সুমন চট্টোপাধ‍্যায়: আমার নাম সনাতন। পুরো নাম সনাতন মাল।
সকালে ঘুম থেকে উঠে শুনলাম, আমরা রামরাজ্যে এসে গিয়েছি। অথচ রাত্রে শোওয়ার সময়ও পশ্চিমবঙ্গেই ছিলাম। এতগুলি মানুষকে, তাদের খাটবিছানা, হাঁড়িকুড়ি, বাতের ব্যথা এবং বকেয়া বিদ্যুৎ বিল সমেত এক রাত্তিরে অন্য রাজ্যে পৌঁছে দেওয়া সহজ কর্ম নয়। সরকারকে মনে মনে ধন্যবাদ দিলাম। বিশেষত আমার মতো গেঁতোকে, চৌকাঠ পেরোনোর কথা শুনলেই যার পেটের ভিতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে।

বাসি মুখে গিন্নিকে খবরটি দেওয়া মাত্র তিনি বললেন, ‘তা হলে আজ বাজারটা তুমিই করে আনো।’ স্ত্রী-জাতির এই একটি দোষ। ইতিহাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণেও তাঁরা আলু-পটলের বাইরে বেরোতে পারেননা। বললাম, ‘বুঝলে না, যুগ বদলে গিয়েছে।’ তিনি বাজারের থলেটি এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘বেশ তো। নতুন যুগে মুদির দোকানের পুরনো ধারটা বরং মিটিয়ে এসো।’

বেরিয়ে দেখি, গলির মুখের গর্তটি যথাস্থানে। গত বর্ষায় এখানে পড়ে আমার বাঁ পায়ের গোড়ালি মচকেছিল। আজ দেখে মায়াই হল। এত পরিবর্তনের মধ্যে পুরনো পরিচিত কিছু থাকা ভালো। পাশের দেওয়ালে অবশ্য নতুন রং, নতুন মুখ, নতুন প্রতিশ্রুতি। গর্তটির নিজের কোনও রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই বলে বোধ হয় তাকে বদলাতে হয়নি।

চায়ের দোকানে নিবারণদা বসেছিলেন। আমাদের পাড়ার হাওয়া-মোরগ, যে কোনও সরকারের অভিপ্রায় সরকারটির জন্মের আগেই বুঝতে পারেন। তাঁর নিজের কোনও দল নেই তবে কোনও দল সরকার গড়লে তার সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের আদর্শগত সম্পর্ক আবিষ্কৃত হয়। এমন দূরদর্শী মানুষকে সংবাদটি জিজ্ঞেস করতেই বললেন, ‘ঠিক শুনেছ। এবার ধর্ম প্রতিষ্ঠা হবে।’

‘তা হলে নর্দমাটা?’

নিবারণদা চশমা খুলে আমার দিকে তাকালেন। সেই দৃষ্টিতে করুণা ছিল। বললেন, ‘ এই জন্যই তোমাদের কিছু হয় না। একটা সভ্যতার পুনরুত্থান হচ্ছে, আর তুমি নর্দমা নিয়ে পড়ে আছ!’

আমার লজ্জা হল। সত্যিই তো। নর্দমা দিয়ে জল যাওয়ার কথা, সভ্যতা নয়। মুশকিল হলো সভ্যতাটি আমাদের বাড়িতে ঢুকতে গেলে ওই নর্দমার উপরকার ভাঙা স্ল্যাব পেরিয়েই ঢুকবে। কথাটা বলতে সাহস হল না।

আমাদের পরিবারে নানা রাজত্ব দেখার অভিজ্ঞতা আছে। ঠাকুর্দা বিধান রায়ের আমলে উদ্বাস্তু কলোনিতে ঘর বেঁধেছিলেন। তাঁর ধারণা ছিল, দেশ গড়া মানে ইট, কাঠ, হাসপাতাল, কারখানা, স্কুল এবং মাথার উপর এমন একটি ছাদ, যেটি বর্ষাকালে অন্তত দেশের স্বাধীনতার কথা স্মরণ করিয়ে কাঁদবে না। লোকটি পুরনো ধাঁচের ছিলেন। উন্নয়ন চোখে দেখতে চাইতেন।

