বাংলাস্ফিয়ার: রবার্ট ই. হল এবং মাইকেল উডফোর্ডের গবেষণা দেখিয়েছে, অর্থনৈতিক নীতি কতটা কার্যকর হবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করে সরকার সেই নীতি গ্রহণের কারণ জনসাধারণের কাছে কতটা স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে পারছে, তার উপরও।

অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখার নীতি প্রণয়নে সরকারকে সাহায্য করার জন্য পরিবারগুলির চাহিদা এবং সংস্থাগুলির সরবরাহ-সংক্রান্ত আচরণকে একত্র করে তথ্যভিত্তিক সূত্র নির্মাণ করেছেন দুই মার্কিন অর্থনীতিবিদ রবার্ট ই. হল এবং মাইকেল উডফোর্ড। এই অবদানের জন্যই তাঁরা যৌথভাবে পেয়েছেন ২০২৬ সালের অর্থনীতির নোবেল পুরস্কার।

সাধারণভাবে অর্থনীতির নোবেল নামে পরিচিত ‘আলফ্রেড নোবেলের স্মৃতিতে অর্থনৈতিক বিজ্ঞানে সুইডেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পুরস্কার’-এর ঘোষণায় বলা হয়েছে, ‘সামষ্টিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার ব্যষ্টিক অর্থনৈতিক ভিত্তি’ প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁদের এই সম্মান দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, ব্যক্তি, পরিবার ও সংস্থার সিদ্ধান্ত কীভাবে সামগ্রিক অর্থনীতির গতিপ্রকৃতিকে প্রভাবিত করে, সেই সম্পর্ককে তাঁরা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার নীতির ভিত্তি করে তুলেছেন।

হল এবং উডফোর্ডের গবেষণা আরও একটি ধারণার তথ্যভিত্তিক ভিত্তি তৈরি করেছে। সেটি হল, অর্থনৈতিক নীতির কার্যকারিতা নির্ভর করে সরকার কেন সেই নীতি গ্রহণ করছে, তা মানুষের কাছে কতটা ভালভাবে ব্যাখ্যা করতে পারছে, তার উপরও। সোমবার উডফোর্ড নিজেই বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন।

হল বর্তমানে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রবার্ট অ্যান্ড ক্যারল ম্যাকনিল জয়েন্ট হুভার সিনিয়র ফেলো এবং অর্থনীতির অধ্যাপক। উডফোর্ড কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জন বেটস ক্লার্ক অধ্যাপক হিসেবে রাজনৈতিক অর্থনীতি পড়ান।

স্থিতিশীলতার নীতি বলতে সাধারণভাবে বোঝায়, অর্থনৈতিক বৃদ্ধি, উৎপাদন, মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব এবং অর্থনীতির উত্থান-পতনের চক্রে প্রবল ওঠানামা নিয়ন্ত্রণ করতে সরকার যে বিভিন্ন উপায় ও পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

বিংশ শতাব্দীর অধিকাংশ সময় জুড়ে প্রভাব বিস্তার করেছিল অর্থনৈতিক তত্ত্বের অন্যতম দিকপাল জন মেনার্ড কেইনসের চিন্তাধারা। তাঁর বক্তব্য ছিল, অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে সরকারি নীতির মাধ্যমে হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। অর্থাৎ, মুদ্রানীতি শিথিল করে এবং সরকারের তরফে পরিবারগুলিকে আর্থিক সহায়তা বাড়িয়ে চাহিদা বাড়ানো সম্ভব। আবার এই নীতিগুলিকে কঠোর করে অতিরিক্ত চাহিদায় রাশ টানা যায়।

কিন্তু গত শতকের সত্তরের দশকে মার্কিন অর্থনীতির অভিজ্ঞতা দেখিয়ে দেয়, শুধু এই কাঠামো যথেষ্ট নয়। মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্ব নিয়ন্ত্রণে মার্কিন সরকার এবং সে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের প্রচেষ্টার পরেও দেখা দেয় উচ্চ বেকারত্ব এবং একই সঙ্গে চড়া ও ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি।

এর ফলে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার নীতির গোটা ধারণাটিই প্রশ্নের মুখে পড়ে। কেউ কেউ এমনও যুক্তি দেন যে, এই নীতি সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করা উচিত। হল এবং পরবর্তী সময়ে উডফোর্ড এই কাঠামোকে নতুন করে গড়ে তোলেন।

হল কাজ করেছিলেন চাহিদার দিকটি নিয়ে। তাঁর গবেষণা ভোগের চাহিদা বোঝার ক্ষেত্রে নতুন পথ দেখায়।

আগের কাঠামোয় ধরে নেওয়া হয়েছিল, মোট ব্যবহারযোগ্য আয় এবং মোট ভোগের চাহিদার মধ্যে একটি যান্ত্রিক সম্পর্ক রয়েছে। অর্থাৎ, মানুষের হাতে খরচ ও সঞ্চয়ের জন্য থাকা আয় বাড়লে ভোগ বাড়বে, আয় কমলে ভোগও কমবে—সম্পর্কটিকে এভাবেই দেখা হত।

