নয়াদিল্লির ঐতিহাসিক রামলীলা ময়দানে আগামী ১ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হতে চলা বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র (INDIA Bloc) মেগা প্রতিবাদ সমাবেশে পূর্ণ সংহতি ও সমর্থনের কথা ঘোষণা করলেন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (AISA) সর্বভারতীয় সভানেত্রী নেহা বোরা। মানবাধিকার মঞ্চ ‘সিটিজেন্স ফর জাস্টিস অ্যান্ড পিস’ (CJP)-এর পর এবার প্রভাবশালী বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের এই যোগদান ১ নভেম্বরের কর্মসূচিকে বাড়তি রাজনৈতিক ও সামাজিক মাত্রা দিল। নির্বাচন কমিশনের বিতর্কিত ভূমিকা, ভোটার তালিকা থেকে ব্যাপক হারে ভোটারদের নাম বাদ পড়ার অভিযোগ এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিরোধীদের এই যৌথ আন্দোলন এখন জাতীয় রাজনীতির প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় আইসা সভানেত্রী স্পষ্ট জানান, দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা এবং সাংবিধানিক গণতন্ত্র আজ গভীর সংকটের মুখে। নির্বাচন কমিশনের পরিচালিত ভোটার তালিকায় ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (SIR) প্রক্রিয়ার আড়ালে সাধারণ নাগরিক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার তীব্র অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, “গণতন্ত্র কোনও বিমূর্ত ধারণা নয়; মানুষের নির্ভয়ে ভোট দেওয়ার অধিকার এবং অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকারই এর মূল স্তম্ভ। কিন্তু এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কোটি কোটি বৈধ নাগরিককে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিয়ে চরম অবিচার করা হচ্ছে।” নেহা বোরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অবিলম্বে পদত্যাগ, এসআইআর প্রক্রিয়া পুরোপুরি স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালে প্রণীত বিতর্কিত নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহারের দাবিতে ১ নভেম্বর রামলীলা ময়দানে সর্বাত্মক আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। একই সঙ্গে তিনি দেশের ছাত্র, যুব এবং সচেতন নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় ওই দিন রাজপথে নেমে আসার জোরদার আহ্বান জানান।
এর আগে তিস্তা শীতলবাদের মানবাধিকার সংগঠন ‘সিটিজেন্স ফর জাস্টিস অ্যান্ড পিস’ (সিজেপি) এই প্রতিবাদ কর্মসূচিতে তাদের পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেছিল। প্রবীণ আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী প্রশান্ত ভূষণ-সহ নাগরিক সমাজের একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তি নির্বাচন কমিশনের অস্বচ্ছ কর্মপদ্ধতি নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবাদ চালিয়ে আসছেন। এবার তাঁদের সঙ্গে আইসা এবং দেশের ছাত্র সমাজের শীর্ষ নেতৃত্বের সরাসরি যুক্ত হওয়া বিরোধী জোটের আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলীয় রাজনীতির গণ্ডি ছাড়িয়ে এই আন্দোলনকে সাধারণ মানুষ, অধিকারকর্মী ও পড়ুয়াদের একটি ঐক্যবদ্ধ নাগরিক প্ল্যাটফর্মে রূপ দিতে যে কৌশল ইন্ডিয়া ব্লক নিয়েছিল, আইসার এই সমর্থনে তা অনেকটাই গতি পেল।
মূলত নির্বাচন কমিশনের ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ বা এসআইআর কর্মসূচি ঘিরে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। কংগ্রেস, আম আদমি পার্টি, তৃণমূল, সমাজবাদী পার্টি ও বাম দলগুলির সম্মিলিত অভিযোগ, এই বিশেষ পুনর্বিবেচনার নামে দেশজুড়ে বৈধ নাগরিকদের নাম ভোটার তালিকা থেকে পরিকল্পিতভাবে মুছে দেওয়া হচ্ছে, যাকে বিরোধীরা সরাসরি ‘ভোট চুরি’ বলে আখ্যা দিয়েছে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ইতিমধ্যেই ‘চলো দিল্লি রামলীলা মার্চ’-এর ডাক দিয়ে সাধারণ মানুষকে নির্ভয়ে এগিয়ে আসার বার্তা দিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, এটি কোনও একক দলের কর্মসূচি নয়, বরং দেশের সংবিধান ও গণতন্ত্রের আত্মাকে রক্ষার লড়াই। পাশাপাশি, সংসদীয় নিয়মে সিইসির বিরুদ্ধে আনা প্রস্তাব মুলতুবি থাকায় বিরোধী নেতৃত্ব সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে প্রতীকী ‘পাবলিক ইমপিচমেন্ট’ বা জনতার আদালতের প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
উল্লেখ্য, এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দিল্লিতে গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই প্রশাসনিক টানাপোড়েন চরমে পৌঁছেছে। সম্প্রতি যন্তরমন্তরে নির্বাচন কমিশন বিরোধী বিক্ষোভের সময় নেহা বোরা-সহ একাধিক নেতা-কর্মীকে দিল্লি পুলিশ আটক করে। সে সময় পুলিশের বিরুদ্ধে মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও লাঠিচার্জের অভিযোগ ওঠে। মুক্তির পর পুলিশের পক্ষ থেকে ভবিষ্যতে আন্দোলন থেকে বিরত থাকার শর্তে ‘পিস বন্ড’ সই করতে বলা হলে তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন নেহা বোরা। তাঁর সাফ যুক্তি ছিল, ভোটাধিকার হরণের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ন উপায়ে সোচ্চার হওয়া কোনওভাবেই শান্তিভঙ্গ নয়, বরং তা সংবিধানস্বীকৃত মৌলিক অধিকার। পরবর্তীতে বিক্ষোভস্থল নিয়ন্ত্রণ ও মেট্রো স্টেশন বন্ধ করার মতো সরকারি পদক্ষেপ নিয়ে জল গড়ায় সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত।
সব মিলিয়ে, ১ নভেম্বর রামলীলা ময়দানের এই মহা-সমাবেশ জাতীয় রাজনীতিতে এক বড়সড় সংঘাতের রূপ নিতে চলেছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি তাদের তৃণমূল স্তরের কর্মীদের রাজধানীতে হাজির করার জন্য বড় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। তার ওপর সিজেপি ও আইসার মতো সংগঠনের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ এই আন্দোলনকে বহুমুখী রূপ দিল। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা এবং ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা নিয়ে ওঠা এই প্রশ্নগুলির মুখে ১ নভেম্বরের সমাবেশ কেন্দ্রীয় সরকার ও নির্বাচন কমিশনের ওপর ব্যাপক রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করবে বলেই মনে করা হচ্ছে।
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
মন্তব্য করতে আপনার বাংলাস্ফিয়ার অ্যাকাউন্টে লগইন করুন। সদস্যতা কেনার প্রয়োজন নেই।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।