বাংলাস্ফিয়ার: বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে আজকাল আরও রোগা, আরও ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে। আগের নির্বাচনী প্রচারের সেই দাপুটে ভাব উধাও। কিন্তু ক্লান্তি নেই তাঁর। শপিং সেন্টার থেকে টেলিভিশন স্টুডিয়ো—ছুটে বেড়াচ্ছেন সর্বত্র। চেষ্টা করছেন ক্লান্ত, মেরুকরণে বিভক্ত একটি দেশকে বোঝাতে: মঙ্গলবারের নির্বাচনে তাঁকেই ফের ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনুক ইজরায়েল, আরও সর্বোচ্চ চার বছরের জন্য।
বয়স ৭৭। ইতিমধ্যেই ইজরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি দিন প্রধানমন্ত্রীর পদে থেকেছেন তিনি। সেই মেয়াদ আরও বাড়াতে হলে গভীরভাবে বিভক্ত ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে হবে নিজের নতুন, আরও যুদ্ধংদেহী রূপটিকে—এবং ইজরায়েলেরও সেই বদলে যাওয়া চেহারাকে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর দক্ষিণ ইজরায়েলে হামাসের নেতৃত্বে সংঘটিত হামলা চিরকালের জন্য নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক জীবনের পরিচয় নির্ধারণ করে দেবে। হলোকস্টের পর ইহুদিদের জন্য এত প্রাণঘাতী দিন আর আসেনি। দীর্ঘদিন ধরে নেতানিয়াহুর পরিচয় ছিল ঝুঁকি নিতে অনিচ্ছুক, সামরিক সংঘাত এড়িয়ে চলতে আগ্রহী এক নেতা হিসেবে। অথচ একই সঙ্গে নিজেকে ইজরায়েলের নিরাপত্তার প্রধান ভরসা হিসেবে তুলে ধরতেন তিনি। সেই দিন তাঁর ওই ভাবমূর্তি যেমন ভয়ানক ধাক্কা খায়, তেমনই ভেঙে পড়ে নিজেদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার প্রতি ইজরায়েলিদের আস্থা।
এর পর নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলেন নেতানিয়াহু—বন্ধু ও শত্রু, দু’পক্ষের কাছেই যিনি ‘বিবি’ নামে পরিচিত। আত্মরক্ষার জন্য স্বল্পমেয়াদি যুদ্ধের যে নিরাপত্তানীতি এত দিন অনুসরণ করে এসেছে ইজরায়েল, তাতে আটকে না থেকে একাধিক রণাঙ্গনে দেশের দীর্ঘতম যুদ্ধ চালিয়েছেন তিনি। গাজায় হামাস, লেবাননে হিজবুল্লা, ইয়েমেনে হুথি মিলিশিয়া এবং আমেরিকার সঙ্গে মিলে ইরানের বিরুদ্ধে।
পশ্চিম তীরের উপর ইজরায়েলের দখলদারিও আরও জোরদার করেছেন তিনি। ইহুদি বসতির বিস্তার এবং প্যালেস্তিনীয়দের বিরুদ্ধে বসতি স্থাপনকারীদের হিংসা বাড়তে দিয়েছেন। এর ফলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ইজরায়েলের বিচ্ছিন্নতা আরও গভীর হয়েছে।
ইজরায়েলি রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও নেতানিয়াহুর জীবনীকার মাজাল মুয়ালেম বলেন, “তিনি বুঝেছিলেন, শুধু রাজনীতিতে নয়, ইতিহাসের একজন ব্যক্তিত্ব হিসেবেও টিকে থাকতে হলে তাঁকে বদলাতে হবে।” তাঁর কথায়, “পুরনো বিবিকে মেরে ফেলে তিনি পৃথিবীতে নতুন এক বিবির জন্ম দিয়েছেন।”
