‘ওয়ান পিস’-এর লুফি, ‘স্টার ওয়ার্স’-এর ডার্থ ভেডার, ব্যাটম্যান কিংবা হাওয়া ভরা বিশাল ব্যাঙ! সঙ্গে মিম, অদ্ভুত মুখোশ আর ইন্টারনেটে ভাইরাল হওয়া সব স্লোগান। ফ্রান্সের রাজপথে জেন জেডের প্রতিবাদের চেহারা এমনই রঙিন। কিন্তু এই হাসিঠাট্টার আড়ালে রয়েছে স্কুলের দুরবস্থা, পুলিশের হিংসা এবং রাজনৈতিক ক্ষোভ। অনলাইন সংস্কৃতিকে হাতিয়ার করে নিজেদের দাবিদাওয়া তুলে ধরছেন তরুণেরা। মজার ছলে তৈরি করছেন সংহতি, গড়ে তুলছেন নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয়ও।

প্যারিসের বুলভার দ্যু মঁপারনাসের একটি সাজসরঞ্জামের দোকান থেকে বেরিয়ে এলেন ব্যাটম্যান, একটি গ্রেমলিন এবং ভৌতিক ছবির দুই ভয় ধরানো চরিত্র—দুষ্টু পুতুল চাকি ও খুনি জিগস। তার পর মিশে গেলেন স্কুল-কলেজের পড়ুয়াদের ভিড়ে। মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ছাত্র আন্দোলনের পঞ্চম দফার বিক্ষোভে এ ভাবেই হাজির হয়েছিলেন তাঁরা।

“আমাদের সত্যিকারের দাবি আছে। নিজেদের কথা পৌঁছে দিতে আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। কিন্তু রাগারাগি করে লাভ কী? তার চেয়ে হাসিমুখেই কাজটা করা যাক।” কথাগুলি বলছিল সেরজি শহরের চার পড়ুয়া—ইয়ানিস, আরন, হিচাম ও আদাম। বয়স ১৭ থেকে ১৮। প্লাস্টিকের মুখোশের আড়াল থেকেই তারা শুনিয়ে দিল স্কুলের সমস্যার কথা—এক-একটি ক্লাসে ৩৬ জন পড়ুয়া, ভাঙা শৌচাগার এবং কিছু ভবনে অ্যাসবেস্টসের উপস্থিতি।

ইতিহাসবিদ ভেরোনিক সেরভার মতে, প্রতিবাদের এই ধরন নিছক মজা নয়। ‘সিয়ামো তুত্তি আন্তিফাশিস্তি: নিপীড়নের বিরুদ্ধে গান’ বইটির অন্যতম লেখক সেরভ বললেন, “জনপ্রিয় সংস্কৃতির নানা প্রতীক ক্রমশ রাজনৈতিক ও আন্দোলনের সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। মজা, উৎসব আর আপাতনিরীহ চেহারার আড়ালে এগুলি মিছিলে নতুন প্রাণ ও আনন্দ নিয়ে আসে। আর সবাই যখন আনন্দ করছে, তখন আরও বেশি মানুষের যোগ দিতে ইচ্ছে হয়।”

প্রতিবাদে ব্যাঙ, লুফিও!

প্যারিসের প্লাস দিতালির কাছে প্রায় দু’মিটার উঁচু, হাওয়া ভরা ব্যাঙের পোশাক পরে লাফিয়ে বেড়াচ্ছিলেন নঁতেরের এক মঞ্চকলার ছাত্র। নিজের নাম বললেন জঁ বোনো—ফরাসি ভাষায় শুয়োরের পায়ের মাংসের একটি পদের নামের সঙ্গে মেলে তাঁর নাম। নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে মজার ছলে বললেন, “লাফিয়ে বেড়ানো অবয়বের মধ্যে একটা শূকরসুলভ স্বভাব।”

“দারুণ ব্যাঙ! একটা ছবি তুলতে পারি?”—বিক্ষোভকারীদের এই ডাক শুনে বেশ খুশিই হলেন তিনি। বললেন, “সবে এসে পৌঁছেছি। মনে হচ্ছে, আমাকে দেখে সবাই খুশি।”

