দক্ষিণ কোরিয়ার দিকে প্রচারবার্তা ছড়িয়ে দিতে সীমান্তের লাউডস্পিকার ফের চালু করার হুঁশিয়ারি দিয়ে গত সপ্তাহেই শিরোনামে এসেছিল উত্তর কোরিয়া। তবে এই সাম্প্রতিক উত্তেজনার নেপথ্যে রয়েছে আরও বড় এক সামরিক প্রস্তুতি। দীর্ঘদিন ধরেই দুই কোরিয়ার সীমান্তে নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ঢেলে সাজাচ্ছেন উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উন। মাইন, কাঁটাতারের বেড়া, ট্যাঙ্করোধী বাধা—সব মিলিয়ে সীমান্তের চেহারাই বদলে দিতে চাইছে পিয়ংইয়ং।
২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে দুই কোরিয়াকে আলাদা করে রাখা অসামরিক অঞ্চল বা ডিমিলিটারাইজড জোন (ডিএমজেড) বরাবর স্থায়ী ও সুরক্ষিত সীমান্ত গড়ে তোলার কাজ শুরু করেছে উত্তর কোরিয়া। আর সেই নির্মাণকাজ ঘিরেই মাইন বিস্ফোরণে আহত হয়েছেন দক্ষিণ কোরিয়ার তিন সেনা। দুই দেশের সম্পর্কও পৌঁছেছে নতুন করে উত্তেজনার মুখে।
কিন্তু সীমান্তে ঠিক কী তৈরি করছে উত্তর কোরিয়া? কেনই বা এই সামরিক প্রস্তুতি? আর দুই দেশের মধ্যে সীমান্তরেখা ঠিক কোথায়, তা নিয়েই বা এত ধোঁয়াশা কেন?
সীমান্তে কীসের প্রস্তুতি?
প্রায় ২৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ দুই কোরিয়ার সীমান্ত এমনিতেই বিশ্বের অন্যতম সুরক্ষিত সীমান্ত। তবে একে প্রচলিত অর্থে একটি নির্দিষ্ট প্রাচীর বা বেড়া দিয়ে ভাগ করা অঞ্চল ভাবলে ভুল হবে। কোরীয় উপদ্বীপের বুক চিরে বিস্তৃত এই অসামরিক অঞ্চলের প্রস্থ প্রায় চার কিলোমিটার। দুই দেশের সেনাবাহিনীর মাঝখানে থাকা এই এলাকাই কার্যত সংঘাতের বাফার জোন।
দক্ষিণ কোরিয়ার অনুমান, ২০২৪ সাল থেকে ডিএমজেডে প্রায় ৯ লক্ষ ৬০ হাজার নতুন মাইন পুঁতেছে উত্তর কোরিয়া। পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি মাইন পোঁতা অঞ্চলগুলির অন্যতম এই সীমান্তে আগে থেকেই বিপুল সংখ্যক মাইন রয়েছে। নতুন করে পোঁতা মাইনের সংখ্যা সেই মোট মজুতের প্রায় অর্ধেক বলে অনুমান।
শুধু মাইন পুঁতেই থেমে থাকছে না পিয়ংইয়ং। অসামরিক অঞ্চলের নিজেদের দিক বরাবর একটানা প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি করছে তারা। সেই পরিকল্পনায় রয়েছে কাঁটাতারের বেড়া, মাইনক্ষেত্র, সেনা ও সামরিক যান চলাচলের রাস্তা এবং গাছপালা সরিয়ে ফেলে তৈরি করা ট্যাঙ্করোধী প্রতিবন্ধক।
দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনীর যৌথ প্রধানদের দফতরের দাবি, জমি পরিষ্কারের কাজ প্রায় শেষ। নির্মাণকাজের ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। তাদের অনুমান, ২০২৮ সালের দ্বিতীয়ার্ধের মধ্যে এই প্রকল্প শেষ করতে পারে উত্তর কোরিয়া।
অথচ ১৯৫৩ সালের যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুযায়ী, কোরীয় যুদ্ধের লড়াই থামার পর ডিএমজেড থেকে সামরিক বাহিনী ও সামরিক সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়ার কথা ছিল। উল্লেখ্য, যুদ্ধবিরতি হলেও দুই কোরিয়ার মধ্যে যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটেনি।
কিমের নতুন কৌশল?
