বাংলাস্ফিয়ার: অ্যালিস শেফার্ড নামে যক্ষ্মায় আক্রান্ত এক তরুণী কি ‘অলিভার টুইস্ট’ লেখার প্রেরণা জুগিয়েছিলেন? এক ইতিহাসবিদ এখন সেই প্রশ্নই তুলছেন। ভিক্টোরীয় যুগের লন্ডনের এক কুখ্যাত ওয়ার্কহাউসে বন্দি এক বাস্তবের দরিদ্র নারীর ওপর নেমে আসা নিষ্ঠুরতার সঙ্গে চার্লস ডিকেন্সের কাল্পনিক অনাথ বালকের অভিজ্ঞতার মিল খুঁজে পেয়েছেন তিনি। ওয়ার্কহাউস ছিল এমন এক প্রতিষ্ঠান, যেখানে নিঃস্ব মানুষদের আশ্রয় ও খাবারের বিনিময়ে কঠোর নিয়মানুবর্তিতার মধ্যে কাজ করতে হত।

ডিকেন্সকে নিয়ে নতুন একটি বইয়ের গবেষণা করতে গিয়ে ইতিহাসবিদ টেরেসা মাসগ্রোভ ১৮৩৬ সালের সংবাদপত্রে অ্যালিস শেফার্ড সম্পর্কে কয়েকটি প্রতিবেদন খুঁজে পান। সেগুলি থেকে জানা যায়, হেন্ডনের একটি ওয়ার্কহাউসে অ্যালিসকে অনাহার ও নির্জন কারাবাসের শাস্তি সহ্য করতে হয়েছিল। তাঁর অপরাধ—একটু হাঁটতে বেরোনোর অনুমতি চাওয়ার সাহস দেখিয়েছিলেন তিনি। সে জন্যই এক ম্যাজিস্ট্রেট তাঁকে শাস্তি দেওয়ার নির্দেশ দেন।

১৮৩৭ থেকে ১৮৩৯ সালের মধ্যে মাসিক কিস্তিতে প্রকাশিত তাঁর ধ্রুপদি উপন্যাসে ডিকেন্স লিখেছিলেন, ন’বছরের অলিভারকে এক ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করে একটি ‘অন্ধকার ও নির্জন ঘরে’ আটকে রাখা হয়েছিল। কারণ, সে আরও একবার পাতলা জাউ চাওয়ার দুঃসাহস দেখিয়েছিল। তার সেই মর্মস্পর্শী আবেদন ছিল: ‘দয়া করে, স্যার, আমি আর একটু চাই।’

ক্ষুধার্ত শিশুটিকে এক সপ্তাহ আটকে রাখা হয়। ডিকেন্স লিখেছিলেন: ‘অলিভার ছিল ধারাবাহিক ও পরিকল্পিত বিশ্বাসঘাতকতা এবং প্রতারণার শিকার।’

অ্যালিস শেফার্ড ‘অত্যন্ত উত্তেজিত অবস্থায়’ থাকায় তাঁকে ‘স্ট্রেটজ্যাকেট’ পরানো হয়েছিল—এমন এক পোশাক, যা হাত ও শরীরের নড়াচড়া আটকে দেয়। হেন্ডনের পুরনো ওয়ার্কহাউসের পরিচালনা তদারকির দায়িত্বে থাকা স্থানীয় অভিভাবক পর্ষদের সভাপতি এবং ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে রেভারেন্ড থিয়োডোর উইলিয়ামস তাঁর এই ‘জঘন্য আচরণের’ জন্য শাস্তির সুপারিশ করেন।

অ্যালিসকে ২৪ ঘণ্টা নির্জন কক্ষে আটকে রাখা হয়। আর পর্ষদের পরবর্তী বৈঠক পর্যন্ত শুধু রুটি ও জল খাইয়ে কার্যত অভুক্ত রাখা হয় তাঁকে। ওই পর্ষদের বৈঠক বসত দু’সপ্তাহ অন্তর।

