বাংলাস্ফিয়ার: রাশিয়ার জ্বালানির বড় আমদানিকারক দেশগুলির বিরুদ্ধে ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের বিধান আপাতত স্থগিত করেছেন ট্রাম্প। এর ফলে ভারতের উপর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার তাৎক্ষণিক ঝুঁকি কমেছে। কিন্তু ভবিষ্যতেও এই প্রশ্নে নয়াদিল্লির উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে ওয়াশিংটন।

আমেরিকার জাতীয় স্বার্থের কথা উল্লেখ করে রাশিয়া-সংক্রান্ত ওই আইনের আওতায় থাকা গুরুত্বপূর্ণ নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক থেকে ছাড় দেওয়ার একটি নির্বাহী আদেশে সই করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আইনের প্রধান কয়েকটি বিধান কার্যকর হওয়ার মাত্র কয়েক দিন আগে এই ছাড় দেওয়া হল। ট্রাম্প প্রশাসন যত দিন না মনে করছে যে ‘আরও পদক্ষেপ করা সমীচীন’, তত দিন এই নির্বাহী আদেশ বহাল থাকবে।

আগামী মাসে আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচন। তার আগে এই ছাড়ের সিদ্ধান্ত এল। নতুন আইন কার্যকর হয়ে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে গেলে ইতিমধ্যেই চড়া জ্বালানির দাম আরও বাড়ত। আমেরিকাতেও তার প্রভাব পড়ত, যা নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির সম্ভাবনায় আঘাত করতে পারত। ভোটের আগে লাগামছাড়া জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে বেশ কিছু পদক্ষেপ করছেন ট্রাম্প। সম্প্রতি আমেরিকা ও অন্যান্য দেশে রুশ ডিজেল রফতানির উপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার চুক্তিও তারই একটি উদাহরণ।

ভারতের ক্ষেত্রে এই ছাড়ের অর্থ, রাশিয়ার জ্বালানি কেনার জন্য শাস্তির মুখে পড়ার ঝুঁকি অন্তত আপাতত কমল। তবে তার মানে এই নয় যে ভবিষ্যতে এই বিষয়টি নিয়ে নয়াদিল্লির উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারবে না বা করবে না ওয়াশিংটন। ট্রাম্পের অবস্থান যে দ্রুত বদলে যেতে পারে, তা সুবিদিত। মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরে রাশিয়া-ইউক্রেন প্রশ্নে তাঁর প্রশাসন কী অবস্থান নেয়, সেটাই এখন দেখার।

ভারতের কাছে রাশিয়ার তেল এত গুরুত্বপূর্ণ কেন

ভারত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল ব্যবহারকারী দেশ। নিজের প্রয়োজনের ৮৮ শতাংশেরও বেশি অপরিশোধিত তেলের জন্য দেশটি আমদানির উপর নির্ভরশীল। আর ভারতের বৃহত্তম সরবরাহকারী রাশিয়া। পণ্যবাজার বিশ্লেষক সংস্থা কেপলারের তেলবাহী জাহাজ চলাচল-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে ভারত প্রতিদিন ১৯ লক্ষ ব্যারেল রুশ অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছে। ওই মাসে ভারতের মোট তেল আমদানির ৩৫ শতাংশেরও বেশি এসেছে রাশিয়া থেকে। তার আগের মাসগুলিতে রাশিয়া থেকে আমদানির পরিমাণ আরও বেশি ছিল। জুলাইয়ে তা দৈনিক ২৮ লক্ষ ব্যারেলের সর্বকালীন রেকর্ডে পৌঁছেছিল।

ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরেই রাশিয়া থেকে ভারতের তেল আমদানি দ্রুত বাড়তে থাকে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রুশ আক্রমণের পরে পশ্চিমি বিশ্বের বড় অংশ রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল কেনা এড়িয়ে চলতে শুরু করে। তখন আগ্রহী ক্রেতাদের ছাড়ে তেল বিক্রির প্রস্তাব দেয় মস্কো। ভারতের তেল শোধনকারী সংস্থাগুলি দ্রুত সেই সুযোগ নেয়। ফলে ভারতের তেল সরবরাহে এক সময় নগণ্য ভূমিকা থাকা রাশিয়াই পশ্চিম এশিয়ার চিরাচরিত সরবরাহকারীদের সরিয়ে দেশের বৃহত্তম অপরিশোধিত তেলের উৎস হয়ে ওঠে।