একসময় দুই কোরিয়ার পুনরেকত্রীকরণ ছিল বহুল আলোচিত রাজনৈতিক লক্ষ্য। ২০১৮ সালেও সীমান্তে মুখোমুখি হয়েছিলেন দুই দেশের নেতারা। শীতকালীন অলিম্পিক্সে একসঙ্গে মার্চ করেছিলেন দুই দেশের খেলোয়াড়েরা। কিন্তু সেই অধ্যায়ের কার্যত ইতি টেনেছেন কিম জং-উন।
২০২৩ সালের ডিসেম্বরেই দক্ষিণ কোরিয়াকে পৃথক ও শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্র হিসেবে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেন উত্তর কোরিয়ার নেতা। তার কয়েক মাসের মধ্যেই সীমান্তে শুরু হয় নতুন নির্মাণকাজ।
সোলের বিশেষজ্ঞদের মতে, কিমের এই অবস্থান বদলের পিছনে রয়েছে রাজনৈতিক হিসাব। এত দিন দক্ষিণ কোরিয়ার মানুষকে নিজেদের স্বদেশবাসী বলে দাবি করার পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধেই পরমাণু যুদ্ধের হুমকি দিত উত্তর কোরিয়া। এই দ্বৈত অবস্থানের বদলে এখন দক্ষিণ কোরিয়াকে সরাসরি শত্রু রাষ্ট্র হিসেবে দেখানোর পথ নিয়েছে পিয়ংইয়ং।
সোলের সঙ্গে আলোচনা ও কূটনৈতিক যোগাযোগ ভেঙে পড়ার পর রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাও উত্তর কোরিয়ার অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। মস্কোর সমর্থনকে কাজে লাগিয়ে পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের দাবিতেও আরও জোর দিতে পারছে কিমের সরকার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্তে এই বিপুল নির্মাণকাজের পিছনে একাধিক উদ্দেশ্য রয়েছে। একদিকে, উত্তর কোরিয়ার নাগরিকদের দেশ ছেড়ে পালানো কঠিন করে তোলা। অন্যদিকে, নতুন করে যুদ্ধ বাধলে দক্ষিণ কোরিয়ার সেনাবাহিনীর অগ্রগতি আটকে দেওয়া। পাশাপাশি, দুই দেশের মধ্যবর্তী সামরিক বিভাজনরেখাকে কার্যত একটি আন্তর্জাতিক সীমান্তের রূপ দেওয়ার চেষ্টাও রয়েছে।
কিমের বোন কিম ইয়ো-জং অবশ্য দাবি করেছেন, এই নির্মাণকাজ সীমান্তে সংঘাতের আশঙ্কা কমাবে। কিন্তু বিশ্লেষকদের বক্তব্য ঠিক উল্টো। তাঁদের মতে, সীমান্তে নতুন করে কামান ও ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিট মোতায়েনের ফলে কোনও দুর্ঘটনা বা ভুল বোঝাবুঝি থেকে সংঘর্ষ বাধলে তা দ্রুত বড় আকার নিতে পারে।
মাইন বিস্ফোরণে বাড়ল উত্তাপ
গত ২১ সেপ্টেম্বর ডিএমজেডের মধ্যে একটি চলাচলের পথ পরিষ্কার করার সময় স্থলমাইন বিস্ফোরণে আহত হন দক্ষিণ কোরিয়ার তিন সেনা। তাঁদের মধ্যে একজনের পায়ের পাতা বাদ দিতে হয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সেনাবাহিনীর দাবি, সীমান্তের দক্ষিণ দিকে উত্তর কোরিয়ার পুঁতে রাখা মাইন থেকেই এই বিস্ফোরণ ঘটেছে। ঘটনার জন্য পিয়ংইয়ংয়ের কাছে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানিয়েছে সোল। তবে উত্তর কোরিয়া কোনও দায় স্বীকার করেনি। উল্টে তাদের দাবি, পুরো ঘটনাটিই দক্ষিণ কোরিয়ার ‘নিজেদের সাজানো প্রহসন’।
এখানেই শেষ নয়। দক্ষিণ কোরিয়ার অভিযোগ, নিজেদের সীমান্ত সুরক্ষিত করার কাজ করতে গিয়ে উত্তর কোরিয়ার সেনারা বারবার সামরিক বিভাজনরেখা পেরিয়ে দক্ষিণের দিকে চলে আসছেন। তাঁদের সতর্ক করতে দক্ষিণ কোরিয়ার সেনাবাহিনী গুলিও চালিয়েছে। পাল্টা সেই গুলিবর্ষণকে ‘সশস্ত্র দুর্বৃত্তদের’ উসকানি বলে আখ্যা দিয়েছে পিয়ংইয়ং।
এর পর থেকেই দক্ষিণ কোরিয়াকে নিশানা করে একের পর এক বিবৃতি দিচ্ছেন কিমের প্রভাবশালী বোন কিম ইয়ো-জং। এক মাসেরও কম সময়ে প্রায় দশটি বিবৃতি দিয়েছেন তিনি। সোলের পুনরেকত্রীকরণ মন্ত্রকের মতে, এত ঘনঘন বিবৃতি দেওয়া যথেষ্ট অস্বাভাবিক।
সম্প্রতি কিম ইয়ো-জং আরও জানিয়েছেন, কয়েক দিনের মধ্যেই সীমান্তের ওপারে প্রচারবার্তা ছড়িয়ে দিতে উত্তর কোরিয়ার লাউডস্পিকারগুলি ফের চালু করার জন্য প্রস্তুত হয়ে যাবে। ফলে সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি প্রচারযুদ্ধও নতুন করে মাথাচাড়া দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সীমান্তরেখাই ধোঁয়াশায়!
