বিজেপি সরকার ক্ষমতা হারালেই ভারতের গণতন্ত্র এবং প্রতিষ্ঠানগুলির ক্ষত সঙ্গে সঙ্গে সেরে যাবে না। গত বারো বছরে দেশের সামাজিক বুনন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলির যে ক্ষতি হয়েছে, তা মেরামত করতে সময় এবং রাজনৈতিক দলগুলির সম্মিলিত পরিশ্রম লাগবে। আসন্ন আত্মস্মৃতি ‘বিলংগিং: আ জার্নি অব লাভ’ উপলক্ষে দেওয়া এক বিস্তৃত সাক্ষাৎকারে এই অভিমত জানিয়েছেন সোনিয়া গান্ধী। সাংবাদিক এন. রামের লিখিত প্রশ্নের উত্তরে ব্যক্তিগত স্মৃতি, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং সমকালীন ভারত সম্পর্কে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন তিনি।

৭ নভেম্বর প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে সোনিয়ার রাজনৈতিক বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলির অবস্থা। তাঁর অভিযোগ, বিজেপির শাসনে বিরোধীরা সমান সুযোগ নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা করতে পারছে না। বিশেষ করে নির্বাচন কমিশন-সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উপর শাসকের নিয়ন্ত্রণ, মূলধারার সংবাদমাধ্যমে প্রভাব, বিপুল অর্থবল এবং ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারকে তিনি এই অসম প্রতিযোগিতার কারণ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, কংগ্রেসের বর্তমান অবস্থার বিচার করতে হলে এই পরিস্থিতিও বিবেচনায় রাখতে হবে।

সোনিয়ার দাবি, সাম্প্রতিক মাসগুলিতে একাধিক নির্বাচন চুরি হওয়ার প্রমাণ সামনে এসেছে এবং মানুষ সে বিষয়ে আরও সচেতন হচ্ছেন। এটি তাঁর রাজনৈতিক অভিযোগ; সাক্ষাৎকারে এর সমর্থনে নির্দিষ্ট নির্বাচনের তথ্যপ্রমাণ আলাদা করে দেওয়া হয়নি। তবে কংগ্রেসের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি হতাশ নন। তাঁর বক্তব্য, নানা ধরনের নিপীড়ন সত্ত্বেও দলের কর্মীরা গ্রামে-জেলায় সংবিধানের মূল্যবোধের পক্ষে লড়ছেন। সমমনস্ক দলগুলির সঙ্গে সহযোগিতার ফলে বিরোধীদের সম্ভাবনাও বাড়ছে বলে তিনি মনে করেন।

তবে তাঁর আশাবাদের মধ্যে নিশ্চিত নির্বাচনী জয়ের ঘোষণা নেই। বরং বিরোধীদের সহযোগিতা, কর্মীদের প্রতিরোধ এবং মানুষের ক্রমবর্ধমান সচেতনতাকে ভবিষ্যতের ভিত্তি হিসেবে দেখছেন তিনি। দলীয় সাফল্য ফিরে পাওয়ার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলির স্বাভাবিক কার্যকারিতা ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনকেও তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন। এই পার্থক্যটি সাক্ষাৎকারের রাজনৈতিক তাৎপর্য বুঝতে সাহায্য করে: সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনার সঙ্গে গণতন্ত্র পুনর্গঠনের কঠিন দায়িত্বও তিনি জুড়ে দিয়েছেন।

রাজনীতিতে আপসের প্রশ্নে তাঁর উত্তর একই সঙ্গে স্বীকারোক্তিমূলক এবং দৃঢ়। বইয়ের শেষাংশে কিছু রাজনৈতিক সমঝোতা নিয়ে বিবেকের অস্বস্তির কথা লিখেছেন সোনিয়া। রাম সেই আপসের উদাহরণ চাইলে তিনি কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা দলের নাম করেননি। জানিয়েছেন, কখনও এমন শক্তির সঙ্গে হাত মেলাতে হয়েছে, যাদের সঙ্গে কংগ্রেসের আদর্শ মেলে না। সেই সিদ্ধান্ত তাঁর মনে স্বস্তি আনেনি। কিন্তু বিজেপি এবং আরএসএসের সঙ্গে কখনও আপস করেননি, ভবিষ্যতেও করবেন না, এই অবস্থান স্পষ্ট করেছেন।

ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়েও দলের ভিতরের মতপার্থক্য অস্বীকার করেননি তিনি। সোনিয়া স্বীকার করেছেন, কংগ্রেসের কেউ কেউ এই প্রশ্নে অতটা স্পষ্ট বিভাজন টানার পক্ষপাতী ছিলেন না। তবে সেটি দলের অবস্থান নয় বলে তাঁর দাবি। তাঁর ব্যাখ্যায়, ভয় ছাড়া নিজের ধর্ম পালন এবং বিশ্বাস অনুসরণের সাংবিধানিক অধিকারের পাশে কংগ্রেস ধারাবাহিকভাবে দাঁড়িয়েছে। ফলে সাক্ষাৎকারে ধর্মনিরপেক্ষতাকে তিনি নিছক নির্বাচনী কৌশল হিসেবে নয়, দলের মৌলিক রাজনৈতিক অঙ্গীকার হিসেবেই উপস্থাপন করেছেন।

নরেন্দ্র মোদীর উত্থান থেকে কংগ্রেস কী শিখতে পারে, সেই প্রশ্নেও সোনিয়ার জবাব সংক্ষিপ্ত। রাম বইয়ের একটি অংশ উল্লেখ করেন, যেখানে দিল্লির অভিজাত বৈঠকখানার সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামের দূরত্ব নিয়ে সোনিয়ার অস্বস্তি ধরা পড়েছে। মোদীর পিছিয়ে থাকা পরিবেশ থেকে ক্ষমতায় উঠে আসার কথাও সেখানে রয়েছে। উত্তরে সোনিয়া মনে করিয়ে দেন মনমোহন সিং এবং মল্লিকার্জুন খাড়্গের যাত্রাপথ। তাঁর বক্তব্য, রাজনীতিতে সাফল্যের একাধিক পথ আছে; আরএসএসের কাছ থেকে শেখার বিশেষ কিছু দেখছেন না তিনি।

বর্তমান শাসনের সমালোচনার পাশে সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে বিতর্কযোগ্য অংশ হয়ে উঠেছে ১৯৭৫–১৯৭৭ সালের জরুরি অবস্থা নিয়ে তাঁর মূল্যায়ন। রাম সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন: ওই অধ্যায়কে শুধু অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ ও বাড়াবাড়ি হিসেবে দেখা যথেষ্ট কি না; তাকে গণতন্ত্রবিরোধী ও কর্তৃত্ববাদী পর্ব বলা উচিত কি না। সোনিয়া স্বীকার করেছেন, তখন গণতান্ত্রিক অধিকার সংকুচিত হয়েছিল এবং হেবিয়াস কর্পাস স্থগিত হয়েছিল। কিন্তু তাঁর যুক্তি, সেই পদক্ষেপ সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই নেওয়া হয়েছিল।

সোনিয়ার বক্তব্য, জরুরি অবস্থার সময় কী ঘটছিল, তার প্রকৃত ভয়াবহতা তিনি বুঝেছিলেন সেই পর্ব শেষ হওয়ার পরে। পাশাপাশি ইন্দিরা গান্ধীর অবস্থান বোঝার চেষ্টা করতে গিয়ে তিনি হিংসাত্মক প্রতিবাদ, সরকারি দপ্তর ও গণপরিবহণে অগ্নিসংযোগ, সংগঠিত অস্থিরতা এবং আমলাতন্ত্র ও সশস্ত্র বাহিনীকে নির্দেশ অমান্য করার আহ্বানের প্রসঙ্গ তুলেছেন। তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, দ্রুত অবনতিশীল পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করছিলেন ইন্দিরা। এভাবে অধিকার হরণের কথা মেনেও তিনি সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক পটভূমির পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন।

