৩৮ বলে ১১৩ রানের বিধ্বংসী ইনিংস; ১৯৯ রানের লক্ষ্য পেরিয়ে গেল ভারত মাত্র ১৩.২ ওভারে

নিউজিল্যান্ডের অসহায় বোলিং আক্রমণকে এমন নির্মমভাবে ছিন্নভিন্ন করলেন অভিষেক শর্মা যে, কখনও কখনও বৈভব সূর্যবংশীকেও নিছক দর্শক বলে মনে হচ্ছিল। মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ওয়েলিংটনে তৃতীয় টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে ছয় উইকেটে অনায়াস জয় তুলে নিয়ে সিরিজও পকেটে পুরল ভারত।

বিশ্বের এক নম্বর টি-টোয়েন্টি ব্যাটার মাত্র ৩৮ বলে ১১৩ রানের অবিশ্বাস্য ইনিংস খেললেন। অর্ধশতরান এল মাত্র ১৫ বলে। প্রথমে যে ১৯৯ রানের লক্ষ্যকে বেশ কঠিন বলে মনে হয়েছিল, তা নিয়েই কার্যত ছেলেখেলা করল ভারত। মাত্র ১৩.২ ওভারে জয়ের লক্ষ্যে পৌঁছে গেল সফরকারীরা।

অভিষেকের শতরান পূর্ণ হয় ৩৫ বলে। সেই মাইলফলক ছুঁয়ে পরিচিত ধ্যানমগ্ন ভঙ্গিতে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর শক্তিশালী শটের দাপটে তখন হতবাক প্রতিপক্ষের ক্রিকেটার থেকে গ্যালারির দর্শক—সকলেই।

এই জয়ের সঙ্গে নিউজিল্যান্ডের মাটিতে টানা তিনটি টি-টোয়েন্টি সিরিজ জিতল ভারত। এর আগে ২০২০ সালে ৫–০ এবং ২০২২ সালে ১–০ ব্যবধানে সিরিজ জিতেছিল তারা।

১৫ বছরের সূর্যবংশীও কম নির্মম ছিলেন না। মাত্র ১৮ বলে ৪৫ রান করেন তিনি। কিন্তু অভিষেকের তাণ্ডবে তাঁর সেই ইনিংসও আড়ালে চলে যায়। পাঁচ ওভারে দলীয় একশো রান তুলে দ্রুততম শতরানের বিশ্বরেকর্ড গড়ে ভারত। পাওয়ার প্লে-তে ওঠে ১১৮ রান—সেটিও সর্বকালীন সর্বোচ্চ।

সাত ওভারে ১৩৩ রানের উদ্বোধনী জুটি ছিল যেন বিধ্বংসী ব্যাটিংয়ের এক প্রদর্শনী। সহজে তা ভুলবেন না কেউই, বিশেষ করে ওয়েলিংটনের টি-টোয়েন্টি ম্যাচের নির্দিষ্ট মাঠ ওয়েস্টপ্যাক ট্রাস্ট স্টেডিয়ামে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন।

জুটি ভাঙার আগেই দু’জনে মিলে নিউজিল্যান্ডের বোলারদের বিরুদ্ধে এক ডজন ছক্কা মেরে ফেলেছিলেন। সূর্যবংশীর ব্যাট থেকে এসেছিল চারটি, অভিষেকের আটটি।

শেষ পর্যন্ত ১১টি ছক্কা ও ন’টি চার মেরে গ্লেন ফিলিপসের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন অভিষেক। ততক্ষণে নিউজিল্যান্ডের ক্রিকেটারদের মনোবল এমনভাবে ভেঙে দিয়েছেন যে, তাঁর উইকেট পাওয়ার পর উচ্ছ্বাস প্রকাশের উৎসাহটুকুও তাঁদের ছিল না।

লড়াই হিসেবে ম্যাচটিকে কার্যত প্রথম ওভারেই শেষ করে দিয়েছিলেন অভিষেক ও সূর্যবংশী। জেকব ডাফির করা সেই ওভারে ভারত তোলে ২৬ রান।

দ্বিতীয় ওভারে অ্যাডাম মিলন কিছুটা কম খরুচে ছিলেন—দেন ১৭ রান। কিন্তু তৃতীয় ওভারে মাইকেল ব্রেসওয়েল ২১ এবং চতুর্থ ওভারে কাইল জেমিসন ২০ রান দেওয়ার পর অধিনায়ক মিচেল স্যান্টনারের মুখে ফুটে ওঠে হাল ছেড়ে দেওয়ার অভিব্যক্তি।

নিউজিল্যান্ডের ইনিংসের সময় যে পিচে বল একটু থমকে ব্যাটে আসছিল, ভারতের ব্যাটিংয়ের সময় সেটিই যেন একেবারে পাটা হয়ে গেল। মনে হচ্ছিল, অভিষেক ও সূর্যবংশী খেলছেন দিল্লির ফিরোজ শাহ কোটলা কিংবা হায়দরাবাদের উপ্পলের মতো ব্যাটিং-সহায়ক সমতল উইকেটে।