হল দেখান, বর্তমান ব্যবহারযোগ্য আয় অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ভবিষ্যতে আয়ের গতিপথ কেমন হবে, তা নিয়ে মানুষের প্রত্যাশাও প্রায় সমান গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ, কোনও পরিবার যদি মনে করে যে ভবিষ্যতে তার আর্থিক সামর্থ্যের উপর চাপ আসবে, তা হলে সেই আশঙ্কা আজকের খরচকেও প্রভাবিত করবে।

১৯৭৮ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে হল এই ধারণার পক্ষে তথ্যভিত্তিক সমর্থন হাজির করেন। ভোগ-সংক্রান্ত তত্ত্বগুলিকে কীভাবে পরিমাণগতভাবে বিচার করা যায়, তাঁর কাজ সেই পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন আনে।

অন্যদিকে উডফোর্ড মনোযোগ দেন সরবরাহের দিকে। বিশেষ করে, সংস্থাগুলি কীভাবে পণ্যের দাম নির্ধারণ করে, তা ছিল তাঁর গবেষণার বিষয়। পরে তিনি নিজের কাজ এবং হলের গবেষণাকে মিলিয়ে একটি সমন্বিত কাঠামো তৈরি করেন।

নব্বইয়ের দশক থেকে প্রকাশিত একাধিক গবেষণাপত্রে উডফোর্ড দেখান, সংস্থাগুলির নির্ধারিত দাম নিরবচ্ছিন্নভাবে বদলাতে থাকে না। বরং তারা একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দাম স্থির করে। যেমন, গ্রীষ্মের শুরুতে আইসক্রিমের দাম নির্ধারণ করা হল এবং গোটা মরসুমে তা আর বদলানো হল না।

এই বিষয়টি বোঝার ফলে সরবরাহের দিকেও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে প্রত্যাশার গুরুত্ব স্পষ্ট হয়। কারণ, কোনও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দাম স্থির করে রাখতে হলে, সেই সময়ের পরিস্থিতি কেমন হতে পারে, তা সংস্থাগুলিকে আগেই বিবেচনা করতে হয়।

এই তত্ত্ব থেকে উডফোর্ড এমন একটি সূত্র নির্ণয় করতে সক্ষম হন, যা দেখায় সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে প্রত্যাশা এবং বর্তমান উৎপাদনের মাত্রার কী সম্পর্ক রয়েছে। এর সঙ্গে তিনি যুক্ত করেন চাহিদা সম্পর্কে হলের তত্ত্ব।

২০০৩ সালে প্রকাশিত তাঁর Interest and Prices: Foundations of a Theory of Monetary Policy গ্রন্থে উডফোর্ড এই সম্পূর্ণ কাঠামো তুলে ধরেন। অর্থনীতির উত্থান-পতনের চক্র কী কারণে তৈরি হয়, কীভাবে তা এগোয় এবং স্থিতিশীলতা আনার নীতির উপর তার কী প্রভাব পড়ে—এই সমস্ত বিষয় বোঝার ভিত্তি তৈরি করে বইটি। একই সঙ্গে নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতার গুরুত্বের মতো কয়েকটি মৌলিক উপলব্ধিও সামনে আনে।

সোমবার নোবেলের ফল ঘোষণার সাংবাদিক সম্মেলনে উডফোর্ড বলেন, “আমার কাজের অন্যতম মূল বক্তব্য হল, সরকারি কর্তৃপক্ষের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার বিষয়টিকে এমন একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা উচিত নয়, যেখানে কয়েকজন নিয়ন্ত্রণের হাতল টেনে অর্থনীতি চালাচ্ছেন, আর অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত মানুষ বিষয়টি কীভাবে বুঝছেন, তার কোনও গুরুত্ব নেই।”

তিনি ব্যাখ্যা করেন, ভবিষ্যতে নীতি কেমন হতে পারে, সে সম্পর্কে ভোক্তাদের ধারণা সেই নীতির ফলাফলের ক্ষেত্রে ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’—তাঁর গবেষণায় এই বিষয়টির উপর জোর দেওয়া হয়েছে।

উডফোর্ড বলেন, “তাই সরকার কী করছে, তা নিয়ে জনসাধারণের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ তৈরি করে দেয়, এমন একটি কাঠামো গড়ে তোলাও গুরুত্বপূর্ণ বলে আমি মনে করি।”

তিনি আরও বলেন, “এই বিশ্লেষণী কাঠামো তৈরির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল সেটাই। শুধু মানুষের উপর তা প্রয়োগ করার জন্য নয়, যা করা হচ্ছে, তা কেন করা হচ্ছে, সে বিষয়ে মানুষের সঙ্গে কথা বলার জন্যও।”