সুমন চট্টোপাধ্যায়: আজ আমার ঊনসত্তরতম জন্মদিন। সকালটি আলাদা বলে মনে হচ্ছে না। জানলার বাইরে দিনের আলো, ঘরের ভিতরে পরিচিত জিনিসপত্র, কিছু কাজ পড়ে আছে, কিছু কাজ আজও করা হবে না। তারিখটা না জানলে বোঝার উপায় ছিলনা যে আজকের দিনটির সঙ্গে আমার কোনও ব্যক্তিগত সম্পর্ক আছে। একসময় যে দিনটির জন্য অপেক্ষা করতাম এখন সেটি এসে পড়লে খানিক অপ্রস্তুত হই। মনে আনন্দ নেই। অথচ চারপাশে এমন একটি ধারণা চালু আছে যে জন্মদিনে আনন্দিত হওয়া চাই-ই চাই। নিজের জন্মের তারিখেও তাই কখনও মনে হয়, প্রত্যাশিত অনুভূতিটুকুর ছোঁয়া পাচ্ছিনা তো!
ছেলেবেলায় জন্মদিন আসত অনেক দূর থেকে। আসার আগে তার আভাস পাওয়া যেত, দিন গোনা যেত। বড় হয়ে ওঠার একটা আকাঙ্ক্ষা ছিল। আরও এক বছর বয়স হওয়া মানে পৃথিবীর নতুন কয়েকটি দরজা আমার জন্য খুলবে। কত কিছু তখনও দেখা হয়নি, কত মানুষের সঙ্গে পরিচয় বাকি। ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নির্দিষ্ট কোনও ধারণা ছিল না বলেই হয়তো তার উপর এত আস্থা ছিল। তখন বয়স বাড়ত নিজের গুরুত্ব বাড়ার মতো করে। মনে হতো, একটু একটু করে আমাকে স্বীকার করে নিচ্ছে পৃথিবী।
ঊনসত্তরে এসে সেই অপেক্ষার ধরন বদলেছে। আগামী বছর কোথায় পৌঁছব, তার চেয়ে বেশি ভাবি, আগামী বছর কাদের পাব। বয়সের হিসেব এখন নিজের শরীরে যতটা লেখা থাকে ততটাই থাকে পরিচিত মানুষদের খোঁজখবরে। কার অসুখ বেড়েছে, কে বাড়ি থেকে বেরোতে পারে না, কার সঙ্গে অনেক দিন কথা হয়নি। যে সময় একদিন সম্ভাবনায় ভরা মনে হতো, তার মধ্যে এখন অনিশ্চয়তার ভাগ বেশি। জন্মদিন সেই অনিশ্চয়তাকে সামান্য স্পষ্ট করে দেয়। অন্য দিন কাজের আড়ালে যেটুকু এড়িয়ে থাকা যায়, আজ তার সামনে বসতে হয়।
দু’দিন আগে ছেলেবেলার এক বন্ধুকে ফোন করেছিলাম। আমার প্রাচীনতম বন্ধু। কোনও বিশেষ খবর দেওয়ার ছিল না। পরামর্শের প্রয়োজন ছিল না, কোথাও যাওয়ার পরিকল্পনাও নয়।তাকে বুঝতে না দিয়ে কেবল তার গলার স্বর শুনতে চেয়েছিলাম। আশ্বস্ত হতে চেয়েছিলাম যে সে এখনও বেঁচে আছে। কথাটা লিখতে গিয়ে থামতে হচ্ছে। একদিন যে মানুষটিকে ফোন করার জন্য বিষয় খুঁজতে হতো না, আজ তাকে ফোন করার প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে তার অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিন্ত হওয়া। সম্পর্কের এই পরিবর্তন কেউ আমাদের শেখায়নি। বয়সের সঙ্গে অজান্তে শিখে ফেলেছি।
ফোন ধরার আগে অপেক্ষার সময়টুকুও এখন অন্য রকম। উত্তর পেতে দেরি হলে প্রথমেই ব্যস্ততার কথা মনে আসে না। নিজের মনকে তখন বোঝাতে হয়, মানুষ স্নান করে, ঘুমোয়, ফোন অন্য ঘরে রেখে যায়। পৃথিবীতে এখনও অনেক সাধারণ কারণে একটি ফোন ধরা হয় না। এই সহজ সত্যটুকু মনে করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন হচ্ছে কারণ গত কয়েক বছরে দুঃসংবাদের সুনামির সামনে আমাকে দাঁড়াতে হয়েছে। অভিজ্ঞতা আমাকে সব সময় বিচক্ষণ করেনি। কখনও কেবল ভয় পেতে শিখিয়েছে, সামান্য নীরবতার ভিতরেও আশঙ্কার কারণ খুঁজতে শিখিয়েছে।