এই ব্যবস্থায় দু’পক্ষই লাভবান হয়েছে। যে অপরিশোধিত তেল অন্যথায় বিক্রি করা কঠিন হত, তার জন্য একটি বড় বাজার পেয়েছে রাশিয়া। অন্য দিকে, ভারত পেয়েছে সরবরাহের একটি অতিরিক্ত উৎস—এমন একটি বাজারে, যেখানে দাম, জাহাজভাড়া এবং ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা দ্রুত তেল কেনার খরচ বদলে দিতে পারে। প্রয়োজনের সিংহভাগ অপরিশোধিত তেল ভারত আমদানি করে বলে প্রতি ব্যারেলের দামে সামান্য তফাতও দেশের মোট তেল আমদানির খরচে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। তা ছাড়া, ভারত মূলত রাশিয়ার যে মাঝারি ঘনত্বের, তুলনামূলক বেশি সালফারযুক্ত অপরিশোধিত তেল আমদানি করে, তা শোধনের উপযোগী প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা দেশের অধিকাংশ শোধনাগারেই রয়েছে।

পশ্চিম এশিয়ার সংকটে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেলের সরবরাহ কার্যত শুকিয়ে যাওয়ার সময়ে রুশ তেল ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ রক্ষাকবচ হয়ে উঠেছে। যুদ্ধের আগে ভারতের অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ৪০ শতাংশ সাধারণত হরমুজ প্রণালী দিয়ে আসত। এই জলপথে জ্বালানির পরিবহণ কঠোর ভাবে সীমিত হয়ে পড়ায় ওই সরবরাহের বড় অংশ কার্যত বন্ধ রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, নিষেধাজ্ঞার হুমকি সত্ত্বেও ভারতের শোধনকারী সংস্থাগুলির কাছে রুশ অপরিশোধিত তেলই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত এবং দামের বিচারে প্রতিযোগিতামূলক উৎস হয়ে থেকেছে। বর্তমান বাজারে তার বিকল্প খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত কঠিন।

এই ছাড়ে ভারতের জন্য কী বদলাচ্ছে

সবচেয়ে তাৎক্ষণিক সুবিধা হল, নতুন আইনের আওতায় অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের হুমকি আপাতত স্থগিত হয়েছে। ভারতের আশঙ্কা ছিল, রাশিয়ার তেল কেনার কারণে আমেরিকায় তার রফতানির উপর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। নয়াদিল্লি ও ওয়াশিংটনের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক যখন একটি সংবেদনশীল পর্যায়ে এবং দু’দেশের বাণিজ্যচুক্তির আলোচনা যখন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে, তখন এই ঝুঁকি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ছিল।

সেক্ষেত্রে ভারতকে একটি অস্বস্তিকর সিদ্ধান্ত নিতে হত—আমেরিকায় রফতানি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি নিয়েও রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল কেনা চালিয়ে যাবে, নাকি মার্কিন শাস্তির আশঙ্কা কমাতে রুশ তেল কেনা কমাবে। ট্রাম্পের দেওয়া ছাড় সেই তাৎক্ষণিক উভয়সঙ্কট দূর করেছে। তবে স্থগিতাদেশ যত দিন বহাল থাকবে, তত দিনের জন্যই।

এর ফলে ভারতের শোধনকারী সংস্থাগুলি অতিরিক্ত শুল্কের হুমকির বদলে দাম, প্রাপ্যতা ও পরিবহণের সুবিধা-অসুবিধা বিচার করে রুশ তেলের চালান কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার বেশি সুযোগ পাবে। দীর্ঘমেয়াদি তেল সংগ্রহের পরিকল্পনার অনিশ্চয়তাও কিছুটা কমবে। তবে ভারতের প্রকৃত লাভ হল, সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা ও বিকল্প বজায় থাকা। রুশ অপরিশোধিত তেলের বাণিজ্যিক সুবিধার সঙ্গে এমন এক সরবরাহকারীর উপর নির্ভরতার ঝুঁকি মিলিয়ে দেখতে পারবে নয়াদিল্লি, যার বাণিজ্য ক্রমশ ভূরাজনৈতিক সংঘাতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। শুধু এই ছাড়ের চেয়েও ভারতের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে, সেই সুযোগ দেশটি কতটা কার্যকর ভাবে কাজে লাগাতে পারে।

এই সিদ্ধান্তকে ভারতকে সীমাহীন পরিমাণে রুশ তেল কেনার মার্কিন নিশ্চয়তা বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়। হোয়াইট হাউসের আদেশে বিশেষ ভাবে বলা হয়েছে, রুশ জ্বালানি কেনার উপর নজর রাখতে হবে মার্কিন আধিকারিকদের। এমন কোনও পরিস্থিতি তৈরি হলে, যা আরও পদক্ষেপের প্রয়োজন নির্দেশ করে, তা-ও তাঁদের জানাতে হবে। পৃথক নির্বাহী আদেশের আওতায় আগে থেকে জারি থাকা নিষেধাজ্ঞাগুলিও অপরিবর্তিত থাকছে। সহজ কথায়, এই প্রশ্নে অবস্থান বদলানোর ক্ষমতা নিজের হাতে রেখেছে ওয়াশিংটন।