৭ অক্টোবরের হামলার পর হামাস এবং অন্য শত্রুদের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ জয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন নেতানিয়াহু। ইজরায়েলের সামরিক অভিযানে সেই প্রতিপক্ষগুলি বিপর্যস্ত হলেও যুদ্ধগুলির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। এখন তিনি বলছেন, আরও কাজ বাকি আছে, আর সেই কাজ করার উপযুক্ত ব্যক্তি তিনিই। মঙ্গলবার তাঁর ঘোষণা, “ইরানের শাসনব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ নির্মূল করার কাজ আমাদের শেষ করতেই হবে।”
সেই সুযোগ তিনি পাবেন কি না, তা স্পষ্ট নয়। বহু ইজরায়েলি যে নির্বাচনকে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভাগ্যনির্ধারক বলে মনে করছেন, তার কয়েক দিন আগে নেতানিয়াহু ও তাঁর লিকুদ দল প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে। বিপরীতে রয়েছে মধ্যপন্থী নেতা ও প্রাক্তন সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী শিবির। জনমত সমীক্ষায় বিরোধীরা সামান্য এগিয়ে, কিন্তু সরকার গড়ার মতো জোট নিশ্চিত করতে যতগুলি আসন প্রয়োজন, ততগুলি পাওয়ার ইঙ্গিত নেই।
নেতানিয়াহুর ঔজ্জ্বল্য কিছুটা ম্লান হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু তিনি রাজনীতির এক কুশলী খেলোয়াড়। অনুগত সমর্থকদের ভিত্তি ধরে রেখেছেন, গড়ে তুলেছেন শক্তিশালী রাজনৈতিক জোট। ফলে তাঁকে হিসাবের বাইরে রাখা চলে না।
দায় কার?
নব্বইয়ের দশকে তিন বছরের একটি মেয়াদ ছাড়াও গত ১৭ বছরের অধিকাংশ সময়ই প্রধানমন্ত্রী ছিলেন নেতানিয়াহু। যে ইজরায়েলের রূপ নির্মাণে তাঁর এত বড় ভূমিকা, সেই দেশের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছেন তিনিও।
অল্প দিনের বিরতির পর ২০২২ সালের শেষ দিকে ক্ষমতায় ফেরেন তিনি। দুর্নীতির অভিযোগের মুখে থাকায় মূলধারার অন্য দলগুলি তাঁকে এড়িয়ে চলছিল। তখন এমন সব অতিদক্ষিণপন্থী চরমপন্থীকে নিয়ে শাসকজোট গড়েন নেতানিয়াহু, যাঁদের অধিকাংশ ইজরায়েলি রাজনীতিক এত দিন গ্রহণযোগ্যতার সীমার বাইরেই রাখতেন।
সেই সময় ইজরায়েলের সংসদে তিনি বলেছিলেন, “আমাদের ইতিহাসে নিরাপত্তার নিরিখে সবচেয়ে শান্ত ও নিরাপদ দশক” পেরিয়ে দেশ এখন তার “স্বর্ণযুগে”। ইরানকে পরমাণু অস্ত্র তৈরি করতে না দেওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করার পাশাপাশি তিনি সাড়ম্বরে ঘোষণা করেছিলেন “শান্তির বৃত্ত আরও প্রসারিত” করার লক্ষ্য। উদ্দেশ্য, আরব-ইজরায়েল সংঘাতের অবসান।
তার বদলে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর সকালে গাজা থেকে সীমান্ত পেরিয়ে ঢুকে পড়ে হাজার হাজার বন্দুকধারী। ইজরায়েলি জনবসতি, সেনাঘাঁটি এবং একটি সংগীত উৎসব তাদের আক্রমণের মুখে পড়ে। ইজরায়েলি কর্তৃপক্ষের হিসাবে, প্রায় ১,২০০ মানুষ নিহত হন। পণবন্দি করে নিয়ে যাওয়া হয় ২৫১ জনকে।