আমাদের প্রজন্ম উন্নয়নের সঙ্গে ব্যাখ্যাও পেল। জ্যোতিবাবুর আমলে পাড়ার পার্টি অফিস থেকে জানা গেল, সমস্ত অসুবিধার একটি ঐতিহাসিক কারণ আছে। বুদ্ধবাবুর সময়ে কারখানা নিয়ে আবার তর্ক উঠল। কারখানা চাই কি না, কোথায় চাই, কার জমিতে চাই—চায়ের দোকানে আলোচনা এমন জমত যে চা ঠান্ডা হয়ে যেত। আমরা তখনও ভাবতাম, সরকারের কাজ নিয়ে আমাদের কিছু বলার আছে।

মমতার সময়ে পাড়ার সম্পর্কগুলি হঠাৎ আত্মীয়তামূলক হল। দিদি, দাদা, ভাই—সব মিলিয়ে বৃহৎ সংসার। সংসারে কে কোন ঘরের চাবি রাখবেন, তা নিয়ে অবশ্য বিবাদ ছিল। আমি বাইরের লোক বলে বারান্দাতেই দাঁড়াতাম। এবার শুনছি, সরাসরি রামরাজ্য। ভেবেছিলাম, আত্মীয়দের ধরাধরি করার কষ্ট অন্তত ঘুচবে। নিবারণদা বললেন, ‘সব কিছুর একটা পদ্ধতি আছে। আগে সদানন্দবাবুর সঙ্গে দেখা করো।’

সদানন্দবাবু আমাদের এলাকার পুরনো জনসেবক। আগে তাঁর টেবিলের পিছনে যে মনীষীর ছবি থাকত, এখন তার জায়গায় অন্য ছবি। টেবিলটি একই। মানুষটির এই স্থৈর্য আমাকে বরাবর মুগ্ধ করে। সরকার আসে যায় কিন্তু নাগরিকের কাছ থেকে দরখাস্ত নেওয়ার জন্য তিনি চেয়ার ছেড়ে ওঠেন না। সেবার এমন ব্রত আজকাল দেখা যায় না।গিয়ে দেখি, সদানন্দবাবুর কপালে তিলক, গলায় উত্তরীয়। ঘরের কোণে আগের রঙের কয়েকটি পতাকা ভাঁজ করা অবস্থায় পড়ে আছে। জিজ্ঞেস করতে বললেন, ‘ফেলে দেব কেন? কাপড়ের দাম জানেন?’ বুঝলাম, রাজনৈতিক মতাদর্শ সম্পর্কে তাঁর সঙ্গে আমার মতপার্থক্য থাকলেও সংসারধর্মে তিনি আমার স্ত্রীর দলের।
নর্দমার কথা শুনে তিনি বললেন, ‘হয়ে যাবে। আগে পাড়ায় একটা বিরাট অনুষ্ঠান করছি। আপনিও থাকবেন। আনন্দ করতে শিখুন।’
‘কীসের অনুষ্ঠান?’
‘রামরাজ্য প্রতিষ্ঠার।’
‘প্রতিষ্ঠা তো হয়েই গিয়েছে শুনলাম।’
‘হয়েছে বলেই তো অনুষ্ঠান!’

যুক্তিটি অকাট্য। নর্দমা হয়নি বলে তার অনুষ্ঠান হচ্ছে না। যেটা হয়েছে, সরকারি মনোযোগ আপাতত সেটিরই প্রাপ্য।

সদানন্দবাবুর কাছ থেকে বেরিয়ে বাজারে গেলাম। মাছওয়ালা হরিপদকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী হে, নতুন রাজ্যে ব্যবসা কেমন?’ সে বলল, ‘আগের মতোই। তবে আপনি মাছ নেবেন কি না আগে বলুন। রাজনীতি করলে মাছের গায়ে মাছি বসে।’

হরিপদ কোনও দিন রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়েনি। অথচ রাষ্ট্র এবং জীবিকার মধ্যে এমন পরিষ্কার সীমারেখা আমি শিক্ষিত লোকের মুখে কম শুনেছি। তাকে বললাম, ‘বাঙালির সংস্কৃতি রক্ষা করতে হবে তো।’ সে একটি ছোট রুই এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘এইটা নিয়ে যান। আপনার বাজেটের মধ্যে সংস্কৃতি এটুকুই হবে।’

