প্রথম দফায় পিছিয়ে পড়েছিলেন বামপন্থী রাষ্ট্রপতি লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। কিন্তু ব্রাজিলের চূড়ান্ত দফার নির্বাচনের আগে ব্যবধান কমিয়ে ফের লড়াইয়ে ফিরেছেন তিনি। শেষ মুহূর্তে লুলার সমর্থনে ভোটারদের বোঝানোর চেষ্টা চলছে ঘরে ঘরে। অন্য দিকে, অতি-দক্ষিণপন্থী প্রার্থী ফ্লাভিও বোলসোনারোর শিবিরও শেষ মুহূর্তের প্রচারে কোনও খামতি রাখতে চাইছে না। রবিবারের ভোটে তাই হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত।

নাইয়ারা বোরোনি, নিকোলাস দোমিঙ্গেস এবং জোদেরসন দিয়েগো একই শহরে থাকেন। কিন্তু একে অপরকে চেনেন না। তা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক দিনগুলিতে তাঁরা একই কাজ করেছেন—প্রথম দফায় লুলাকে ভোট দেননি, এমন অন্তত একজনকে বুঝিয়ে চূড়ান্ত দফায় তাঁর পক্ষে ভোট দিতে রাজি করিয়েছেন।

বোরোনি রাজি করিয়েছেন তাঁর ঠাকুমাকে, যিনি প্রথম দফায় ভোট দিতেই যাননি। দোমিঙ্গেস বুঝিয়েছেন এক তুতো ভাইকে, যিনি চতুর্থ স্থানে থাকা প্রার্থীকে ভোট দিয়েছিলেন। আর দিয়েগো যা করেছেন, তীব্র মেরুকরণের ব্রাজিলে তা অনেকের কাছেই প্রায় অসম্ভব বলে মনে হতে পারে। অতি-দক্ষিণপন্থী সেনেটর ফ্লাভিও বোলসোনারোকে ভোট দেওয়া এক মহিলাকে শিবির বদলাতে রাজি করিয়েছেন তিনি।

৩৩ বছরের নাচের শিক্ষক দিয়েগো মিনাস জেরাইস রাজ্যের রাজধানী বেলো হরিজন্তের বাসিন্দা। তাঁর কথায়, ‘‘ও আমার ছাত্রী। নিজের ইভানজেলিক্যাল গির্জার প্রভাবে ও লুলাকে ভোট দেয়নি। আমি তর্ক করিনি। বোঝানোর চেষ্টা করেছি, ওঁর সম্পর্কে যা বলা হচ্ছে, তার সবটা ঠিক নয়। তারপর ও বলেছে, মত বদলেছে।’’

যাঁরা প্রথম দফায় ভোট দেননি বা যাঁদের ভোট বাতিল হয়েছে, তাঁদের সমর্থন আদায় করা এবং অন্য প্রার্থীদের ভোটারদের নিজের দিকে টেনে আনা—এখন লুলার নির্বাচনী কৌশলের কেন্দ্রে এই লক্ষ্যই। ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ইতিহাসে নজির গড়তে চান তিনি: প্রথম দফায় পিছিয়ে পড়েও চূড়ান্ত দফায় জয় ছিনিয়ে নেওয়া। গত ৫ অক্টোবরের প্রথম দফায় ফ্লাভিও বোলসোনারোর চেয়ে পিছিয়ে ছিলেন লুলা।

২০২২ সালের নির্বাচনের তুলনায় এ বার লুলা ৩৮ লক্ষ ভোট কম পেয়েছেন। সে বার তাঁর প্রতিপক্ষ ছিলেন ফ্লাভিওর বাবা, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জাইর বোলসোনারো। চূড়ান্ত দফায় হারের পর অভ্যুত্থানের চেষ্টা করেছিলেন জাইর। কিন্তু সশস্ত্র বাহিনীর তিন শাখার মধ্যে দু’টির প্রধান তাতে শামিল হতে অস্বীকার করায় সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়।

২৭ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত জাইর এখন গৃহবন্দি অবস্থায় সাজা কাটাচ্ছেন। নিজের পরিবর্তে নির্বাচনে লড়ার জন্য জ্যেষ্ঠ পুত্র ফ্লাভিওকেই বেছে নিয়েছেন তিনি। ফ্লাভিও জানিয়েছেন, নির্বাচিত হলে বাবাকে ক্ষমা করে দেবেন এবং তাঁর হাত থেকেই রাষ্ট্রপতির আনুষ্ঠানিক উত্তরীয় গ্রহণ করবেন।