হামলার আগে সরকারের যে সব ব্যর্থতা দেশকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছিল, তার ব্যক্তিগত দায় নেননি নেতানিয়াহু। এর মধ্যে ছিল হামাসের মোকাবিলা করার বদলে হামাসশাসিত গাজায় শান্ত পরিস্থিতি বজায় রাখার লক্ষ্যে তাঁর নীতি। ছিল সামরিক ও গোয়েন্দা ব্যর্থতাও, যা ইজরায়েলকে অরক্ষিত করে রেখেছিল। কোথায় কী ভুল হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখতে স্বাধীন রাষ্ট্রীয় তদন্তও আটকে দিয়েছেন তিনি।
নেতানিয়াহুর বক্তব্য, ৭ অক্টোবর নিরাপত্তাবাহিনীর প্রধানেরাই তাঁকে ঘুম থেকে না ডাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
অথচ গাজার সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলি যে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তার লক্ষণ বারবার খাটো করে দেখেছিলেন নেতানিয়াহু এবং ইজরায়েলের নিরাপত্তা নেতৃত্ব। সেই লক্ষণের মধ্যে ছিল নজরদারির দায়িত্বে থাকা মহিলা সেনাদের পাঠানো হামাসের তৎপরতা বৃদ্ধির খবর এবং ইজরায়েলের হাতে আসা হামাসের একটি যুদ্ধপরিকল্পনাও।
নতুন নিরাপত্তানীতি
গাজার স্বাস্থ্যকর্তাদের হিসাবে, হামাসের বিরুদ্ধে ইজরায়েলের যুদ্ধে ৭৪ হাজারেরও বেশি প্যালেস্তিনীয় নিহত হয়েছেন। এই যুদ্ধের কারণে মানবাধিকার সংগঠন ও বিদেশি সরকারগুলি নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ তুলেছে।
সমালোচক ও প্রাক্তন ইজরায়েলি আধিকারিকদের অভিযোগ, ৭ অক্টোবরের হামলার জবাবে শুরু করা গাজার যুদ্ধ নেতানিয়াহু দীর্ঘায়িত করেছেন। পণবন্দিদের মুক্তির চুক্তিতেও দেরি করিয়েছেন। উদ্দেশ্য ছিল অতিদক্ষিণপন্থী জোটসঙ্গীদের পাশে রাখা এবং নিজের ক্ষমতা ধরে রাখা। এ বিষয়ে মন্তব্য চাওয়া হলেও প্রধানমন্ত্রীর দফতর সাড়া দেয়নি।
যুদ্ধগুলি সেনাবাহিনীর উপরও বিপুল চাপ তৈরি করেছে। বহু ইজরায়েলিকে সংরক্ষিত বাহিনীর সদস্য হিসেবে বারবার সামরিক দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে, যার মাশুল দিতে হচ্ছে তাঁদের। অথচ একই সময়ে অতি-রক্ষণশীল ইহুদি পুরুষদের বাধ্যতামূলক সামরিক পরিষেবা থেকে অব্যাহতি বহাল রেখেছেন নেতানিয়াহু। তাঁর অতি-রক্ষণশীল জোটসঙ্গীদের দাবি মেনেই এই সিদ্ধান্ত। তাঁদের মতে, ধর্মীয় অধ্যয়ন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
গাজা যুদ্ধে ইজরায়েলের আচরণ দেশটিকে ক্রমশ আরও বিচ্ছিন্ন করেছে। আন্তর্জাতিক বয়কট ও নিষেধাজ্ঞার মুখেও পড়েছে দেশ। শৈশবের কিছুটা সময় পেনসিলভেনিয়ায় কাটানো নেতানিয়াহু আমেরিকানদের ভাষা ও মন বুঝে কথা বলতে পারেন বলে গর্ব করেন। কিন্তু ইজরায়েলে আমেরিকার প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত ড্যানিয়েল বি. শাপিরোর মতে, যুক্তরাষ্ট্রে ইজরায়েলের প্রতি সমর্থন এখন নজিরবিহীন নিম্নস্তরে।