জরুরি অবস্থার দায় শুধু সঞ্জয় গান্ধীর উপর চাপাতেও রাজি নন সোনিয়া। তাঁর মতে, ইন্দিরার কয়েকজন প্রবীণ সহকর্মীর চাপ ছিল, আর রাজীবের মতো ভিন্নমত জানানো মানুষ ছিলেন অল্প। শেষ পর্যন্ত ইন্দিরা নিজেই পরিস্থিতি উপলব্ধি করে সংশোধনের উদ্যোগ নেন বলে তাঁর দাবি। ১৯৭৭ সালের নির্বাচন ঘোষণা এবং পরে বাড়াবাড়ির জন্য প্রকাশ্যে অনুতাপ ও ক্ষমাপ্রার্থনার কথাও স্মরণ করিয়েছেন তিনি। অর্থাৎ রামের কঠোর ঐতিহাসিক মূল্যায়নকে সোনিয়া সরাসরি নিজের ভাষা হিসেবে গ্রহণ করেননি।

এই উত্তরের মধ্যে একটি টানাপড়েন লক্ষ করা যায়। বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে সোনিয়া প্রতিষ্ঠান দুর্বল করার অভিযোগ তুলছেন, অথচ জরুরি অবস্থার ক্ষেত্রে সাংবিধানিক পদ্ধতি এবং তৎকালীন সংকটের প্রসঙ্গ সামনে আনছেন। তাঁর স্বীকারোক্তি অধিকার সংকোচনের প্রশ্নটিকে মুছে দেয় না; আবার ইন্দিরার প্রতি ব্যক্তিগত শ্রদ্ধাও তিনি সরিয়ে রাখেননি। সাক্ষাৎকারটি তাই কেবল আত্মজীবনীর প্রচার নয়, নিজের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে ব্যাখ্যা করারও একটি সুযোগ হয়ে উঠেছে।

নিজের রাজনৈতিক জীবনের প্রসঙ্গে সবচেয়ে ব্যক্তিগত হয়ে উঠেছে ১৯৯৯ সালের অভিজ্ঞতা। শরদ পওয়ার, পি এ সাংমা এবং তারিক আনোয়ার তাঁর বিদেশি জন্ম নিয়ে প্রশ্ন তোলায় সোনিয়া আঘাত পেয়েছিলেন। যাঁদের সহকর্মী ভেবে বিশ্বাস করেছিলেন, তাঁরা তখনও তাঁকে বাইরের মানুষ হিসেবে দেখছেন, এই উপলব্ধিই ছিল যন্ত্রণার। কংগ্রেস সভাপতির পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন তিনি। পরে আত্মসমীক্ষা করে মনে হয়, ব্যক্তিগত অনুভূতির কারণে বৃহত্তর উদ্দেশ্য থেকে সরে দাঁড়ানো ঠিক হবে না। তাই দায়িত্ব চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

এই ঘটনার সঙ্গে ২০০৪ সালে প্রধানমন্ত্রিত্ব প্রত্যাখ্যানের সরল যোগ টানেননি সোনিয়া। তাঁর বক্তব্য, ১৯৯৯ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার চিন্তা তাঁর মনেই ছিল না। ২০০৪ সালের প্রসঙ্গে রাম বইয়ের বর্ণনা তুলে ধরেছেন: নির্বাচনের আগেই সোনিয়ার অনিচ্ছা ছিল, রাহুল ও প্রিয়াঙ্কাও দিদিমা এবং বাবার হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি থেকে আশঙ্কিত ছিলেন। দলীয় নেতাদের প্রবল চাপে একবার সম্মতির দিকে গেলেও শেষ পর্যন্ত তিনি সরে আসেন। প্রধানমন্ত্রী হন মনমোহন সিং।

তিনি প্রধানমন্ত্রী হলে সরকারের নীতি বা কংগ্রেসের কৌশল অন্য রকম হতো কি না, এমন ভাবনা কখনও এসেছে? সোনিয়ার উত্তর, আসেনি। মনমোহনের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতাকে তিনি সামগ্রিকভাবে ইতিবাচক বলেছেন। তাঁর ব্যাখ্যায়, দু’জন একটি দল হিসেবে কাজ করেছিলেন, কিন্তু দায়িত্ব ছিল পৃথক: মনমোহন সরকার পরিচালনা করতেন, তিনি দল। অতীতের সেই সিদ্ধান্তকে অনুশোচনা বা অপূর্ণ উচ্চাকাঙ্ক্ষার দৃষ্টিতে দেখার কোনও ইঙ্গিত দেননি তিনি।

