বিধিনিষেধের দশ দিন পর ইউক্রেনের সামরিক যোগাযোগব্যবস্থা ফিরল আগের গতিতে। পরিষেবা পুনরুদ্ধারে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ও প্রশাসনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানালেন জেলেনস্কি।

উপগ্রহ যোগাযোগব্যবস্থা স্টারলিঙ্ক ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপের প্রায় দশ দিন পর ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর সংযোগ ফের স্থিতিশীল হয়েছে বলে জানিয়েছে সে দেশের সরকার। পরিষেবা স্বাভাবিক হওয়ায় আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি।

ইলন মাস্কের সংস্থা স্পেসএক্সের তৈরি স্টারলিঙ্ক ইউক্রেনের সামরিক অভিযানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। যুদ্ধক্ষেত্রে যোগাযোগ বজায় রাখা, রসদ সরবরাহ এবং আকাশপথে রুশ হামলা প্রতিহত করার ক্ষেত্রে এই উপগ্রহভিত্তিক পরিষেবা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। কিন্তু চলতি মাসের গোড়ায় চলমান অবস্থায় স্টারলিঙ্ক টার্মিনাল ব্যবহারের ক্ষেত্রে ঘণ্টায় ১৬০ কিলোমিটার বা ৯৯ মাইলের গতিসীমা বেঁধে দেওয়া হয়। এর ফলে ইউক্রেনের একাধিক সামরিক অভিযান ব্যাহত হয় বলে খবর।

বিধিনিষেধের জেরে রুশ আক্রমণকারী ড্রোন প্রতিহত করার ক্ষেত্রে ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শত্রুপক্ষের সম্মুখসারির পিছনে আঘাত হানার জন্য পরিকল্পিত কয়েকটি অভিযানও বাতিল করতে হয়। পাশাপাশি, রাশিয়া ইউক্রেনে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে সক্ষম হয়, অথচ তার আগে কিভ আমেরিকার কাছ থেকে কোনও আগাম সতর্কবার্তা পায়নি।

স্টারলিঙ্কে বিধিনিষেধ আরোপের সময়েই রাশিয়ার ডিজেল কেনার বিষয়ে একটি মার্কিন চুক্তির কথা ঘোষণা করেন ট্রাম্প। যদিও ইউক্রেনের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য আদানপ্রদান কমিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তে তাঁর প্রশাসনের ভূমিকা থাকার কথা প্রথমে অস্বীকার করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

মাস্কের প্রসঙ্গ টেনে ট্রাম্প বলেন, ‘‘কেউ এটা করেছে কি না, আমি জানি না। কিন্তু আমি করিনি, আর আমার মনে হয় না ইলনও করেছেন।’’

তবে গত বুধবার ট্রাম্পের অবস্থানের পক্ষে সওয়াল করতে গিয়ে মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিয়ো কার্যত মাস্কের দিকেই আঙুল তোলেন। তাঁর বক্তব্য, স্টারলিঙ্ক, স্টারশিল্ড এবং মাস্কের নেওয়া সিদ্ধান্তের সঙ্গে প্রেসিডেন্টের কোনও সম্পর্ক নেই। তিনি বলেন, ‘‘ওটা একটি বেসরকারি সংস্থা। প্রেসিডেন্ট সেই সংস্থা চালান না এবং ওই সংস্থাকে কিছু করার নির্দেশও দিতে পারেন না।’’

এর পাল্টা, স্টারশিল্ডের উপর বিধিনিষেধের দায় মার্কিন প্রশাসনের উপর চাপান মাস্ক। গত সপ্তাহে সমাজমাধ্যম এক্সে তিনি লেখেন, এই ব্যবস্থাগুলি ‘‘মার্কিন সরকারের মালিকানাধীন এবং নিয়ন্ত্রণাধীন’’। তাঁর বক্তব্য, ‘‘গতি বা ব্যবহারের উপর যে কোনও সীমা নির্ধারণ করে মার্কিন সেনাবাহিনী এবং শেষ পর্যন্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট।’’