তাঁর কথায়, “নেতৃত্বে পরিবর্তন না এলে, ইজরায়েলের মুখ বদল না হলে, এই পরিস্থিতি উল্টে দেওয়ার কোনও উপায় নেই।”
২০২৫ সালের একটি অর্থনৈতিক সম্মেলনে নেতানিয়াহু ইজরায়েলকে এক ধরনের ‘স্পার্টা’ হিসেবে গড়ে তোলার ভাবনা তুলে ধরেছিলেন—এমন এক সমাজ, যা বহির্বিশ্ব থেকে গুটিয়ে থাকবে, হবে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও সামরিকতাবাদী। বহু ইজরায়েলির কাছেই এই ভাবনা গভীর উদ্বেগের। কারণ, বিদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক এবং অন্যান্য সম্পর্কের সুবিধা তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে ভোগ করে এসেছেন।
অতীতে নেতানিয়াহু এমন কোনও যুদ্ধের নেতৃত্ব দিতে অনিচ্ছুক ছিলেন, যার শেষ কোথায় তা জানা নেই। গাজা সীমান্তে উত্তেজনার মধ্যে ২০১৮ সালে তিনি বলেছিলেন, “অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধ করতে আমি উৎসাহী নই।” আরও জানিয়েছিলেন, হিংসার বৃদ্ধি ঠেকাতে গাজার অর্থনৈতিক সংকট লাঘবের চেষ্টা করছেন তিনি।
২০০০ সালে দক্ষিণ লেবানন এবং ২০০৫ সালে গাজা থেকে সরে আসার পর প্রায় সিকি শতাব্দী ধরে ইজরায়েল মূলত নিজের সীমান্তের বেড়ার ভিতরেই থেকেছে। এই সময়ের অধিকাংশই ক্ষমতায় ছিলেন নেতানিয়াহু।
এখন সীমান্তবর্তী ইজরায়েলি জনবসতিগুলিকে রক্ষার যুক্তি দেখিয়ে লেবানন ও গাজার বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড ফের দখলে রেখেছে ইজরায়েল। সিরিয়াতেও নিজের দখলে থাকা এলাকার পরিধি বাড়িয়েছে। হুমকিকে সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত রাখার পুরনো সামরিক নীতি পরিত্যাগ করা হয়েছে। রবিবার নেতানিয়াহু তাঁর সংশোধিত জাতীয় নিরাপত্তানীতি প্রকাশ করেছেন। সেখানে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে আগাম ব্যবস্থা নিয়ে হুমকি ঠেকানোকে।
২০২৪ সালে ইজরায়েল লেবাননে হিজবুল্লার দীর্ঘদিনের নেতাকে হত্যা করার পর নেতানিয়াহু আগাম আঘাতের বিষয়ে তালমুদের একটি শিক্ষা উদ্ধৃত করে নিজের দর্শন ব্যাখ্যা করেছিলেন। তাঁর কথায়, “কেউ যদি তোমাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়, তবে তার আগেই তাকে হত্যা করো।”
‘ইজরায়েলের রাজা’
নির্বাচনী প্রচারে নেতানিয়াহু বাইরের এবং দেশের ভিতরের নানা বিষয়কে বিপদ হিসেবে তুলে ধরে ক্রমাগত সতর্কবার্তা দিচ্ছেন। ইজরায়েলের আরব নাগরিকদের সম্পর্কে ভয় উসকে দিচ্ছেন এবং তাঁদের প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দলগুলির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
সম্প্রতি এক কর্মদিবসের সন্ধ্যায় তেল আভিভের উপকণ্ঠ হোলোনের একটি শপিং মলের অপরিচ্ছন্ন ফুড কোর্টে নিরাপত্তারক্ষীরা নেতানিয়াহুকে নিয়ে এলেন। প্রায় ২০০ জন সেখানে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিলেন।
জনতা পরিচিত স্লোগান তুলল, “বিবি, ইজরায়েলের রাজা!”