তাঁর অনুপ্রেরণা আমেরিকার পোর্টল্যান্ডের এক ফ্যাসিবাদবিরোধী কর্মী, যিনি এক বছর আগে পুলিশের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে একই ধরনের পোশাক পরে পরিচিতি পেয়েছিলেন। সেরভার কথায়, রসিকতা কখনওই পুরোপুরি নিরপেক্ষ নয়। বরং তা প্রতিবাদকে ইতিহাস ও রাজনীতির বিভিন্ন ধারার সঙ্গে জুড়ে দেয়।

জনপ্রিয় সংস্কৃতির এমন প্রতীক এমন তরুণদেরও কাছাকাছি নিয়ে আসে, যাঁরা সাধারণত পরস্পরের সঙ্গে মেলামেশা করেন না। তারই উদাহরণ অ্যালেক্স। প্যারিসের সপ্তদশ প্রশাসনিক এলাকার বাসিন্দা, ১৮ বছরের এই তরুণ রান্নার বৃত্তিমূলক ডিগ্রি শেষ করছেন। মিছিলে তাঁর মাথায় ছিল জাপানি মাঙ্গা ‘ওয়ান পিস’-এর প্রধান চরিত্র মাঙ্কি ডি লুফির বিখ্যাত খড়ের টুপি। জলদস্যু লুফির লক্ষ্য স্বাধীনতা।

অ্যালেক্সের কথায়, “এটা নেপাল আর মাদাগাস্কারের বিক্ষোভকারীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো। তাঁরাও ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে নিজেদের প্রতিবাদে লুফিকে এনেছিলেন। ব্যাপারটা মজার, আর সবাই ইঙ্গিতটা বুঝতে পারে।”

সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তরের ছাত্রী লিসাও সেজেছিলেন লুফি—খড়ের টুপি, লাল হাতকাটা জামা আর নীল হাফপ্যান্টে। দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণকারী পুলিশের সারির সামনে ছবি তোলার সময় তুলে ধরলেন একটি কেফিয়েহ। প্যালেস্তাইনের প্রতি সংহতির প্রতীক এই পোশাকের অনুষঙ্গ তাঁর সাজে নতুন রাজনৈতিক মাত্রা যোগ করেছিল।

লিসার বক্তব্য, “আমি যা বিশ্বাস করি, যার পক্ষে দাঁড়াই, সেটাই তুলে ধরছি। তার মধ্যে প্যালেস্তাইনও আছে। সবার চেনা একটি অনুষঙ্গের মধ্য দিয়ে প্রত্যেকে নিজের দাবিটাও প্রকাশ করতে পারেন।”

মিম যখন রাজনৈতিক অস্ত্র

প্যারিসের পোর-রোয়ালে বিক্ষোভকারীরা ছন্দে হাততালি দিতে দিতে স্লোগান তুলছিলেন, “টেস্টি ক্রাউস্টি আন্তিফাশিস্তি।” ইতালীয় ফ্যাসিবাদবিরোধী স্লোগান ‘সিয়ামো তুত্তি আন্তিফাশিস্তি’—অর্থাৎ ‘আমরা সবাই ফ্যাসিবাদবিরোধী’—এর সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে ফাস্ট ফুডের একটি নাম।

শুনতে নিছক হাস্যকর মনে হলেও এর পিছনে রয়েছে সামাজিক বিদ্রুপ। ইতিহাসবিদ সেরভার মতে, শ্রমজীবী এলাকার তরুণদের নিয়ে প্রচলিত বাঁধাধরা ধারণাগুলিকেই উল্টে দিচ্ছে এই স্লোগান। ‘টেস্টি ক্রাউস্টি’ বলতে জাঙ্ক ফুডের কথা বোঝানো হচ্ছে। এর সঙ্গে জুড়ে রয়েছে শহরতলির পরিচয়—যে এলাকাগুলিকে প্রায়ই অভিবাসীদের বসতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

সেরভার ব্যাখ্যা, “যে পরিচয় দিয়ে তাঁদের কলঙ্কিত করা হয়, সেটাকেই তাঁরা উল্টে দিতে পারেন। তাকে এমন কিছুতে বদলে দেন, যা একই সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী এবং ভীষণ মজার।”