বাবার তুলনায় এ বার ৫০ লক্ষ বেশি ভোট পেয়েছেন ফ্লাভিও। কংগ্রেস, রাজ্য সরকার এবং রাজ্য আইনসভার নির্বাচনেও তাঁর দল উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে। প্রথম দফার ফলাফলের পর অনেক বিশ্লেষকের চোখে তিনিই হয়ে উঠেছিলেন জয়ের স্পষ্ট দাবিদার।

কিন্তু পরবর্তী তিন সপ্তাহের প্রচারে জনমত সমীক্ষাগুলিতে দেখা গিয়েছে, দুই প্রার্থীর ব্যবধান ক্রমশ কমছে। এখন তাঁরা প্রায় সমানে সমানে। ফ্লাভিও সামান্য এগিয়ে থাকলেও ব্যবধান এক শতাংশ পয়েন্টেরও ভগ্নাংশমাত্র।

মিনাস জেরাইসের ফেডারেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মানোয়েল লিওনার্দো সান্তোস বলেন, ‘‘পরিস্থিতি অত্যন্ত হাড্ডাহাড্ডি। তবে চূড়ান্ত দফার প্রচারে লুলার শিবির লক্ষণীয় ভাবে ভাল করছে।’’

লুলার আশার অন্যতম কারণ, প্রথম দফায় প্রথম ও দ্বিতীয় স্থানে থাকা প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান এ বার ইতিহাসে সবচেয়ে কম—দুই শতাংশ পয়েন্টেরও নিচে। কিন্তু উদ্বেগের জায়গাও রয়েছে। ভোটদানে বিরত থাকার হার পৌঁছেছে রেকর্ড ২১ শতাংশে। সাধারণত এতে লুলারই বেশি ক্ষতি হয়। কারণ, নিম্ন আয়ের মানুষ, কম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পাওয়া ভোটার এবং প্রবীণদের মধ্যে তাঁর সমর্থন বেশি। অথচ এই গোষ্ঠীগুলির মধ্যেই ভোট না দেওয়ার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি।

ভোটদানে বিরত থাকার হার সবচেয়ে বেশি যে দশটি শহরে, তার আটটিই মিনাস জেরাইসে। সাও পাওলোর পর এই রাজ্যেই দেশের সবচেয়ে বেশি ভোটার। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে গোটা দেশের জনমতের দিকনির্দেশক হিসেবেও ঐতিহাসিক ভাবে পরিচিত রাজ্যটি। মিনাস জেরাইসে না জিতে কোনও প্রার্থী কখনও জাতীয় স্তরে জয়ী হননি। অথচ এ বার এই রাজ্যে প্রথম দফায় ফ্লাভিওর চেয়ে প্রায় পাঁচ শতাংশ পয়েন্ট পিছিয়ে ছিলেন লুলা।

একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হেলসিমারা দে সুজা তেলেস বলেন, ‘‘লুলার ভোটাররা ভোট দিতে এলে তিনি জিততে পারেন। কিন্তু তাঁদের ভোটকেন্দ্রে নিয়ে আসতে তিনি সফল হবেন, এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই।’’

অন্য দিকে, ফ্লাভিওর সমর্থকেরাও ভোটারদের সক্রিয় রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। গত মঙ্গলবার স্থানীয় রাজনীতিকদের একটি অনুষ্ঠানে বড় পর্দায় ভিডিও কলের মাধ্যমে যোগ দেন তিনি। সেখানে তাঁর বাবা জাইরের ২৩ ফুট উঁচু একটি বায়ুভর্তি প্রতিকৃতিও রাখা হয়েছিল। উপস্থিত কয়েক ডজন সমর্থককে মিনাস জেরাইসের নবনির্বাচিত গভর্নর ক্লেইতিনিয়ো আজেভেদো বলেন, ‘‘আমরা ইতিমধ্যেই জিতে গিয়েছি, এমন ভাববেন না। মানুষের কাছে ভোট চেয়ে যেতে হবে।’’