দুর্বল শব্দব্যবস্থার কারণে নিজের কথা শোনাতেই বেগ পেতে হচ্ছিল নেতানিয়াহুকে। তাঁর নির্বাচনী বক্তৃতা স্থায়ী হল সাকুল্যে ৯০ সেকেন্ডের মতো।
“আপনারা কি মনসুর আব্বাসকে চান?” তিনি প্রশ্ন করলেন। একটি আরব রাজনৈতিক দলের নেতা আব্বাস। হাড্ডাহাড্ডি নির্বাচনে কে সরকার গড়বেন, তা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারেন তিনি।
“না!” চিৎকার করে উঠল জনতা।
“তা হলে বেরিয়ে পড়ুন, লিকুদকে ভোট দিন!” আহ্বান জানালেন নেতানিয়াহু। তার পরই তাঁকে দ্রুত সেখান থেকে নিয়ে যাওয়া হল।
ভিড়ের মধ্যে ছিলেন ৪৮ বছরের শিমোন কার্নি। তিনি বললেন, “আমি ওঁকে ভালবাসি। ইজরায়েল আর ইহুদি জনগণের জন্য উনি যা করেছেন, তাতে আমি গর্বিত। উনি যেন ১২০ বছর বয়স পর্যন্ত আমাদের প্রধানমন্ত্রী থাকেন।”
নেতানিয়াহুর সমর্থকেরা তাঁকে অনন্য এক নেতা বলে মনে করেন।
তাঁর প্রাক্তন উপদেষ্টা ওফের গোলান বলেন, “প্রধানমন্ত্রী একজন গর্বিত ইজরায়েলি দেশপ্রেমিক। তিনি তাঁর সত্তার প্রতিটি কণা দিয়ে বিশ্বাস করেন, ইজরায়েলের সামনে যে সব চ্যালেঞ্জ রয়েছে, সেগুলির মোকাবিলা করতে সক্ষম একমাত্র নেতা তিনিই। আর আমি বিশ্বাস করি, তিনি ঠিকই ভাবেন।”
ব্যক্তিগত যুদ্ধ
গত নির্বাচনের পর থেকে নেতানিয়াহু ও তাঁর সহযোগীরা তাঁদের ভাষায় ‘ডিপ স্টেট’-এ থাকা শত্রুদেরও নিশানা করতে শুরু করেছেন। সেই তালিকায় রয়েছেন ইজরায়েলের অ্যাটর্নি জেনারেল এবং শীর্ষ বিচারপতিরা।
বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর এই রূপান্তর ৭ অক্টোবরের হামলার অনেক আগেই শুরু হয়েছিল। তাঁরা এর সূচনা চিহ্নিত করেন ২০১৯ সালে। সে বছর পৃথক কিন্তু পরস্পর সম্পর্কিত তিনটি দুর্নীতির মামলায় ঘুষ, প্রতারণা ও আস্থাভঙ্গের অভিযোগে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত হন তিনি। ২০২০ সাল থেকে তাঁর বিচার চলছে। কোনও অন্যায় করার কথা তিনি অস্বীকার করেছেন। তাঁর অভিযোগ, ভোটের লড়াইয়ে তাঁকে হারাতে না পেরে ‘ডিপ স্টেট’ বিচারব্যবস্থাকে ব্যবহার করে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করার চেষ্টা করছে।
এক সময় নেতানিয়াহু মধ্যপ্রাচ্যে ইজরায়েলের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে আলোকবর্তিকা হিসেবে তুলে ধরতেন। নির্দলীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইজরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের সভাপতি ইয়োহানান প্লেসনার বলেন, অভিযুক্ত হওয়ার পর “তিনি আইন ও বিচারব্যবস্থাকে সরাসরি শত্রু হিসেবে দেখতে শুরু করেন।”
২০২৩ সালের জানুয়ারিতে নেতানিয়াহুর বিচারমন্ত্রী ইয়ারিভ লেভিন বিচারব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তনের পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। নেতানিয়াহুর বক্তব্য ছিল, তাঁর ভাষায় অতিসক্রিয় বিচারব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করা, সরকারের বিভিন্ন অঙ্গের মধ্যে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের আরও ক্ষমতা দেওয়ার জন্য এই সংস্কার প্রয়োজন।
