বাংলাস্ফিয়ার: বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ মহিলা গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়ার যোগ্যতা অর্জনের এক মাসের মধ্যেই ফের ইতিহাস গড়ল ভারতীয় বংশোদ্ভূত বোধনা শিবানন্দন। ইংল্যান্ডের এই দাবাড়ু মাত্র ১১ বছর সাত মাস ১৬ দিন বয়সে ইন্টারন্যাশনাল মাস্টার বা আইএম খেতাবের সব শর্ত পূরণ করেছে। ভেঙেছে হাঙ্গেরির কিংবদন্তি জুডিথ পোলগারের ৩৮ বছরের পুরনো রেকর্ড। পোলগার ১৯৮৮ সালে ১২ বছর বয়সে এই খেতাব পেয়েছিলেন। মহিলা দাবার ইতিহাসে বোধনার এই উত্তরণ তাই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, মন্টেনেগ্রোর বুদভায় ইউরোপীয় ক্লাব কাপে শেষ রাউন্ডে সুইডেনের মহিলা ইন্টারন্যাশনাল মাস্টার ভিক্টোরিয়া ইয়োহানসনকে হারিয়ে নজির গড়ে বোধনা। ‘শি প্লেজ টু উইন লায়নেসেস এ’ দলের প্রথম বোর্ডে খেলে সাত রাউন্ডে তার সংগ্রহ সাড়ে পাঁচ পয়েন্ট। শেষ ম্যাচে কালো ঘুঁটি নিয়ে ৩২ চালে জয় আসে। এই সাফল্য তাকে সর্বকনিষ্ঠ দশজন ইন্টারন্যাশনাল মাস্টারের তালিকাতেও জায়গা করে দিয়েছে।

খেতাব দুটির পার্থক্য এখানে গুরুত্বপূর্ণ। মহিলা গ্র্যান্ডমাস্টার বা ডব্লিউজিএম মহিলাদের জন্য নির্দিষ্ট খেতাব। কিন্তু ইন্টারন্যাশনাল মাস্টার নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের জন্য উন্মুক্ত এবং তার যোগ্যতার মান আরও উঁচু। বুদভায় বোধনা প্রয়োজনীয় ২৪০০ লাইভ রেটিং অতিক্রম করার পাশাপাশি তৃতীয় তথা শেষ আইএম নর্ম অর্জন করেছে। অর্থাৎ, সংশ্লিষ্ট খেতাবের জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিযোগিতামূলক সাফল্যের শর্তও পূরণ হয়েছে। এখন বাকি ফিডের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন।

মাত্র তিন মাসের মধ্যে তিনটি আইএম নর্ম এসেছে তার ঝুলিতে। জুলাইয়ে ফ্রান্সের দোল ওপেনে প্রথমটি, সেপ্টেম্বরে উজবেকিস্তানের সমরখন্দে দাবা অলিম্পিয়াডে দ্বিতীয়টি এবং অক্টোবরে ইউরোপীয় ক্লাব কাপে তৃতীয়টি। অলিম্পিয়াডে ইংল্যান্ডের প্রথম বোর্ডে সব রাউন্ড খেলে ১১ ম্যাচে আট পয়েন্ট পেয়েছিল বোধনা। এত অল্প সময়ে ধারাবাহিকভাবে উচ্চমানের প্রতিযোগিতায় সাফল্যই তার দ্রুত উত্থানের ভিত্তি।

উত্তর-পশ্চিম লন্ডনের হ্যারোতে বড় হওয়া এই কিশোরীর দাবার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল প্রায় আকস্মিকভাবেই। ২০২০ সালের কোভিড লকডাউনে পরিবারের এক বন্ধুর দেওয়া খেলনা ও বইয়ের মধ্যে একটি দাবার সেট পায় সে। প্রথমে ঘুঁটিগুলি খেলনা হিসেবেই ভালো লেগেছিল। বাবা খেলার নিয়মের কথা বোঝান। পরে ইউটিউবের ভিডিও দেখে শেখা শুরু করে বোধনা। অচিরেই বাবাকে হারাতে থাকে। তার বাবা-মা দুজনেই প্রকৌশলী; কেউই দক্ষ দাবাড়ু নন।

এর পর থেকে একের পর এক সাফল্য এসেছে। ২০২৪ সালে মাত্র নয় বছর বয়সে ইংল্যান্ডের দাবা অলিম্পিয়াড দলে জায়গা পায় বোধনা। ইংলিশ চেস ফেডারেশনের হিসাবে, যে কোনও খেলায় ইংল্যান্ডের হয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে সেটি সর্বকনিষ্ঠ হওয়ার নজির। ২০২৫ সালে গ্র্যান্ডমাস্টার পিটার ওয়েলসকে হারিয়ে সবচেয়ে কম বয়সি মহিলা হিসেবে গ্র্যান্ডমাস্টারকে পরাজিত করার রেকর্ডও গড়ে সে। এপ্রিলেই ব্রিটেনের মহিলা দাবাড়ুদের মধ্যে সর্বোচ্চ রেটিংয়ের অধিকারী হয়েছিল বোধনা। সেই তালিকায় তার রেটিং ছিল ২৩৬৬। বিশ্বের সেরা একশো মহিলা দাবাড়ুর মধ্যেও প্রথম বার জায়গা করে নেয় সে। অভিজ্ঞ প্রতিদ্বন্দ্বীদের ছাড়িয়ে এই অগ্রগতি আন্তর্জাতিক দাবায় তার সম্ভাবনাকে আরও স্পষ্ট করে।

চলতি বছরের অগস্টে ব্রিটিশ মহিলা দাবা চ্যাম্পিয়নশিপেও নতুন ইতিহাস লিখেছে বোধনা। কভেন্ট্রির প্রতিযোগিতায় র‌্যাপিড প্লে-অফে আয়ারল্যান্ডের তৃষা কান্যামারালাকে হারিয়ে দেশের সর্বকনিষ্ঠ মহিলা চ্যাম্পিয়ন হয়। একই প্রতিযোগিতায় গ্র্যান্ডমাস্টার অমিত ঘাসিকেও পরাজিত করে। সেপ্টেম্বরের অলিম্পিয়াডে আবার মহিলা গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়ার শেষ প্রয়োজনীয় নর্ম পায়। সেখানে ছয়টি জয়, চারটি ড্র এবং মাত্র একটি হার তার ধারাবাহিকতার পরিচয় দেয়।

সাফল্যের মধ্যেও বোধনার জীবনে স্কুল, বই পড়া, পিয়ানো ও বেহালা বাজানোর জায়গা রয়েছে। দাবার বোর্ডে স্বচ্ছন্দে পৌঁছতে এখনও উঁচু আসনের সাহায্য লাগে তার। অথচ প্রতিপক্ষের পরিচয় বা বড় মঞ্চের চাপ নিয়ে অতিরিক্ত ভাবতে চায় না। খেলা উপভোগ করাই তার কাছে প্রধান। নতুন রেকর্ডের পরও বোধনার চোখ পরের লক্ষ্যে: এবার উন্মুক্ত গ্র্যান্ডমাস্টার খেতাব(Open Grandmaster Title)। সেই উচ্চতায় পৌঁছনোর আশাই জানিয়েছে এগারো বছরের এই দাবাড়ু।