আমার পিছনে দাঁড়িয়েছিলেন গফুর মিঞা। আমাদের পাড়ায় ছাতা সারান। বর্ষাকালে তাঁর দোকানে সমস্ত সম্প্রদায়ের ফুটো আকাশ মেরামত হয়। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘দাদা, আমাদের কিছু করতে হবে নাকি?’
বললাম, ‘কীসের জন্য?’
‘এই যে নতুন রাজ্য হল।’
বললাম, ‘তুমি তো এখানেই আছ।’
তিনি হাসলেন। হাসিটা কেমন মলিন, ছেঁড়া কাঁথার টুকরো যেন! আমিও আর বড় গলায় আশ্বাস দিতে পারলাম না। বাজারের ভিড়ে এই প্রথম বুঝলাম, একই ঘোষণায় কারও বুক ফুলতে পারে, কারও বুক ধড়ফড়।

বাড়ি ফিরে দেখি, ভাগ্নে এসেছে। তিন বছর ধরে চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তার প্রস্তুতির বয়স বাড়ছে, চাকরির বয়সসীমা কমছে। তাকে আশার কথা শোনালাম, ‘এবার নিশ্চয়ই কিছু হবে।’
সে বলল, ‘একটা মিছিলের জন্য লোক চাইছে। যাব ভাবছি।’
‘চাকরি?’
‘না। তবে যাঁরা চাকরির ব্যবস্থা করবেন, তাঁদের চোখে পড়া যাবে।’
ছেলেটি এত পড়াশোনা করেও শেষ পর্যন্ত দৃশ্যমান হওয়ার পরীক্ষায় বসতে চলেছে। মেধাতালিকা থেকে মিছিলের সামনের সারির দূরত্ব কত, আমি জানি না। নিবারণদা জানবেন। তিনি বহু দূরত্ব খুব অল্প সময়ে অতিক্রম করেছেন।

বিকেলে পাড়ার সভায় গেলাম। মঞ্চে লেখা, ‘ভয়মুক্ত সমাজ গড়ব।’ তার নীচে কয়েকজন দাঁড়িয়ে দেখছিলেন, কে কে সভায় আসেনি। আমার পাশের চেয়ারটি খালি দেখে একজন নাম জানতে চাইলেন। বললাম, ‘চেয়ারের?’ তিনি বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘যার বসার কথা, তার।’ বুঝলাম, ভয়মুক্তির আয়োজনটি বেশ যত্ন করেই হচ্ছে।

বক্তা বললেন, মা-বোনেদের সম্মান ফিরিয়ে দেওয়া হবে। পাশ থেকে মালতীদি বললেন, ‘বাসস্টপ থেকে আমাদের গলিটা অন্ধকার। দুটো আলো—’

তাঁকে শেষ করতে দেওয়া হল না। বক্তা তখন নারীশক্তির চিরন্তন মহিমায় প্রবেশ করেছেন। দুটো বাল্বের জন্য চিরন্তনকে থামানো শোভন নয়। মালতীদি চুপ করে গেলেন। সভা ভাঙলে তাঁকে অন্ধকার গলি পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে এলাম। তিনি বললেন, ‘সম্মানটা রাতে একটু দেখতে পেলে ভালো হত।’

পরদিন সদানন্দবাবুর লোক আমাদের বাড়িতে এলেন। হাতে একটি ফর্ম। পাড়ায় সুখশান্তি কতটা ফিরেছে তার হিসাব হচ্ছে। আমি বললাম, ‘এত তাড়াতাড়ি মাপা যাবে?’
তিনি বললেন, ‘মাপা হয়ে গিয়েছে। আপনাদের সইটা বাকি।’
ফর্মে দেখলাম, উন্নতি হয়েছে, বিশেষ উন্নতি হয়েছে, অভূতপূর্ব উন্নতি হয়েছে—তিনটি ঘর। বললাম, ‘উন্নতি হয়নি, এমন ঘর নেই?’
লোকটি অবাক হয়ে বললেন, ‘তা হলে উন্নতির ফর্মে সই করবেন কেন?’
আমি কলম নামিয়ে রাখলাম। তিনি চলে যাওয়ার আগে নরম গলায় বলে গেলেন, ‘আপনাকে কিন্তু আমরা অন্য রকম মানুষ জানতাম।’
এই কথাটির সঙ্গে আমার বহু দিনের পরিচয়। কোনও বিষয়ে রাজি না হলেই আমাকে অন্য রকম মানুষ বলে জানা হয়। এত সরকার পেরিয়েও আমার সঠিক পরিচয়টি প্রতিষ্ঠিত হল না।
দুপুরে নিবারণদাকে ঘটনাটি বললাম। তিনি বললেন, ‘সরকারের বিরুদ্ধে বলছ, লোকে কিন্তু অন্য অর্থ করবে।’
‘কী অর্থ?’
‘রামের নামে রাজ্য চলছে। একটু ভেবেচিন্তে কথা বলা উচিত।’
ব্যাপারটা বুঝতে আমার সময় লাগল। ভোটটি দিয়েছিলাম মানুষকে। পাঁচ বছর পরে হিসাব নেব বলেই দিয়েছিলাম। এখন হিসাবের খাতা খুলতে গেলে ঠাকুরঘরে জুতো পরে ঢোকার অপরাধ হবে! সদানন্দবাবুর নর্দমা পরিষ্কার না করার সঙ্গে রামচন্দ্রের সম্পর্কটি ঠিক কোথায়, সেটা আর জিজ্ঞেস করলাম না।