অনুষ্ঠানস্থলের কাছেই শ্রমজীবী পাড়ায় থাকেন ৪৪ বছরের ফার্মাসিস্ট মাগদা আপারেসিদা আরাউজো। অনুষ্ঠানের পিছনের সারিতে বসে তিনি জানান, লুলার সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের সুফল পেয়েছেন তিনি। ‘‘লুলার সরকারগুলিকে আমি ছোট করব না। কারণ, বৃত্তি পেয়েছিলাম বলেই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পেরেছি। কিন্তু এখন বোলসোনারোকে ভোট দিই। তিনি পরিবারের পক্ষে দাঁড়ান, আর আমি সনাতন মূল্যবোধ সমর্থন করি,’’ বলেন আরাউজো।

নির্বাচনী গুরুত্বের কথা মাথায় রেখেই লুলা ও ফ্লাভিও দু’জনেই শেষ দিকের কয়েকটি জনসভার জন্য মিনাস জেরাইসের রাজধানীকে বেছে নিয়েছেন। ফ্লাভিওর সভা হওয়ার কথা ছিল শনিবার সকালে। লুলা তাঁর সভা করেছেন গত বুধবার।

সেই সভায় সমবয়সি বন্ধুদের সঙ্গে হাজির হয়েছিল ১৭ বছরের ছাত্রী এস্টার নাসিমেন্তো। তার কথায়, ‘‘আমি এখানে এসেছি, কারণ অতি-দক্ষিণপন্থীদের আবার ক্ষমতায় ফিরে আমাদের সমস্ত অধিকার ধ্বংস করতে দিতে পারি না।’’

এস্টারের মতো তরুণদের স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে পথে নামাকেই অনেকে লুলার প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা তৈরির বড় অনুঘটক বলে মনে করছেন। ব্রাজিলজুড়ে বড় বড় প্রতিবাদে অংশ নিচ্ছেন তরুণেরা। নাসিমেন্তোর কথায়, ‘‘আমার মনে হয়, সবাই অনুভব করেছে—নিজেদের কথা শোনাতেই হবে।’’

ডিজিটাল জগতে স্বচ্ছন্দ তরুণ রাজনীতিকদের পরামর্শ নিয়ে লুলার দল অনলাইন প্রচারেও আমূল বদল এনেছে। ৮১ বছরের রাষ্ট্রপতির নিজের মোবাইল ফোনও নেই, অথচ তিনিই এখন সেলফি-ভিডিয়ো রেকর্ড করতে শুরু করেছেন।

তাঁর লক্ষ লক্ষ সমর্থক যোগ দিয়েছেন ‘লুলার বাহিনী’ নামে একটি হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেলে। সেখানে কংগ্রেস সদস্য আন্দ্রে জানোনেস প্রতিদিন কয়েক ডজন নির্দেশ পাঠিয়েছেন—লুলার সমর্থনে তৈরি বিষয়বস্তু কী ভাবে ভাইরাল করতে হবে। অনলাইনে মানুষের কাছে পৌঁছনোর নিরিখে এই প্রথম বোলসোনারোকে ছাপিয়ে গিয়েছেন লুলা।

নির্বাচনী আইন যতটা সুযোগ দেয়, তার প্রায় শেষ সীমা পর্যন্ত গিয়ে লুলা একগুচ্ছ সুবিধাও ঘোষণা করেছেন। দরিদ্র পরিবারগুলির প্রধান নগদ সহায়তা প্রকল্পে অর্থের পরিমাণ বাড়ানো এবং নির্ধারিত সময়ের আগেই সেই অর্থ দেওয়ার মতো পদক্ষেপ রয়েছে তার মধ্যে। পাশাপাশি, কর্মসপ্তাহের দৈর্ঘ্য কমানোর প্রস্তাব কংগ্রেসে অনুমোদন করিয়ে বড় রাজনৈতিক সাফল্য পেয়েছেন তিনি। এর প্রভাব পড়তে পারে তিন কোটি শ্রমিক-কর্মচারীর জীবনে।