দুই কোরিয়ার সীমান্ত নিয়ে সবচেয়ে বড় জটিলতা হল, সামরিক বিভাজনরেখাটি ঠিক কোথা দিয়ে গিয়েছে, তা নিয়ে কোনও সর্বসম্মত অবস্থান নেই।
১৯৫৩ সালের যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সামরিক বিভাজনরেখা বা মিলিটারি ডিমার্কেশন লাইন (এমডিএল) নির্ধারণ করা হয়েছিল ১:৫০,০০০ অনুপাতের মানচিত্রে। অর্থাৎ মানচিত্রে মাত্র এক মিলিমিটার চওড়া একটি রেখা বাস্তবে প্রায় ৫০ মিটার জমি জুড়ে বিস্তৃত। মাটিতে সেই রেখার অবস্থান চিহ্নিত করতে পরবর্তী সময়ে ১,২৯২টি নম্বর দেওয়া সীমানাচিহ্ন বসানো হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলির অধিকাংশই হারিয়ে গিয়েছে। এখন মাত্র প্রায় ২০০টি চিহ্ন শনাক্ত করা সম্ভব।
ফলে সীমান্তরেখা নির্ধারণে তিন পক্ষের মধ্যে রয়েছে তিন রকমের হিসাব। দক্ষিণ কোরিয়া যে মানচিত্র ব্যবহার করে, তা আমেরিকার ন্যাশনাল জিওস্পেশিয়াল-ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির মানচিত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি। অন্যদিকে, যুদ্ধবিরতি চুক্তি তদারকির দায়িত্বে থাকা মার্কিন নেতৃত্বাধীন রাষ্ট্রপুঞ্জের কমান্ড (ইউএনসি) ব্যবহার করে এক দশক আগে নিজেদের করা সমীক্ষার ভিত্তিতে তৈরি মানচিত্র। আর উত্তর কোরিয়া এখনও দৃশ্যমান সীমানাচিহ্নগুলিকে সরলরেখায় যুক্ত করে সীমান্ত নির্ধারণ করছে বলে মনে করা হয়।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের পর্যবেক্ষণ, নিজেদের নির্ধারিত সীমান্তরেখার সঙ্গে ইউএনসি-র মানচিত্র মিলিয়ে দেখতে গিয়ে প্রায় ৬০ শতাংশ ক্ষেত্রে অমিল ধরা পড়েছে। কোথাও কোথাও এই ফারাক কয়েক দশ মিটার পর্যন্ত। তবে দুই কোরিয়ার নিজস্ব সীমান্ত-ব্যাখ্যার মধ্যে ঠিক কতটা পার্থক্য রয়েছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
এই অস্পষ্টতার সুযোগেই বাড়ছে সংঘাতের আশঙ্কা। খবর অনুযায়ী, শুধু চলতি বছরের আগস্ট ও সেপ্টেম্বরেই উত্তর কোরিয়ার সেনারা প্রায় ৫০ বার সামরিক বিভাজনরেখা অতিক্রম করেছেন। অথচ ২০২৫ সালে এমন ঘটনা ঘটেছিল মাত্র ১৭ বার।
আলোচনার দরজা খোলা?
পরিস্থিতি সামাল দিতে আলোচনার পথে হাঁটতে চাইছে দক্ষিণ কোরিয়া। সামরিক বিভাজনরেখার সঠিক অবস্থান যৌথভাবে নির্ধারণ করতে পিয়ংইয়ংয়ের কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছে সোল। পাশাপাশি, ২০২৩ সালে বন্ধ হয়ে যাওয়া দুই দেশের সামরিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ফের চালু করা এবং অনিচ্ছাকৃত সংঘর্ষ এড়াতে নতুন সমঝোতায় পৌঁছনোর কথাও বলেছে তারা।
এক বছরের মধ্যে এই ধরনের দ্বিতীয় প্রস্তাব দিল দক্ষিণ কোরিয়া। তবে আগের প্রস্তাবে কোনও সাড়া দেয়নি পিয়ংইয়ং।
এদিকে, সীমান্তে নির্মাণকাজকে ১৯৫৩ সালের যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন বলে দাবি করেছে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রক। অবিলম্বে এই কাজ বন্ধ করার দাবিও জানিয়েছে তারা।
তবে ইউএনসি-র বক্তব্য, সীমান্তে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা বা নির্মাণকাজ চালানো মাত্রই যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘিত হয়েছে, এমনটা বলা যায় না। প্রতিটি ঘটনার পরিস্থিতি ও প্রমাণ খতিয়ে দেখেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
সব মিলিয়ে, কাঁটাতার, মাইন আর ট্যাঙ্করোধী বাধা দিয়ে সীমান্ত যতই দুর্ভেদ্য করে তোলার চেষ্টা হোক, দুই কোরিয়ার মধ্যে অবিশ্বাসের দেওয়াল যে আরও উঁচু হচ্ছে, তা স্পষ্ট।
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
মন্তব্য করতে আপনার বাংলাস্ফিয়ার অ্যাকাউন্টে লগইন করুন। সদস্যতা কেনার প্রয়োজন নেই।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।