আর একটি স্লোগানও ছড়িয়ে পড়েছে—“বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র।” আরবি ‘বিসমিল্লাহ’র অর্থ ‘ঈশ্বরের নামে’; ফরাসি অংশটির অর্থ ‘এ তো অন্ধকার’। অভিযোগ, স্কুলপড়ুয়াদের পরিচয় দিয়ে পুলিশকর্মীরাই স্ন্যাপচ্যাটে এমন কিছু বার্তা লিখেছিলেন। সেই ঘটনাকে ঘিরেই স্লোগানটির জন্ম।

প্যারিস সিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসির চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী মারওয়া—যাঁর নাম বদলে দেওয়া হয়েছে—নিজের প্ল্যাকার্ডে এই কথাই লিখেছিলেন। তাঁর অভিযোগ, “স্কুলপড়ুয়াদের সম্পর্কে পুলিশ কিছুই বোঝে না—ওরা নির্বোধ ও বর্ণবিদ্বেষী।”

পুলিশের হিংসার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতেই এই স্লোগান বেছে নিয়েছেন তিনি। গত ৫ অক্টোবর লঁস শহরে স্কুলের কাছে বিক্ষোভের সময় পুলিশের গ্রেনেডে ১৫ বছরের ইভান হাত হারায়। তার আগে, ২৮ সেপ্টেম্বর কাঁদানে গ্যাসের গ্রেনেড ছোড়ার অস্ত্রের আঘাতে চোয়াল ভেঙে যায় ১৪ বছরের ইডেনের।

মারওয়ার কথায়, “আনন্দের চেয়ে রাগই বেশি হচ্ছে আমার। কিন্তু ওদের নিয়ে বিদ্রুপ করা ছাড়া আমরা আর কী-ই বা করতে পারি?”

ডার্থ ভেডারের ‘ভাইপো’ পুলিশ!

প্যারিসের বিংশ প্রশাসনিক এলাকার এলেন-বুশে স্কুলের একাদশ শ্রেণির ছাত্র মাতিয়ু মিছিলে এসেছিল ‘স্টার ওয়ার্স’-এর খলনায়ক ডার্থ ভেডারের সাজে। তারও নাম বদলে দেওয়া হয়েছে।

মাতিয়ুর যুক্তি, “আমরা সাধারণত দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণকারী পুলিশকে ‘স্টর্মট্রুপার’ বলি। ওরা তো ডার্থ ভেডারের অধীনে থাকা সৈন্য। তাই হিসাবমতো ওরা আমার ভাইপো। আর যেহেতু কথা শুনছে না, তাই ওদের শান্ত করতে এসেছি।”

অক্টোবরে পুলিশের একটি সারির সামনে আয়োজিত ‘অরা ব্যাটল’-এও অংশ নিয়েছিল সে। এই প্রতিযোগিতায় গোল করে দাঁড়ানো মানুষের মাঝখানে নজরকাড়া ভঙ্গি করে নিজের ব্যক্তিত্বের দাপট দেখাতে হয়। মাতিয়ুর দাবি, সেখানেও সে জিতেছিল। পুলিশ তাদের ‘শেষ সতর্কবার্তা’ দিলেও তার পর আর তেড়ে আসেনি।

এই ধরনের অনলাইন প্রবণতা, সাংকেতিক ভাষা ও রসিকতা এখন পর্দার গণ্ডি পেরিয়ে ঢুকে পড়েছে রাজপথে। ইন্টারনেটে জনপ্রিয় ‘সিক্স-সেভেন’ অঙ্গভঙ্গি থেকে শুরু করে নানা ভাইরাল মিম—সবই জায়গা করে নিচ্ছে বিক্ষোভের প্ল্যাকার্ডে। একটি প্ল্যাকার্ডে লেখা, “জেনারেশন ৬৭ আবার ঘটাচ্ছে মে ৬৮।” ফ্রান্সের ইতিহাসে ১৯৬৮ সালের ছাত্র ও শ্রমিক আন্দোলনের প্রতি স্পষ্ট ইঙ্গিত এই স্লোগানে।