বন্ধুর গলা শোনার মধ্যে সেদিন যে স্বস্তি ছিল তার কথা হয়তো তাকে ঠিক বোঝাতে পারিনি। আমাদের বয়সে অনেক প্রয়োজনই কথার বাইরে থেকে যায়। শরীরের খবর নিই, দৈনন্দিন দুটো কথা বলি, অথচ ফোন করার আসল কারণটি বলা হয় না। বলা কঠিন যে, তোকে হারানোর ভয় হচ্ছিল। আরও কঠিন বলা, তোর সঙ্গে আমার ছেলেবেলার যে অংশটুকু আছে, সেটুকুও হারাতে ভয় হয়। একজন পুরনো বন্ধু এমন অনেক কথা জানে যেগুলি তাকে আবার প্রথম থেকে বুঝিয়ে বলতে হয় না। সেই অনায়াস পরিচয়েরও বয়স হয়েছে।
এখন যারা আমাকে চেনে, তারা আমার বর্তমানটুকুই বেশি জানে। পুরনো বন্ধুর কাছে আমি তার আগের মানুষটিও। আজ যে কথায় সহজে আহত হই একসময় তা নিয়ে হাসতে পারতাম কি না, আমার কোন স্বপ্নটি আমাকে সবচেয়ে বেশি তাড়িত করত, কোন ব্যর্থতাকে পৃথিবীর শেষ বলে মনে হয়েছিল, সে হয়তো জানে। তার স্মৃতিতে আমার এমন একটি চেহারা আছে যা আয়নায় আর দেখা যায় না। তাই পুরনো কাউকে হারালে নিজেরও কিছু ইতিহাস অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। মনে হয়, ঘটনাটি ঘটেছিল বটে কিন্তু আমার সঙ্গে তা মনে রাখার মানুষটি আর নেই।
গত কয়েক বছরে এত স্বজন, এত বন্ধুকে হারিয়েছি যে অনুপস্থিতিকে আর ব্যতিক্রম বলে মনে হয়না। তবু অভ্যাস হয়ে গিয়েছে বলাও অসত্য। প্রতিটি মৃত্যুর পরে নতুন করে শিখতে হয়, এই মানুষটির কাছে আর কোনও খবর পৌঁছবে না। কোনও ঘটনা ঘটলে তাকে বলার ইচ্ছেটা কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে মরে না। মাঝেমধ্যে আগের অভ্যাসে মনে হয় কথাটা তাকে জানাতে হবে। তার পরেই মনে পড়ে। সেই দ্বিতীয়বার মনে পড়ার মুহূর্তটি খুব একা করে দেয়। প্রথম দুঃসংবাদের সময় হয়তো পাশে লোক ছিল। পরে এই ছোট ছোট উপলব্ধির সময় কেউ থাকে না।
জীবনে এই প্রথম বেঁচে থাকার জন্যই লজ্জাবোধ হচ্ছে। কথাটির মধ্যে যুক্তি নেই, জানি। কারও মৃত্যুতে আমার দায় নেই, আমার আয়ুর কোনও অংশ কেড়ে নিয়ে কাউকে চলে যেতে হয়নি। তবু অনুভূতি যুক্তির হিসেব মানে না। এতগুলি মানুষ নেই অথচ আমি এখনও সকালের চা খাচ্ছি, খবর পড়ে বিরক্ত হচ্ছি, আগামী সপ্তাহের কোনও কাজ মনে রাখছি। এই অত্যন্ত সাধারণ বেঁচে থাকাটুকুও কখনও অসঙ্গত লাগে। যেন একসঙ্গে শুরু করা কথার মাঝখান থেকে অন্যরা উঠে গিয়েছে, আর আমি নিজের কথাটির জাবর কেটেই চলেছি।
এই লজ্জার সঙ্গে মৃতদের প্রতি ভালবাসা মিশে আছে, আছে নিজের অসহায়তাও। যাদের ধরে রাখতে পারিনি, তাদের জন্য এখন কী করতে পারি? মনে রাখি। কিন্তু মনে রাখার মধ্যেও বিরতি পড়ে। কাজের সময় ভুলে থাকি, অন্য কথায় মন চলে যায়, কখনও হাসিও পায়। তারপরে অকারণে অপরাধী লাগে। অথচ আমার কষ্টের পরিমাণ দিয়ে তাদের প্রতি ভালবাসার পরিমাণ মাপা চলেনা। সারাক্ষণ শোক করতে না পারার মধ্যে কোনও বিশ্বাসঘাতকতা নেই। কথাটি বুঝি, নিজের ক্ষেত্রে মেনে নিতে সময় লাগে।