বৃহস্পতিবার মাস্কের পাশে দাঁড়ান মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সও। তিনি বলেন, আমেরিকার সরকার কার্যকর নির্দেশ না দিলে মাস্ক ‘‘দু’টি রাষ্ট্রের মধ্যে চলতে থাকা একটি যুদ্ধের মাঝখানে জড়িয়ে পড়তে চান না’’।

জেলেনস্কি অবশ্য বিধিনিষেধের জন্য মার্কিন প্রশাসন এবং স্পেসএক্স—দু’পক্ষকেই দায়ী করেছিলেন। তাঁর কথায়, ‘‘গতি সীমিত করার বার্তা এসেছিল মার্কিন সরকারের কাছ থেকে… আর প্রযুক্তিগত ভাবে সেটা কার্যকর করেছে স্পেসএক্স।’’

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট আরও দাবি করেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলিতে স্টারশিল্ড টার্মিনালের উপর একই ধরনের বিধিনিষেধ ছিল না। তাঁর বক্তব্য, বিধিনিষেধ শুধু ইউক্রেনের ক্ষেত্রেই কার্যকর হয়েছিল। ‘‘অন্য ভাবে বললে, এটি একটি পরিকল্পিত অভিযান,’’ মন্তব্য করেন তিনি। এই সিদ্ধান্তের জেরে প্রাণহানির আশঙ্কাও প্রকাশ করেছিলেন জেলেনস্কি।

শনিবার টেলিগ্রামে প্রকাশিত একটি ভিডিওবার্তায় পরিষেবা পুনরুদ্ধারের কথা জানান ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট। কূটনৈতিক সুরে দেওয়া বার্তায় সমস্যার সমাধানে ট্রাম্প, মার্কিন বিদেশ দফতর এবং আমেরিকার অন্য সহযোগীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।

জেলেনস্কি বলেন, ‘‘আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হল, স্টারলিঙ্ক ও স্টারশিল্ড বিধিনিষেধ আরোপের আগের গতিতে আবার কাজ শুরু করেছে। গতি এখন আমাদের প্রয়োজনীয় স্তরে পৌঁছেছে।’’

তাঁর দাবি, রাত থেকেই পরিষেবা স্বাভাবিক করার কাজ শুরু হয়েছিল। শনিবার সকালের মধ্যে সামরিক অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় গতি ফিরে আসে। জেলেনস্কির কথায়, ‘‘যুদ্ধের সম্মুখসারিতে আমাদের রসদ সরবরাহ এবং জেট ইঞ্জিনচালিত শাহেদ ড্রোনের বিরুদ্ধে ইউক্রেনকে রক্ষা করার জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ।’’

এর আগে বৃহস্পতিবার ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, স্টারলিঙ্ক পরিষেবা ফের পূর্ণ গতিতে চলছে। কিন্তু সংবাদসংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে এক ইউরোপীয় কর্মকর্তা পরিষেবাটি সম্পূর্ণ কার্যকর হওয়ার দাবি নাকচ করেন।

শুক্রবার সাংবাদিকেরা ট্রাম্পকে প্রশ্ন করেন, ইউক্রেনের স্টারলিঙ্ক ব্যবহারের সুযোগ নিয়ে মাস্ককে ‘ছেলেখেলা’ বন্ধ করতে বলবেন কি না। উত্তরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘‘আমি তাঁর সঙ্গে কথা বলিনি। হয়তো বলতে হবে… আমি শুনেছি সমস্যাটা মিটে গিয়েছে। কিন্তু যদি না মিটে থাকে, আমি তাঁর সঙ্গে কথা বলব… কোনও সমস্যা থাকলে আমি তা ঠিক করে দেব।’’

এর পর মাস্ককে ‘অত্যন্ত মেধাবী’ এবং ‘খুব ভাল’ মানুষ বলে বর্ণনা করেন ট্রাম্প।