রাজনীতির এই দীর্ঘ আলোচনার ভিতরেও বইটির কেন্দ্রীয় সুর ভালোবাসা ও আত্মীয়তার। সোনিয়া জানিয়েছেন, রাজীবের সঙ্গে প্রেম ধীরে ধীরে তাঁর পরিবার এবং ভারতের প্রতি গভীর টানে রূপান্তরিত হয়েছিল। একসময় সেই দেশকেই নিজের বলে অনুভব করেন। পরে যখন মনে হয়েছিল পরিবারের আত্মত্যাগের উদ্দেশ্য বিপন্ন হচ্ছে এবং কংগ্রেস দুর্বল হয়ে পড়ছে, তখন কিছু করার দায় অনুভব করেছিলেন। তাঁর বয়ানে, ব্যক্তিগত সম্পর্ক থেকে জনজীবনে প্রবেশের এই পথটি ছিল ধীর এবং অনিচ্ছাসত্ত্বেও গৃহীত।

রাজীব ও ইন্দিরার কাছ থেকে কী শিখেছেন, সেই প্রশ্নে সোনিয়া সাহস, সহমর্মিতা, ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ভারতের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং কর্তব্যবোধের কথা বলেছেন। তরুণী বধূ হিসেবে ভারতে এসে দেশটি সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানতেন না বলে জানিয়েছেন তিনি। তাঁদের কাছ থেকেই তাঁর শিক্ষা। অন্যদিকে ইতালির শৈশব থেকে পাওয়া পরিবার ও বন্ধুদের প্রতি আনুগত্য, আন্তরিকতা, অন্যের জন্য অনুভব এবং দায়িত্বশীলতার মূল্যবোধ এখনও নিজের মধ্যে অটুট রয়েছে বলে তাঁর বিশ্বাস।

নিজের জীবন লিখতে বসার অভিজ্ঞতাও সহজ ছিল না। সোনিয়া জানিয়েছেন, প্রথম কিছু লেখা শুরু করেছিলেন দশ বছরেরও বেশি আগে; গুরুত্ব দিয়ে লেখার কাজ শুরু প্রায় পাঁচ বছর আগে। কখনও স্মৃতি ও শব্দ সহজে এসেছে, কখনও কিছুই লিখতে না পেরে হতাশ হয়েছেন। তাঁর জীবন নিয়ে অন্তত পঁচাত্তরটি বই থাকার কথা রাম জানালে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। নিজের সম্পর্কে লেখা বই পড়ার আগ্রহ তাঁর ছিল না; রাজীবের সঙ্গে থাকতেই বুঝেছিলেন, সব লেখা অনুসরণ করা সম্ভব নয়।

সব শেষে এসেছে প্রকাশক বদলের বিতর্ক। ভারতে প্রথমে পেঙ্গুইন র‍্যান্ডম হাউসের বইটি প্রকাশ করার কথা থাকলেও এখন হার্পারকলিন্স ইন্ডিয়া ১০ নভেম্বর তা প্রকাশ করছে। সংবাদমাধ্যমের একাংশে প্রকাশক বদলের কারণ হিসেবে সম্পাদকীয় বদলের প্রশ্ন উঠেছিল। সোনিয়ার শিবির তা অস্বীকার করেছে। পেঙ্গুইন র‍্যান্ডম হাউস ইন্ডিয়াও জানিয়েছে, ভারতে তারা এই বইয়ের প্রকাশক নয় এবং লেখকের সম্পাদকীয় বদলে অসম্মতির কারণে সরে আসার খবর সঠিক নয়। বইটির আন্তর্জাতিক সংস্করণও একই দিন, ১০ নভেম্বর, প্রকাশিত হচ্ছে। মোদী, আরএসএস, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, সংখ্যালঘু এবং চিন-সংক্রান্ত অংশ নিয়ে মতবিরোধের সংবাদ উল্লেখ করে রাম জানতে চান, বিষয়টি কি লেখকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতারও প্রশ্ন? সোনিয়া সেই বিতর্কে জড়াতে চাননি। এই সংযত নীরবতার পাশেই রয়ে গেল তাঁর রাজনৈতিক প্রত্যয়: ভারতের মানুষ সুশাসনের প্রত্যাবর্তন চাইবেন, যদিও ক্ষতিগ্রস্ত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সারিয়ে তোলার কাজ হবে দীর্ঘ।