পরিকল্পনার বিরোধীদের বক্তব্য ছিল, প্রস্তাবিত ব্যবস্থাগুলি সরকারের ক্ষমতার উপর নিয়ন্ত্রণ তুলে দেবে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠের একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা করবে। দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। কিছু ইজরায়েলি গৃহযুদ্ধের আশঙ্কাও করতে থাকেন। ইজরায়েলের নিরাপত্তা প্রধানদের বক্তব্য, তাঁরা বারবার সতর্ক করেছিলেন যে বিক্ষোভ ও সামাজিক বিভাজন শত্রুদের চোখে ইজরায়েলকে দুর্বল করে তুলছে এবং এর পরিণতি হবে যুদ্ধ।
নেতানিয়াহুর সমালোচকদের মতে, তিনি নিজের ব্যক্তিগত সমস্যা নিয়েই ক্রমশ মগ্ন হয়ে পড়েন। তাঁকে ঘিরে থাকে অনুগতদের ক্রমশ ছোট হয়ে আসা একটি বৃত্ত।
ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির ইজরায়েলে কর্মরত গবেষক এহুদ ইয়ারি বলেন, “তিনি অবশ্যই নানা ক্ষমতাসম্পন্ন একজন মানুষ ছিলেন। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ, তাঁর একটি বিস্তারিত কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি ছিল।” আফ্রিকার দেশগুলির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে চুক্তির পরিধি বাড়ানো ছিল তাঁর লক্ষ্যগুলির মধ্যে।
ইয়ারি বলেন, “কিন্তু বড় লক্ষ্যগুলিতে মন দেওয়ার বদলে তিনি নিজের ব্যক্তিগত যুদ্ধ শুরু করলেন। এ ছিলেন অন্য এক নেতানিয়াহু, যাঁর অগ্রাধিকারও আলাদা। তাঁর মনোযোগ অন্য দিকে সরে গেল।”
জোট বাঁচিয়ে রাখার তাগিদ
বছরের পর বছর ধরে নেতানিয়াহু মধ্যপন্থী উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। উদ্দেশ্য ছিল প্যালেস্তিনীয়দের পাশ কাটানো অথবা ভূখণ্ডের প্রশ্নে আরও বেশি আপস করতে তাঁদের উপর চাপ সৃষ্টি করা। ২০২০ সালের আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে মরক্কো, বাহরাইন এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহির সঙ্গে ইজরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার পর সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে তাঁর লক্ষ্য ছিল সৌদি আরব।
কিন্তু সৌদি সরকারের দাবি মেনে ভবিষ্যতে প্যালেস্তিনীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দিকে এগোনোর কোনও পথ প্রস্তাব করতে তাঁকে বাধা দেন তাঁর অতিদক্ষিণপন্থী জোটসঙ্গীরা। অতীতে অন্তত মুখে হলেও সামরিক বাহিনীহীন একটি প্যালেস্তিনীয় রাষ্ট্রের ধারণাকে সমর্থন জানিয়েছিলেন নেতানিয়াহু।
জেরুসালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী গেইল তালশির বলেন, “নিজের জোট বাঁচিয়ে রাখতে সেটাও ছেড়ে দিলেন তিনি।”
তার বদলে তাঁর সরকারের যে সদস্যেরা শেষ পর্যন্ত পশ্চিম তীরকে ইজরায়েলের সঙ্গে যুক্ত করে নিতে চান, তাঁদের সঙ্গে একই তালে এগিয়েছেন তিনি। পশ্চিম তীরে তাঁর নীতি এবং প্যালেস্তিনীয়দের বিরুদ্ধে ইজরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের ক্রমবর্ধমান হিংসা মোকাবিলায় তাঁর ব্যর্থতা—দুই মিলিয়ে সম্প্রতি কয়েকটি দেশের নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্তে ভূমিকা রেখেছে। এই দেশগুলি এক সময় ইজরায়েলের সবচেয়ে দৃঢ় মিত্রদের মধ্যে ছিল।
নেতানিয়াহু-সহ একাধিক ইজরায়েলি নেতার প্রাক্তন সহকারী শালোম লিপনার বলেন, “আমরা সকলেই ভাবি, তাঁর মাথায় এখন কী চলছে, ব্যক্তিগত মূল্যবোধের জায়গাটাই বা কোথায়।” তিনি যোগ করেন, “চেয়ারে টিকে থাকার জন্য তাঁকে অবস্থান বদলাতে দেখেছি আমরা।”