মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচার যখন শেষ পর্যায়ে, তখন ভোটারদের মন জয়ের লড়াইয়ে ডেমোক্র্যাটদের অন্যতম প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছেন প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে শেষ মুহূর্তের প্রচারে তাঁর তারকাখ্যাতি ও ক্ষুরধার রসবোধকেই কাজে লাগাতে চাইছে দল।
শনিবার নির্বাচনী প্রচারে ফিরে নিজের উত্তরসূরি ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানালেন ওবামা। ক্লিভল্যান্ডে ডেমোক্র্যাটদের এক জনসভায় তিনি বলেন, “এই প্রশাসনের কিছু নির্বুদ্ধিতার উপরে অন্তত খানিকটা লাগাম পরানোর শেষ বড় সুযোগ এই নির্বাচন। আমাদের সেই সার্কিট ব্রেকারের সুইচটা নামাতে হবে। এই প্রশাসনকে জবাবদিহির আওতায় আনার কাজ শুরু করতে হবে।”
মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে প্রচারের শেষ কয়েক সপ্তাহে ওবামাকেই দলের অন্যতম কার্যকর প্রচারমুখ হিসেবে সামনে আনছেন ডেমোক্র্যাটরা। অন্য দিকে, ট্রাম্প প্রায় প্রতিদিনই নির্বাচনী জনসভা করছেন। তাঁর মোকাবিলায় ওবামার জনপ্রিয়তা ও রাজনৈতিক বাগ্মিতার উপরেই ভরসা রাখছে বিরোধী শিবির।
প্রাক্তন প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বে যে তিনটি জনসভা হওয়ার কথা, তার প্রথমটি ছিল ওহাইওতে। সেখানে গভর্নর পদে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যামি অ্যাক্টন এবং সেনেট পদপ্রার্থী শেরড ব্রাউনের সমর্থনে প্রচার করেন তিনি। দু’টি আসনেই লড়াই এতটাই হাড্ডাহাড্ডি যে, ফলাফল নিয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। শনিবার সন্ধ্যায় মিশিগানের ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের হয়ে প্রচারে ডেট্রয়েটে যাওয়ার কথা ছিল ওবামার। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সেনেট পদপ্রার্থী আবদুল এল-সায়েদ। বুধবার তাঁর জর্জিয়ায় যাওয়ার কথা।
ওহাইওর সভায় ওবামার অভিযোগ, জিনিসপত্রের দাম কমানো এবং অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধ এড়িয়ে চলার যে প্রতিশ্রুতি ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারে দিয়েছিলেন, নিজের কাজের মধ্য দিয়েই তা ভঙ্গ করছেন তিনি। ওবামার আরও অভিযোগ, ট্রাম্প এমন এক প্রশাসন চালাচ্ছেন, যার অদক্ষতা নজিরবিহীন। অভিবাসন থেকে ইরান—বিভিন্ন বিষয়ে নিজের প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন নীতির সঙ্গে ট্রাম্পের নীতির তুলনা টানেন তিনি। কানাডার উপর শুল্ক চাপানোর প্রসঙ্গ তুলে ট্রাম্পের শুল্কনীতিকেও বিদ্রুপ করেন।
ওবামার কটাক্ষ, “এঁরাই তো আমাদের ম্যাপল সিরাপ আর মার্টিন শর্টকে দিয়েছেন। কানাডার মানুষজন এত ভালো!”
হোয়াইট হাউসের অন্দরসজ্জা বদলানো এবং নতুন বলরুম তৈরির উদ্যোগ নিয়েও ট্রাম্পকে নিশানা করেন ওবামা। তাঁর কথায়, “দেখে মনে হচ্ছে, বাড়িঘর সংস্কারের দিকেই ওঁর মন সবচেয়ে বেশি। ওঁর তো এইচজিটিভিতে থাকা উচিত। হোয়াইট হাউসকে এমন চেহারা দিয়েছেন, যেন সাদ্দাম হুসেন সেখানে একটা ‘চিজকেক ফ্যাক্টরি’ খুলেছেন। সর্বত্র শুধু সোনা আর সোনা।”
তবে ওবামার আক্রমণ শুধু ট্রাম্পের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাঁর বক্তব্য, বর্তমান প্রশাসনে এমন অনেকেই রয়েছেন, যাঁরা নিজেদের দায়িত্বের গুরুত্ব বোঝেন না। উদাহরণ হিসেবে প্রতিরক্ষাসচিব পিট হেগসেথের নাম করেন তিনি।
ওবামার কটাক্ষ, “উনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সব বিষয়ে মন দিয়েছেন—যেমন আমাদের সেনাদের চোয়ালের গড়ন, তাঁদের টেস্টোস্টেরনের মাত্রা আর মানুষকে হত্যা করার দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচার করা। কারণ ওঁর ধারণা, এভাবেই সেই পৌরুষদীপ্ত যোদ্ধার মানসিকতা তৈরি করতে হয়। আপনাদের কী মনে হয়, এই প্রতিরক্ষাসচিব সকালে আয়নার সামনে নিজেকে দেখতে কতটা সময় কাটান?”
পরবর্তী জনসভায় ওবামার সঙ্গে থাকার কথা এল-সায়েদের। জনস্বাস্থ্য প্রশাসনে কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকা এই প্রার্থী এমন এক সেনেট আসনে কঠিন লড়াইয়ের মুখে, যা সেনেটের নিয়ন্ত্রণ দখলের লড়াইয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে এল-সায়েদ অন্যতম আলোচিত মুখ হয়ে উঠেছেন। জনমুখী বিভিন্ন নীতির পক্ষে তাঁর জোরালো অবস্থান নিজের দলকেও অস্বস্তিতে ফেলেছে। একই সঙ্গে রিপাবলিকানদের কটাক্ষেরও নিয়মিত নিশানা তিনি।
এল-সায়েদের কথায়, ২০০৮ সালে ডেমোক্র্যাটিক ন্যাশনাল কনভেনশনে ওবামার ভাষণ শুনেই তিনি রাজনীতিতে নিজের সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছিলেন। চলতি মাসের গোড়ায় সমাজমাধ্যম এক্সে তিনি লেখেন, ওবামা “আমার নিজের মধ্যে এমন কিছু দেখিয়েছিলেন, যা তাঁকে ছাড়া হয়তো আমি কোনও দিন দেখতে পেতাম না।”
তবে অতীতে ওবামার সমালোচনা করে করা কিছু মন্তব্যের জন্যও প্রশ্নের মুখে পড়েছেন এল-সায়েদ। ওবামা কেন আরও বেশি অগ্রগতি ঘটাতে পারেননি, তা নিয়ে সরব হয়েছিলেন তিনি। সেই সমালোচনার মধ্যে ছিল ওবামার অন্যতম প্রধান কৃতিত্ব হিসেবে পরিচিত স্বাস্থ্যবিমা সংস্কার আইন, ‘অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্ট’ও।
এনবিসির ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে এক সাক্ষাৎকারে এল-সায়েদ বলেন, ওই মন্তব্যগুলি করার সময়ে তিনি কমবয়সি ছিলেন এবং ক্ষুব্ধও ছিলেন। ওবামা সম্পর্কে তাঁর বর্তমান মূল্যায়ন, “যে পরিস্থিতিতে তাঁকে কাজ করতে হয়েছিল, তার মধ্যে তিনি নিজের সাধ্যমতো সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিলেন।”