আগের আমলগুলিতে খুব সাহস দেখিয়েছি, এমন দাবিও করি না। অন্যের দোকান ভাঙলে ভেবেছি, আমারটা তো আস্ত আছে। অন্যের ছেলে কাজ না পেলে বলেছি, নিশ্চয়ই কোথাও খামতি ছিল। সরকার আমাকে যতবার প্রজা বানাতে চেয়েছে, আমি ততবার নাগরিকত্বের কাগজটি সাবধানে আলমারিতে তুলে রেখেছি। এখন আলমারি খুলতে গিয়ে দেখি, চাবি খুঁজে পাচ্ছি না।

সেদিন রাতে পাশের বাড়ির বিশুর মায়ের অসুখ বাড়ল। হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। পাড়ার নতুন কমিটির ফোন ব্যস্ত, প্রতিষ্ঠা-অনুষ্ঠানের আলোচনা চলছে বোধহয়। গফুর মিঞা দোকান বন্ধ করে এলেন, হরিপদ একটা গাড়ির ব্যবস্থা করল, ভাগ্নে তার পরীক্ষার ফি থেকে কিছু টাকা বার করল। মালতীদি গেলেন সঙ্গে। কারও কাছে কারও আনুগত্যের শংসাপত্র চাওয়া হল না।

হাসপাতালের বারান্দায় বসে মনে হল, রামরাজ্যের যে সামান্য অর্থ ছেলেবেলায় ঠাকুমার কাছে শুনেছিলাম, তার কিছুটা বোধ হয় এই লোকগুলির মধ্যে আছে। এরা কেউ রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে জানে না। বিপদে পড়া মানুষ দেখলে পাশে দাঁড়ায়। সেই জন্য এদের নিয়ে তোরণ হয় না; তোরণের নীচ দিয়ে এরা স্ট্রেচার ঠেলে যায়।
ভোরে বাড়ি ফেরার পথে নিবারণদার সঙ্গে দেখা। তিনি বললেন, ‘কী হে, এখনও মুখে হাসি নেই কেন? এত বড় পরিবর্তন!’
বললাম, ‘হাসব। আগে বিশুর মা একটু সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরুন।’
তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। আমার মতো লোক নিয়ে সভ্যতা গড়া যে শক্ত, বুঝতে পারছিলাম। আমাদের সুখের ধারণাটা বড় খুচরো। হাসপাতালে শয্যা, স্কুলে শিক্ষক, ছেলের কাজ, মেয়ের নিরাপদে বাড়ি ফেরা। মহাকাব্যের মধ্যে বারবার সংসারের বাজারের ফর্দ ঢুকিয়ে দিই।
বাড়িতে স্ত্রী চা দিলেন। তাঁকে বললাম, ‘আমাদেরই বোধ হয় দোষ। রাজ্য বদলে গেল, আমরা বদলাতে পারলাম না। এখনও সেই জল, রাস্তা, চাকরি নিয়ে পড়ে আছি।’
তিনি বললেন, ‘যাঁরা রাজ্য চালান, তাঁরা কী বলছেন?’
‘বলছেন, এ রামরাজ্য। একটু বিশ্বাস রাখতে হবে।’
স্ত্রী কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তার পর বললেন, ‘তা হলে রামকে একবার খবর দাও।’
‘কেন?’
‘বাড়িওয়ালার জানা দরকার। ভাড়াটেরা তাঁর নাম করে বড় উৎপাত করছে।’