শোকের সবচেয়ে কঠিন দিকগুলির একটি এই যে, তার পাশ দিয়েই দৈনন্দিন জীবন চলতে থাকে। বাজারের জিনিস ফুরোয়, একটি বিল মেটাতে হয়, ভাঙা জিনিস সারানোর লোককে ফোন করতে হয়। যেদিন মনে হয় পৃথিবীর সব কাজ থেমে যাওয়া উচিত সেদিনও একটি দরকারি কাজ বাকি থেকে যায়। প্রথম দিকে এই ধারাবাহিকতা নিষ্ঠুর লাগে। পরে বুঝি, এইসব সামান্য প্রয়োজনের ভিতর দিয়েই দিন পার করি। সব সময় কোনও বড় অর্থ খুঁজে পাই না। তবু সন্ধ্যা হয়, খাওয়ার সময় হয়, রাতের জন্য দরজা বন্ধ করতে হয়।
জন্মদিনে অনুপস্থিতিগুলি একটু বেশি বোঝা যায়। কেউ কেউ এই তারিখটি মনে রাখত বলে দিনটির মূল্য ছিল। তাদের শুভেচ্ছার ভাষা হয়তো প্রতি বছর একই থাকত, তবু তার জন্য অপেক্ষা করতাম। এখন তারিখ আছে, অপেক্ষার অভ্যাসও পুরো যায়নি। শুধু কয়েকটি ফোন আর আসবে না। নতুন শুভেচ্ছা আসে, ভাল লাগে, কৃতজ্ঞ হই। কিন্তু একজনের স্নেহ দিয়ে অন্যজনের অভাব পূরণ হয় না। যারা আজ পাশে আছে, তাদের প্রতি কোনও অভিযোগ ছাড়াও যারা নেই তাদের জন্য মন খারাপ থাকতে পারে। এই দুই অনুভূতি একই মানুষের ভিতরে জায়গা নেয়।
আনন্দ না হওয়ার কারণ তাই শুধু বয়স নয়। জন্মদিনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা পৃথিবীটিও বদলে গিয়েছে। যে জগতে জম্মেছিলাম তার অবিশ্বাস্য, কুৎসিত, ভয়াবহ রূপান্তর দেখে জন্ম-মৃত্যুর মধ্যে কোনটি বেশি আকাঙ্খিত, গুলিয়ে যায়।যাদের সামনে আমার জন্মের দিনটি বিশেষ হয়ে উঠত, তাদের অনেকে নেই। নিজের গুরুত্ব নিয়ে আগের বিশ্বাসও কমেছে। এখন জানি, আমার একটি বছর বাড়লে পৃথিবীর বিশেষ কিছু আসে যায় না। এই বোধে অপমান নেই, খানিক স্বস্তিও আছে। প্রতিটি দিনকে উল্লেখযোগ্য করে তোলার দায় থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। জন্মদিনটিকে সাধারণ থাকতে দিলে হয়তো নিজের মনের উপর অপ্রয়োজনীয় দাবিটুকুও কমে।
তবু আজ নিজের বেঁচে থাকাকে অস্বীকার করতে চাই না। আনন্দ না থাকলে তার অভিনয় করব না, আবার আনন্দহীনতাকেই জীবনের শেষ সত্য বলে স্থির করব না। এখনও কারও গলা শুনতে ইচ্ছে করে। কোনও খবর পড়ে কাউকে বলতে ইচ্ছে করে। এই ইচ্ছেগুলি আছে বলেই ফোন তুলি। মৃতদের অভাব আমার সঙ্গে থাকবে। জীবিতদের প্রতি মনোযোগও যতটা পারি রাখব। তার জন্য উৎসবের মেজাজ দরকার হয় না। অনেক সময় শুধু একটু অবসর লাগে, একটি নম্বর খুঁজে নেওয়া লাগে, কথা শোনার ধৈর্য লাগে। হয়তো কোনও পুরনো মানুষ আমার গলা শুনেও এমনই নিশ্চিন্ত হয়। তার কাছেও আমার জীবিত থাকার কিছু অর্থ আছে। নিজের বিষণ্ণতায় কখনও সে কথাটি ভুলে যাই।
আজ ঊনসত্তরতম জন্মদিনে কোনও বড় উপলব্ধির দাবি নেই। এতটা বয়স হলেই জীবন বোঝা হয়ে যায়, এমন অভিজ্ঞতা আমার হয়নি। বরং যাদের অনেক দিন পাইনি, তাদের কথা বেশি মনে পড়ছে। আর মনে পড়ছে দু’দিন আগের সেই ফোন। বন্ধুর স্বর শুনে যে স্বস্তি পেয়েছিলাম, তাকে আনন্দ বলব কি না জানি না। নাম দেওয়ার প্রয়োজনও নেই। মানুষটি আছে, আমার কথা শুনছে, আমিও তার কথা শুনতে পারছি। আপাতত এইটুকু নিশ্চিত হতে পেরেছিলাম। আজকের দিনে এইটুকুর মূল্য বুঝতে পারছি।
ওপারে একটি গলার স্বর
ঊনসত্তরতম জন্মদিনে আনন্দের পরিবর্তে হারিয়ে যাওয়া স্বজন, পুরনো বন্ধুত্ব এবং জীবনের অনিশ্চয়তার কথা ফিরে দেখলেন সুমন চট্টোপাধ্যায়।