তবু বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, জনমত সমীক্ষায় দুই প্রার্থীর ব্যবধান কমে আসার বড় কারণ ফ্লাভিওর সমর্থন হারানো। তাঁকে ভোট দিতে অনিচ্ছুক মানুষের হার বেড়েছে। অন্য দিকে, লুলার ক্ষেত্রে সেই হার সামান্য কমেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ফ্লাভিওর সাম্প্রতিক কিছু পদক্ষেপ দোদুল্যমান ভোটারদের দূরে সরিয়ে দিয়ে থাকতে পারে। প্রথম রাষ্ট্রপতি বিতর্কে তাঁর আচরণ অনেকের চোখে আক্রমণাত্মক ঠেকেছে। বিতর্ক তৈরি হয়েছে তাঁর একটি বক্তৃতা নিয়েও। সেখানে তিনি বলেন, নতুন কংগ্রেসের প্রবল রক্ষণশীল সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি ‘‘সংবিধান বদলাবেন এবং এই দেশে নতুন করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবেন’’।

২৫ বছরের প্রশাসনিক সহকারী দগলাস পেরেইরা মেলোর কাছে সেটিই ছিল প্রথম বিপদের সংকেত। তিন সপ্তাহ আগে তিনি অতি-দক্ষিণপন্থী ইনফ্লুয়েন্সার রেনান সান্তোসকে ভোট দিয়েছিলেন। কিন্তু এ বার লুলাকে বেছে নিয়েছেন।

মেলোর কথায়, ‘‘উনি সংবিধান বদলে দেবেন বলছেন—এটা অত্যন্ত বিপজ্জনক। ওঁর বাবা অভ্যুত্থানের চেষ্টা করেছিলেন। আমার ভয়, উনিও বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করবেন।’’

তিনি জানান, ‘‘বোলসোনারোকে ঘিরে কেলেঙ্কারিগুলিও’’ তাঁর সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে।

ফ্লাভিওর বিরুদ্ধে ফেডারেল পুলিশের দু’টি তদন্ত চলছে। একটি তদন্তে খতিয়ে দেখা হচ্ছে, তাঁর বাবাকে নিয়ে জীবনীচিত্র তৈরির জন্য দুর্নীতির অভিযোগে বিতর্কিত এক ব্যাঙ্কারের কাছে চাওয়া দুই কোটি পাউন্ডের কী হয়েছিল। একটি রেকর্ডিংয়ে ওই অর্থ চাওয়ার কথা শোনা গিয়েছে বলে অভিযোগ। অন্য তদন্তটি অর্থপাচারের অভিযোগ এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধু উইলার তোমাজের সঙ্গে ফ্লাভিওর সম্ভাব্য ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব নিয়ে। তোমাজ পেশায় আইনজীবী এবং বাজির ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।

ফুটবলার রিশার্লিসনের সঙ্গেও বিবাদে জড়িয়েছেন ফ্লাভিও। রিশার্লিসনের অভিযোগ, একটি দ্বীপে থাকা তাঁর প্রাসাদোপম বাড়িটি হাতছাড়া করাতে বোলসোনারো ও তোমাজ ষড়যন্ত্র করেছেন।

এ ছাড়া গত বৃহস্পতিবার পিয়াউই পত্রিকা জানিয়েছে, ২০২০ সালে কোভিড অতিমারির চরম সময়ে ফ্লাভিও একটি নৌকায় বারবিকিউয়ের আসরে যোগ দিয়েছিলেন। সেখানে যৌনকর্মীদের পাশাপাশি এমন লবিস্টরাও উপস্থিত ছিলেন, যাঁরা তাঁর বাবার প্রশাসনের সঙ্গে টিকা কেনা নিয়ে আলোচনা চালাচ্ছিলেন।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মানোয়েল লিওনার্দো সান্তোসের মতে, প্রথম দফায় ফ্লাভিওর জয়ের পর লুলার যে অবস্থান ছিল, তার তুলনায় এখন চূড়ান্ত দফায় তাঁর লড়াই করার জায়গা অনেক ভাল। এ বিষয়ে তাঁর ‘‘কোনও সন্দেহ নেই’’।

তবে ফল উল্টে দেওয়ার পক্ষে এই অগ্রগতি যথেষ্ট কি না, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। সান্তোসের কথায়, ‘‘ফল উল্টে দেওয়ার পক্ষে এটুকু যথেষ্ট হবে কি না, আমরা বলতে পারি না। কিন্তু লুলা জমি উদ্ধার করেছেন, আর বোলসোনারোর সমর্থন বাড়া যেন থমকে গিয়েছে।’’