সামনের পা বলের লাইন থেকে সরিয়ে জায়গা করে অফসাইডে আছড়ে মারা, অথবা পা আড়াআড়ি এগিয়ে লেগসাইডে উড়িয়ে দেওয়া—এইটুকুই যেন করতে হচ্ছিল তাঁদের।

অভিষেকের শটের তীব্রতা এমনই ছিল যে, সূর্যবংশীকে তাঁর ছায়ায় ঢাকা পড়ে যেতে দেখা যাচ্ছিল। তবে কয়েকটি শ্বাসরুদ্ধকর শটে নিজের দুঃসাহসের পরিচয় দিয়েছে এই কিশোরও। যদিও রাতটা একান্তই ছিল অভিষেকের।

এর আগে ৫২ বলে ঝকঝকে ৮৯ রানের ইনিংস খেলে স্বমহিমায় ফর্মে ফেরেন ড্যারিল মিচেল। তবে শেষের ওভারগুলিতে ভারতীয় বোলারদের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে নিউজিল্যান্ডকে ২০ ওভারে তিন উইকেটে ১৯৮ রানে আটকে রাখা সম্ভব হয়।

ভারত অধিনায়ক শ্রেয়স আয়ার সিরিজে তৃতীয়বার টসে জিতে আবারও নিউজিল্যান্ডকে প্রথমে ব্যাট করতে পাঠান। শুরুতেই টিম সেইফার্টকে ফিরিয়ে ভারতকে আদর্শ সূচনা এনে দেন পেসার অর্শদীপ সিং। অবিবেচকের মতো একটি শট খেলেই উইকেট দেন সেইফার্ট। চার ওভারে ৩৩ রান দিয়ে এক উইকেট নেন অর্শদীপ।

তবে দ্বিতীয় উইকেটে পাল্টা আক্রমণ করে ৮৬ রান যোগ করেন ফিন অ্যালেন ও মিচেল। অ্যালেন করেন ২৫ বলে ৪০ রান।

ভুবনেশ্বর কুমারকে দু’টি ছক্কা মেরে শুরু করেন অ্যালেন। চার ওভারে ৪০ রান দিয়ে কোনও উইকেট পাননি ভুবনেশ্বর। সিরিজের আগের ম্যাচগুলির মতো এ দিনও সঠিক লেংথ খুঁজে পেতে সমস্যায় পড়েন তিনি।

একমাত্র নিজের শেষ ওভারে, অর্থাৎ নিউজিল্যান্ডের ইনিংসের ১৮তম ওভারে, তাঁকে ছন্দে দেখা যায়। ওই ওভারে ধারাবাহিকভাবে ব্যাটারের পায়ের গোড়ায় বল ফেলতে পেরেছিলেন তিনি। পাঁচ ম্যাচের সিরিজের বাকি ম্যাচগুলির আগে এই বোলিং তাঁকে কিছুটা আত্মবিশ্বাস দেবে।

প্রথমে ভুবনেশ্বরকে লং-অনের উপর দিয়ে ছক্কা মারেন অ্যালেন। তার পর পুল করে বল পাঠান ডিপ মিডউইকেটের বাইরে। অন্য প্রান্তে মিচেলও তখন ব্যাট হাতে ছন্দ খুঁজে পাচ্ছেন।

অ্যালেন প্রতি বলে রান পাচ্ছিলেন না ঠিকই, কিন্তু তৃতীয় ছক্কাটিও মেরে দেন। প্রিন্স যাদবের অফস্টাম্পের বাইরের বল টেনে এনে স্কোয়্যার লেগের উপর দিয়ে উড়িয়ে দেন তিনি।

অন্য প্রান্তে মিচেল বুদ্ধিদীপ্ত কয়েকটি শটে বাউন্ডারি আদায় করেন। তার মধ্যে ছিল প্রিন্সের বলে একটি র‌্যাম্প শটও।

শেষ পর্যন্ত এই জুটি ভাঙেন নীতীশ কুমার রেড্ডি। চার ওভারে ৩৮ রান দিয়ে এক উইকেট নেন তিনি। লং-অনের পাশ দিয়ে বল উড়িয়ে মারতে গিয়ে যথেষ্ট উঁচুতে তুলতে পারেননি অ্যালেন। দশ গজ ছুটে এসে নিচু হয়ে চমৎকার ক্যাচ ধরেন নমন ধীর।

ছন্দে থাকা গ্লেন ফিলিপসকে ১৭ রানে ফেরান অক্ষর পটেল। নিজের বলেই তীক্ষ্ণ রিফ্লেক্সে ক্যাচ ধরেন তিনি। চার ওভারে ৩৬ রান দিয়ে এক উইকেট নেন অক্ষর।

এর পর মিচেলের সঙ্গে যোগ দেন অত্যন্ত সম্ভাবনাময় বলে বিবেচিত বেভন জেকবস। ২৩ বলে অপরাজিত ৩৯ রান করেন তিনি। চতুর্থ উইকেটে আট ওভারে ৭৫ রান যোগ করেন দু’জনে।

মিচেলের ইনিংসে ছিল বেশ কয়েকটি জোরালো শট। পাঁচটি চারের পাশাপাশি মোট পাঁচটি ছক্কা মারেন তিনি।