ওয়ার্কহাউসের অভিভাবক পর্ষদের সদস্য আর এক স্থানীয় ম্যাজিস্ট্রেট তাঁকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সফল হননি। তাঁর যুক্তি ছিল, ‘এমন এক রোগা, ক্ষীণকায় মহিলা, যাঁকে দেখে মনে হচ্ছে তিনি যক্ষ্মায় ভুগছেন… তাঁর ওপর এমন শাস্তি চাপানো একেবারেই উচিত হয়নি।’

মাসগ্রোভ গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘তাঁর শাস্তির প্রতিবেদনটি পড়লে মনে হয়, আরও খাবার চাওয়ার পরে অলিভার টুইস্টকে যে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল, প্রায় শব্দে শব্দে যেন তারই বর্ণনা পড়ছি।’

তিনি বলেন, ‘আরও খাবার চাওয়ার “ধৃষ্টতা” দেখানোয় অলিভার টুইস্টের প্রতি যে প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছিল, তা হয়তো অ্যালিসের একটু হাঁটতে বেরোতে চাওয়ার সাহসেরই প্রতিধ্বনি। একটি যুক্তিসংগত অনুরোধের জবাব এসেছিল প্রচণ্ড ক্রোধের মধ্য দিয়ে। যাঁরা এমন প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন, তাঁদের কাজই ছিল অভিভাবক পর্ষদের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব বজায় রাখা। সেই পর্ষদের দয়াতেই “সাহায্য পাওয়ার অযোগ্য” বলে গণ্য দরিদ্ররা এমন হতাশাময় জীবনটুকু টিকিয়ে রাখার উপকরণ পেতেন।’

তাঁর এই গবেষণা স্থান পেয়েছে নতুন বই ‘চার্লস ডিকেন্স অ্যান্ড হিজ হিডেন ফ্যামিলি হিস্ট্রি’-তে। পেন অ্যান্ড সোর্ড বুকস থেকে বইটি এই সপ্তাহে প্রকাশিত হচ্ছে।

বইয়ে তিনি লিখেছেন, ‘অলিভার ও অ্যালিস—দু’জনকেই নির্জন কারাবাসের শাস্তি দেওয়া হয়েছিল। অথচ আমরা জানতে পারি, প্যারিশের আশ্রিত বালকটির শাস্তিকে নাকি ততটা খারাপ বলা যায় না, কারণ তাকে পাথর-বাঁধানো উঠোনে বেরিয়ে পাম্পের জলে গা ধোয়ার অনুমতি দেওয়া হত। ঠিক তেমনই রেভারেন্ড উইলিয়ামস বলেছিলেন… অ্যালিস শেফার্ডকে নির্জন কারাবাসে রেখে অনাহারে রাখার জন্য যে ঘরটি নির্দিষ্ট করা হয়েছিল, “সেখান থেকে সেই উঠোনটি দেখা যেত, যেখানে অন্য সব নিঃস্ব বাসিন্দা থাকতেন। অতএব, শাস্তিটি খুব কঠোর ছিল না।”’

মাসগ্রোভ আরও লিখেছেন, ‘এই ঘটনা সংবাদপত্রে প্রকাশিত হওয়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই, জানুয়ারির মাঝামাঝি, ডিকেন্স তাঁর প্রকাশক বেন্টলিকে চিঠিতে জানাচ্ছিলেন, তিনি “দারুণ একটা ভাবনা পেয়েছেন, যা ক্রুকশ্যাঙ্কের প্রতিভাকেও ফুটিয়ে তুলবে”। অর্থাৎ, অলিভার টুইস্টের সৃষ্টি শুরু হয়ে গিয়েছিল। বস্তুত, ১৮৩৭ সালের ফেব্রুয়ারিতেই উপন্যাসের প্রথম অধ্যায়গুলি প্রকাশিত হয়, সঙ্গে ছিল জর্জ ক্রুকশ্যাঙ্কের তীব্র, স্পষ্ট ও মর্মভেদী চিত্রায়ণ।’

