বাংলাস্ফিয়ার: ক্রাইস্টচার্চের হেগলে ওভালে এক অসম্ভবকে সম্ভব করার গল্প লিখল টিম ইন্ডিয়া। খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে নিউ জ়িল্যান্ডের বিরুদ্ধে পাঁচ ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে শ্বাসরুদ্ধকর লড়াইয়ে ৪ উইকেটে জয় ছিনিয়ে নিল শ্রেয়স আইয়ারের দল। প্রাথমিক বিপর্যয়ের ধাক্কা সামলে তিলক বর্মা ও নীতীশ কুমার রেড্ডির মহাকাব্যিক জুটি যেভাবে দলকে জেতালো, তা দীর্ঘদিন মনে রাখবে ক্রিকেটবিশ্ব। তবে জয়ের আনন্দ ছাপিয়ে ম্যাচের শুরুতে ভারতীয় দলের ব্যাটিংয়ের যে নড়বড়ে ছবি সামনে এসেছে, তা নিয়ে চিন্তার মেঘ রয়েই গেল।
এদিন টসে জিতে প্রথমে ফিল্ডিং করার সিদ্ধান্ত নেন ভারতীয় অধিনায়ক শ্রেয়স আইয়ার। ক্রাইস্টচার্চের পেসহায়ক ও কঠিন কন্ডিশনে শুরুতে ভারতীয় বোলাররা কিছু সাফল্য পেলেও, কিউই মিডল অর্ডার প্রতিরোধ গড়ে তোলে। গ্লেন ফিলিপস বিধ্বংসী মেজাজে ব্যাট করে ৪৩ বলে ৭০ রানের দুর্দান্ত এক ইনিংস খেলেন, যা ৪টি চার ও ৪টি ছক্কায় সাজানো ছিল। তাঁকে যোগ্য সঙ্গ দেন বেভন জ্যাকবস, যিনি ৪৬ বলে ৫৮ রান করেন। নির্ধারিত ২০ ওভারে নিউ জ়িল্যান্ড ৫ উইকেটে ১৮০ রানের শক্তপোক্ত পুঁজি দাঁড় করায়। ভারতের পক্ষে অর্শদীপ সিং ২টি এবং ভুবনেশ্বর কুমার, প্রিন্স যাদব ও নীতীশ কুমার রেড্ডি প্রত্যেকে ১টি করে উইকেট নেন।
জবাবে ১৮১ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরু থেকেই চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়ে ভারত। স্কোরবোর্ডে রান তোলার গতি শ্লথ হওয়ার পাশাপাশি নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকে দল। ওপেনার সঞ্জু স্যামসন (১৪) ও অভিষেক শর্মা (২৭) রান কিছুটা বাড়ানোর চেষ্টা করলেও, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষিক্ত তরুণ ব্যাটার বৈভব সূর্যবংশী (৪) বড় রান পাননি। এমনকি অধিনায়ক শ্রেয়স আইয়ারও (৭) দ্রুত সাজঘরে ফিরে যান। একপর্যায়ে ১০.৫ ওভারে মাত্র ৭০ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে লজ্জাজনক হারের মুখে দাঁড়িয়েছিল টিম ইন্ডিয়া। কিউই স্পিনার মিচেল স্যান্টনার মারাত্মক বোলিং করে মাত্র ২১ রান দিয়ে ভারতের ৪টি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট তুলে নিয়ে জয়ের গন্ধ পেতে শুরু করেছিলেন।
ঠিক তখনই ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন নমন ধীর, তিলক বর্মা ও নীতীশ কুমার রেড্ডি। এই তিন তরুণ যেভাবে মাথা ঠান্ডা রেখে পাল্টা আক্রমণ শুরু করেন, তা ক্রিকেট রূপকথার চেয়ে কম কিছু নয়। কোনো প্যানিক না করে ধীরে ধীরে রানরেটের ব্যবধান কমাতে থাকেন তাঁরা। অসাধারণ টেকনিক ও পরিপক্ব ব্যাটিংয়ে কিউই বোলারদের সমস্ত পরিকল্পনা ভেস্তে দেন।
শেষ পর্যন্ত তিলক বর্মা ও নীতীশ কুমার রেড্ডির রূপকথার পার্টনারশিপে ভর করে ১৯.৫ ওভারে ৬ উইকেট হারিয়ে জয়ের বন্দরে পৌঁছে যায় ভারত (১৮১/৬)। তিলক বর্মা মাত্র ২৬ বলে অসাধারণ ৫১ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলেন (যাতে ৬টি চার ও ১টি ছক্কা ছিল), এবং অলরাউন্ডার নীতীশ কুমার রেড্ডি মাত্র ১৩ বলে অপরাজিত ২৬ রানের মহামূল্যবান ইনিংস খেলে জয় নিশ্চিত করেন। নমন ধীরের ১৭ বলে ৩১ রানের ইনিংসও এই জয়ে রীতিমতো এক অনুঘটকের কাজ করেছে তা বলাই বাহূল্য। শেষ ওভারে ম্যাচে যখন টানটান উত্তেজনা, তখন জ্যাকব ডাফির বল থেকে প্রয়োজনীয় রান তুলে নিয়ে দলকে অবিস্মরণীয় জয় এনে দেন নীতীশ।
ম্যাচ জিতলেও, ভারতের মিডল অর্ডারের এই পতন ও টপ অর্ডারের ব্যর্থতা টিম ম্যানেজমেন্টের কপালে যে বড় চিন্তার ভাঁজ ফেলবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। স্যান্টনারের দুর্দান্ত বোলিংয়ের মুখে যেভাবে ভারতীয় ব্যাটিং লাইনআপ ধূলিসাৎ হতে বসেছিল, আগামী দিনে বড় টুর্নামেন্টের আগে সেই ভুলগুলো শুধরে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। তা সত্ত্বেও, নমন, তিলক ও নীতীশের যে লড়াকু মানসিকতা এদিন ক্রাইস্টচার্চের বাইশ গজে ভারতের জয় নিশ্চিত করল তা অবশ্যই ভারতীয় দলকে খানিক স্বস্তি দেবে।