মনে রাখা দরকার, বিপুল পরিমাণ রুশ তেল কেনার জন্য ভারতকে বারবার নিশানা করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল থেকে সরে আসতে নয়াদিল্লির উপর চাপ দিয়ে চলেছে ওয়াশিংটন। ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি ছিল, রাশিয়ার তেল কিনে ভারত আসলে ইউক্রেনে মস্কোর যুদ্ধের খরচ জোগাচ্ছে।

এখন ভারতের কী করা উচিত

রাশিয়ার ডিজেল ও তেল রফতানি নিয়ে ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ স্পষ্ট করে দেয়, ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে দেশের অভ্যন্তরীণ তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রায় সব কিছুর চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়। এমনকি যে নীতিগুলিকে আদর্শ ও নৈতিকতার ভিত্তিতে নেওয়া বলে দাবি করা হয়েছিল, সেগুলির চেয়েও। সেই অভ্যন্তরীণ চাপ কমে গেলে আমেরিকা কী করবে, তা অনিশ্চিত। তাই রাশিয়ার উপর নির্ভরতা আরও বাড়ানোর বদলে এই ছাড়কে জ্বালানি নিরাপত্তা মজবুত করা এবং আমদানির উৎসে বৈচিত্র্য আনার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত ভারতের।

২০২৬ সালের মার্চ থেকে ভারতের অপরিশোধিত তেল আমদানির কৌশলে বড় পরিবর্তন এসেছে। হরমুজ প্রণালীর অচলাবস্থা পশ্চিম এশিয়া থেকে তেলের সরবরাহ সংকুচিত করেছে এবং পরিবহণের ঝুঁকি বাড়িয়েছে। ভারতের আমদানির প্রধান ভিত্তি এখনও রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল। পাশাপাশি, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ার ঘাটতি পূরণ করতে শোধনকারী সংস্থাগুলি আফ্রিকা, উত্তর আমেরিকা ও দক্ষিণ আমেরিকা থেকে তেল কেনা জোরদার করেছে। বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকদের মতে, বিভিন্ন উৎস থেকে অপরিশোধিত তেল কেনার এই নীতি ভারতের বজায় রাখা উচিত। এমনকি সেই উদ্যোগ আরও বাড়ানো দরকার, যাতে মার্কিন নীতির আকস্মিক পরিবর্তনে বিশ্ববাজারে সরবরাহের টানাটানির মধ্যে বিকল্প তেল জোগাড় করতে ভারতকে হন্যে হয়ে ছুটতে না হয়।

পাশাপাশি, ভারতের জ্বালানি কেনার বিষয়ে মার্কিন অবস্থান যাতে আরও স্পষ্ট ও পূর্বানুমানযোগ্য হয়, তা নিশ্চিত করতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া উচিত নয়াদিল্লির।

গত মাসে ‘লিন্ডসে ও. গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট’ আইনে পরিণত হওয়ার পরে নয়াদিল্লি জানিয়েছিল, বিষয়টি নিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা চলছে। গত মাসে বিদেশ মন্ত্রকের একটি বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, “সাম্প্রতিক মাসগুলিতে বিভিন্ন মার্কিন প্রতিনিধির সঙ্গে উচ্চপর্যায়ে এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নয়, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও এর সম্ভাব্য প্রভাব কী হতে পারে, তা ভারতীয় পক্ষ অত্যন্ত স্পষ্ট ভাবে তুলে ধরেছে।”

বিদেশ মন্ত্রক আরও বলেছিল, “নিজের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সমস্ত ব্যবস্থা নেওয়ার সংকল্পও ভারতীয় পক্ষ স্পষ্ট করে দিয়েছে। এই ঘটনাপ্রবাহের প্রভাব মোকাবিলায় সরকার ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প সংগঠনগুলির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ভাবে কাজ করবে।”

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলিতেও সেই আলোচনা চলেছে। নতুন আইন নিয়ে ভারতের গভীর উদ্বেগ জানাতে বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ও বিদেশসচিব বিক্রম মিস্রী উচ্চপদস্থ মার্কিন আধিকারিক এবং আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। এই ছাড় ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য আলোচনাতেও কিছুটা স্বস্তির অবকাশ এনে দিয়েছে। দু’দেশ যখন একটি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যচুক্তির লক্ষ্যে এগোচ্ছে, তখন নতুন করে শুল্কের ধাক্কা এড়ানো পারস্পরিক টানাপড়েনের একটি কারণ কমাতে সাহায্য করবে।