রাজপথে দেখা গিয়েছে পা-ওয়ালা হাওয়া ভরা হাঙরও। তাদের চেহারায় রয়েছে ২০১৫ সালের একটি মিম এবং ২০২৫ সালে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্মিত উদ্ভট প্রাণীদের জগৎ ‘ইতালিয়ান ব্রেনরট’-এর ছাপ।

সংগীতও এই আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সংগীতশিল্পী নোডের ‘নো টাইটেল’ গানটি এখন ছাত্রদের অবরোধের অন্যতম প্রধান গান। গানটি এসেছে ইউটিউবার সিপ্রিয়াঁর ২০১৫ সালের একটি ভিডিও থেকে। ফ্রান্সের জেন জেডের কাছে সিপ্রিয়াঁ পরিচিত মুখ।

নাচের ছন্দে প্রতিবাদের জোর

প্রতিবাদকে উৎসবে পরিণত করার এই প্রবণতা অবশ্য একেবারে নতুন নয়। ‘প্লানেত বুম বুম’ নামে একটি গোষ্ঠীর মূলমন্ত্রই হল, “প্রতিবাদকে রেভ পার্টিতে নিয়ে যাওয়া, আর রেভ পার্টিকে প্রতিবাদে।” পেনশন সংস্কারের বিরুদ্ধে আন্দোলন থেকে জন্ম হয়েছিল গোষ্ঠীটির। ডিজের সরঞ্জাম নিয়ে মিছিলে হাজির হন সদস্যেরা, নাচগানের মধ্য দিয়ে প্রতিবাদকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলেন।

একাধিক স্তরবিশিষ্ট একটি ট্রাকে দাঁড়িয়ে গোষ্ঠীর সদস্য লুসি তাঁদের কৌশল ব্যাখ্যা করলেন। “যাঁরা প্রথম বার বিক্ষোভে এসেছেন, উদ্বেগে ভুগছেন, তাঁদের আমরা ট্রাকের উপরে তুলে নিই। নিজেদের কথা বলার সুযোগ দিই। আশা করি, এর মধ্য দিয়ে তাঁদের মধ্যে আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার একটা তাগিদ তৈরি হবে।”

আন্দোলনকারী বাদ্যদল ‘লা ক্লে দ্য ল্যুৎ’-এর সদস্য, ৩০ বছরের লিসাও মনে করেন, একসঙ্গে গানবাজনা করা প্রতিবাদীদের সাহস জোগায়। গত ৬ অক্টোবর প্যারিসের প্লাস দ্য লা নাসিয়ঁয় একটি বিক্ষোভে পুলিশ তাঁদের ঘিরে ফেলেছিল।

লিসার স্মৃতিতে, “চারদিকে কাঁদানে গ্যাস উড়ছিল। তরুণরাও পাল্টা প্রতিরোধ করছিলেন। বোঝা যাচ্ছিল, উত্তেজনা বাড়ছে।”

সহশিল্পীদের নিয়ে তখন এগিয়ে গিয়ে বাজনা ধরেন তিনি। তাঁর কথায়, “ভয় সত্ত্বেও একসঙ্গে থেকে আমাদের একটু বেশি সাহস হচ্ছিল।”

এমনকি তাঁর বাঁশি এক দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণকারী পুলিশকর্মীর ঢালে ঠুকে যাচ্ছিল। তার পরেও বাজনা থামাননি লিসা। শেষে তাঁর দাবি, “কিন্তু শেষ পর্যন্ত কাজ হয়েছিল—পুলিশ পিছিয়ে গিয়েছিল।”

মুখোশ, মিম, কসপ্লে, গান কিংবা ভাইরাল স্লোগান—জেন জেডের প্রতিবাদের ভাষা তাই একমাত্রিক নয়। কখনও হাসি, কখনও ব্যঙ্গ, কখনও আবার রাগের প্রকাশ। জনপ্রিয় সংস্কৃতির চেনা প্রতীককে নিজেদের মতো করে ব্যবহার করে তরুণেরা শুধু প্রতিবাদের বার্তাই দিচ্ছেন না, নিজেদের মধ্যে তৈরি করছেন একাত্মতার বোধও। তাঁদের বার্তা স্পষ্ট—রাজনীতির কথা বলতে হলে সব সময় গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় না। কখনও কখনও হাসতে হাসতেও ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা যায়।