মাসগ্রোভ উল্লেখ করেছেন, বর্তমানে লন্ডনের বারনেট বরোর অন্তর্গত হেন্ডন অঞ্চলটি ডিকেন্সের পরিচিত ছিল। তাঁর কথায়, ‘উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, অলিভার টুইস্টে হেন্ডন ও বারনেটের উল্লেখ রয়েছে… তবে তাঁর চিঠিপত্র এবং সাংবাদিকতার লেখাতেও আরও নানা উল্লেখ পাওয়া যায়, যা থেকে বোঝা যায়, হেন্ডন সম্পর্কে তাঁর জানাশোনা ছিল এবং জায়গাটির প্রতি অনুরাগও ছিল। শহর থেকে হেঁটে বা ঘোড়ায় চড়ে সেখানে যাওয়া যেত। গ্রাম ও চাষের জমিতে ঘেরা এক শান্ত প্রান্তর ছিল সেটি।’

তিনি বলেন, ‘অলিভার টুইস্টের শেষের দিকের অংশে ন্যান্সিকে নৃশংসভাবে হত্যা করার পরে বিল সাইকস পালিয়ে বেড়ায়… খোলা আকাশের নীচে রাত কাটিয়ে সাইকস হেন্ডনের দিকে রওনা দেয়। কিন্তু সেখানকার মানুষজন তাকে সন্দেহ করছে বলে মনে হওয়ায় সে আবার হিথের দিকে ফিরে যায়।’

‘অলিভার টুইস্ট’ ভিক্টোরীয় ব্রিটেনে দারিদ্র্যের নির্মম বাস্তবতা উন্মোচন করেছিল। ডিকেন্স হয়ে উঠেছিলেন সমাজসংস্কারের এক অক্লান্ত প্রবক্তা। নিজের শৈশবের অভিজ্ঞতাই তাঁকে গভীরভাবে ক্ষতবিক্ষত করেছিল। ঋণ শোধ করতে না পারায় তাঁর বাবাকে ঋণখেলাপিদের কারাগারে বন্দি করা হয়। আর প্রায় ১২ বছর বয়সে ডিকেন্সকে জুতো পালিশের কালি তৈরির একটি কারখানায় কাজে পাঠানো হয়েছিল।

বেলফাস্টের কুইন্স ইউনিভার্সিটির ভিক্টোরীয় যুগের অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক এবং বিশিষ্ট ডিকেন্স-বিশেষজ্ঞ লিয়ন লিটভ্যাক বলেন, অ্যালিস শেফার্ডের ঘটনা ডিকেন্সকে অনুপ্রাণিত করে থাকতে পারে—এমন সম্ভাবনা ‘পুরোপুরি যুক্তিসংগত’। সংবাদপত্রের প্রতিবেদন ছিল সেই ‘নানাবিধ প্রভাবের সমাহারের’ অংশ, ‘যা তাঁর কল্পনাকে উসকে দিত এবং পরিশেষে একটি সুসংবদ্ধ আখ্যানের রূপ পেত’। বিশেষ করে তাঁর সাহিত্যজীবনের প্রথম দিকে এমনটি ঘটত।

লিটভ্যাক আরও বলেন, ‘ঔপন্যাসিক হওয়ার আগে ডিকেন্স ছিলেন সাংবাদিক। তাই পাঠকের মনে আলোড়ন তোলার ক্ষমতা সম্পর্কে তিনি খুবই সচেতন ছিলেন। ওয়ার্কহাউস নিয়ে তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। আর সেখানে নির্দিষ্ট নির্যাতনের ঘটনা নিয়ে সংবাদপত্রে কী প্রকাশিত হচ্ছে, সে সম্পর্কেও তিনি ওয়াকিবহাল ছিলেন।