। সেন্সরশিপের কারণে কোন কোন তথ্য প্রকাশ করা যাচ্ছে না, তা পাঠকদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখানোই ছিল এর উদ্দেশ্য।
২০২২ সালের মার্চের শেষ দিকে মুদ্রিত সংস্করণ প্রকাশ বন্ধ করে দেয় নোভায়া। কিন্তু তাতেও হুমকি ও চাপ কমেনি। ওই বছরের এপ্রিলে ট্রেনে সফরের সময় মুরাতভের গায়ে লাল রং ঢেলে দেওয়া হয়। হামলায় তাঁর দৃষ্টিশক্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মার্কিন আধিকারিকদের দাবি, রুশ গোয়েন্দা সংস্থাগুলির নির্দেশেই এই হামলা চালানো হয়েছিল। একই বছরের সেপ্টেম্বরে সংবাদপত্রটির সরকারি প্রকাশনা লাইসেন্স বাতিল করা হয়। কিছু দিন পর রাশিয়ায় তাদের ওয়েবসাইটও বন্ধ করে দেওয়া হয়।
তবে দমনপীড়নের মধ্যেও কাজ চালিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজে নিয়েছিলেন নোভায়ার সাংবাদিকেরা। অনেকে রাশিয়া ছেড়ে চলে যান। নির্বাসিত কয়েক জন প্রাক্তন কর্মী মিলে গড়ে তোলেন নোভায়া গাজেতা ইউরোপ। এটি আইনগত ভাবে মূল সংবাদপত্রের থেকে সম্পূর্ণ পৃথক একটি সংবাদমাধ্যম।
অন্য দিকে, মুরাতভ এবং মূল দলের কয়েক জন সদস্য রাশিয়াতেই থেকে যান। তাঁরা একের পর এক সাময়িকী প্রকাশ করতে থাকেন, প্রতিটির মুদ্রণসংখ্যা রাখা হত ৯৯৯। রুশ আইন অনুযায়ী, এক হাজারের কম কপি ছাপা হয় এমন সাময়িকী প্রকাশের জন্য সরকারি লাইসেন্সের প্রয়োজন হয় না। সেই আইনি ফাঁককেই কাজে লাগিয়েছিলেন তাঁরা। পাশাপাশি চালু ছিল নোভায়ার ওয়েবসাইট। যদিও সংবাদমাধ্যমটির বিরুদ্ধে একের পর এক আইনি পদক্ষেপের হুমকি দিয়ে যাচ্ছিল রুশ প্রশাসন।
পত্রিকাটিতে ১৭ বছর কাজ করা প্রাক্তন সাংবাদিক এলেনা কোস্তিউচেঙ্কো বলেন, “এত কিছুর পরেও এই সাড়ে চার বছর নোভায়া যে কাজ চালিয়ে যেতে পেরেছে, সেটা ছিল এক অলৌকিক ঘটনা। কিন্তু শুধু অলৌকিক ঘটনা বললে সবটা বলা হয় না। এর পিছনে ছিল সেই মানুষগুলির প্রতিদিনের সিদ্ধান্ত, যাঁরা প্রচণ্ড ভয় সত্ত্বেও কাজে যাওয়া বন্ধ করেননি।”
তিনি আরও বলেন, “আজ সহকর্মীদের দেখে আমি গভীরভাবে অনুপ্রাণিত। কিন্তু একই সঙ্গে তাঁদের জন্য, আমাদের সকলের জন্য খুব কষ্ট হচ্ছে, খুব দুঃখ হচ্ছে।”
নাদেঝদা প্রুসেনকোভার বক্তব্য, সাম্প্রতিক মাসগুলিতে চাপ আর সামলানো যাচ্ছিল না। এপ্রিলে সংবাদপত্রটির সাংবাদিক ওলেগ রলদুগিনকে গ্রেফতার করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে কম্পিউটারে সংরক্ষিত তথ্যে বেআইনি ভাবে প্রবেশের অভিযোগ আনা হয়েছে। বিচার শুরু হওয়ার অপেক্ষায় বর্তমানে গৃহবন্দি রয়েছেন তিনি। ওই মামলার সূত্র ধরেই গত মাসে সোকোলভের বাড়িতেও তল্লাশি চালানো হয়।
এর মধ্যেই চলতি মাসে বাড়ির মালিকপক্ষ নোভায়ার কর্মীদের জানিয়ে দিয়েছে, আগামী ৯ নভেম্বরের মধ্যে মধ্য মস্কোয় তাঁদের দীর্ঘদিনের দপ্তর খালি করতে হবে। কয়েক দশক ধরে এই দপ্তরই ছিল সংবাদপত্রটির কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র। নিহত সাংবাদিক আন্না পলিতকভস্কায়ার ব্যবহৃত পুরনো ঘরটিতে তাঁর স্মৃতিতে একটি সংগ্রহশালাও গড়ে তোলা হয়েছিল। প্রুসেনকোভা জানিয়েছেন, আপাতত সেখানকার প্রদর্শনীগুলি খুলে সরিয়ে রাখা হবে।
দপ্তর ছাড়ার নোটিসের পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমটির অনুদান সংগ্রহের সমস্ত পথও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে অর্থসংস্থানের কার্যত কোনও উৎসই আর অবশিষ্ট নেই। মামলা, দপ্তর থেকে উচ্ছেদ এবং অর্থের অভাব—সব মিলিয়ে সংবাদপত্র বন্ধ করা ছাড়া আর কোনও বিকল্প দেখছেন না কর্মীরা।
প্রুসেনকোভা বলেন, “কখনও কখনও এমন হয় যে আপনার শত্রুরাই জিতে যায়। এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে, ওরাই জিতে গিয়েছে। আমাদের হাতে আর কোনও বিকল্প নেই।”
তবে এখানেই সাংবাদিকতার ইতি টানতে রাজি নন তাঁরা। প্রুসেনকোভার আশা, নোভায়ার সাংবাদিকেরা কোনও না কোনও উপায়ে নিজেদের কাজ চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবেন।
তাঁর কথায়, “শেষ পর্যন্ত, আমরা তো আর অন্য কোনও কাজ করতে জানি না।”
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
মন্তব্য করতে আপনার বাংলাস্ফিয়ার অ্যাকাউন্টে লগইন করুন। সদস্যতা কেনার প্রয়োজন নেই।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।