অন্যায়কারী পুরুষদের শাস্তি দিতে নেমেছে দুই তরুণী। খুন করতেও তাদের বিবেকে বাধে না, আর নিজেদের কীর্তিকলাপ নিয়ে রসবোধও যথেষ্ট তীক্ষ্ণ—এমনকি কখনও কখনও সেই রসবোধ তাদের অপরাধকেও ছাপিয়ে যায়। কেটি ব্রেন্টের নতুন উপন্যাস ‘টু অল দ্য মেন আই’ভ কিল্ড বিফোর’ এমনই এক ঝরঝরে থ্রিলার, যেখানে নারীর ক্রোধ, রক্তপাত আর অন্ধকার হাস্যরস মিলেমিশে একাকার। জনপ্রিয় কিটি কলিন্স ত্রয়ীর এটি তৃতীয় বই।
এর আগের দুটি উপন্যাস ‘হাউ টু কিল মেন অ্যান্ড গেট অ্যাওয়ে উইথ ইট’ এবং ‘আই বেট ইউ’ড লুক গুড ইন আ কফিন’। সিরিজের কেন্দ্রীয় চরিত্র কিটি কলিন্স লন্ডনের অভিজাত সমাজের পরিচিত মুখ। একটি ক্লাব থেকে বেরোনোর পর তাকে অনুসরণ করতে থাকা এক পুরুষকে খুন করার মধ্য দিয়ে হত্যার প্রতি তার আকর্ষণের শুরু। তারপর একের পর এক নারীবিদ্বেষী পুরুষকে খুন করতে থাকে সে। তৃতীয় উপন্যাসে কিটির ঠিকানা লস অ্যাঞ্জেলেস। তবে এবার সে একা নয়।
হিংসার মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার এই অভিযানে কিটির সঙ্গী তার সৎবোন আঁতোয়ানেত। পুরুষদের খুন করার প্রশ্নে সে কিটির চেয়েও বেশি বেপরোয়া। লস অ্যাঞ্জেলেস বিমানবন্দরে এক ব্যক্তি তাকে উদ্দেশ করে অশালীন শিস দিতেই লোকটির ছবি তুলে তার ঠিকানা খুঁজতে শুরু করে সে। উদ্দেশ্য, তাকে খুন করা। কিটি তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলে আঁতোয়ানেত বলে, “এই ব্যাপারগুলোই তো, কিটি—রোজকার হেনস্তা, শিস দেওয়া, মেয়েদের চরিত্র নিয়ে কুৎসা—বাকি সব কিছুর ভিত তৈরি করে। এসবই পুরুষদের ভাবতে শেখায়, আরও বড় অন্যায় করেও তারা পার পেয়ে যাবে।”
দুই বোনের লক্ষ্য আইডান ওয়ার্ড। সে কিটির সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু টরের প্রাক্তন সঙ্গী, এমনকি একসময় তার থেরাপিস্টও ছিল। আইডানের ভয়াবহ নির্যাতনের জেরে টর কোমায় চলে যায়। কিটি জানতে পারে, আইডান আমেরিকায় পালিয়েছে। তার কৃতকর্মের মূল্য তাকে চোকাতে বাধ্য করতে দুই বোনও আর দেরি করে না—আমেরিকায় গিয়ে ঘাঁটি গাড়ে।
কিটির দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই এগিয়ে চলে কাহিনি। আর সেখানেই রয়েছে উপন্যাসের অন্যতম আকর্ষণ। কিটি একই সঙ্গে দু’টি জীবন সামলায়। একদিকে সে ঠান্ডা মাথার ধারাবাহিক খুনি, অন্যদিকে মন ভালো করতে কেনাকাটা করা, চায়ে চুমুক দেওয়া কিংবা শরীরচর্চা শেষ করার চিন্তায় মগ্ন এক সাধারণ মেয়ে। এই দুই সত্তার পাশাপাশি অবস্থান বেশ চমকপ্রদ। দেখতে আর পাঁচটা মেয়ের মতো হলেও কিটি যে আদৌ সাধারণ নয়, তা বারবার মনে করিয়ে দেয় গল্প।
অন্য থ্রিলারে প্রায়ই দেখা যায় রুক্ষ, নিঃসঙ্গ, সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন এমন সব স্বঘোষিত বিচারককে, যাঁদের জীবন অভাব আর সংগ্রামে ভরা। সেই পরিচিত ছক থেকে বেরিয়ে কিটি ও আঁতোয়ানেতের ঝলমলে, আরামপ্রিয় জগৎ বেশ সতেজ লাগে। অন্ধকার বিষয়বস্তু সত্ত্বেও উপন্যাসটির পটভূমি ও চরিত্রদের জীবনযাপন উজ্জ্বল, গ্ল্যামারময়।
বরাবরের মতোই ব্রেন্টের লেখার গতি দ্রুত, বয়ান সাবলীল। প্রায় ৩৩০ পাতার বইটি ছোট ছোট অধ্যায়ে ভাগ করা। সরাসরি বর্ণনা আর ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গির কারণে একের পর এক অধ্যায় পড়ে ফেলা সহজ। সমকালীন নানা সমস্যাকে লেখিকা হাস্যরসের মোড়কে তুলে ধরেন। কিটির মনস্তত্ত্ব, তার কাজের পিছনে থাকা যুক্তি এবং আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে তার বিচারের পদ্ধতি—সবই পাঠকের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
রক্তাক্ত নৃশংসতার বর্ণনার সঙ্গেও ব্রেন্ট অনায়াসে জুড়ে দেন অন্ধকার কৌতুক। এই বৈপরীত্য কারও কারও কাছে অসংবেদনশীল মনে হতে পারে। তবে আমাদের কাছে তা উপন্যাসটির অন্যতম শক্তি। হাস্যরস হিংসার গুরুত্ব কমিয়ে দেয় না; বরং দুই বোনের বিকৃত মানসিকতার দিকটি আরও স্পষ্ট করে তোলে।
লেখার সুর হালকা হলেও নারীদের সমস্যাগুলিকে ব্রেন্ট মোটেই হালকাভাবে দেখেন না। লিঙ্গবৈষম্য, রাস্তাঘাটে অশালীন মন্তব্য এবং নিত্যদিনের হেনস্তার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি পৌঁছে যান নারীর বিরুদ্ধে আরও গুরুতর হিংসা, ধর্ষণ ও খুনের প্রসঙ্গে। এই ধারাবাহিকতায় নারী চরিত্রগুলির জমে থাকা ক্রোধের সামাজিক ভিত্তি তৈরি হয়। পাঠক তাদের পদ্ধতির সঙ্গে একমত না হলেও, সেই ক্রোধ কোথা থেকে জন্ম নিচ্ছে, তা বুঝতে পারেন।
তবে বইটি একেবারে ত্রুটিমুক্ত নয়। কিছু পার্শ্বকাহিনি প্রয়োজনের তুলনায় দ্রুত এগিয়ে যায়। কয়েকটি চরিত্রের আগমন ঘটে, কিন্তু প্রত্যাশিত প্রভাব তৈরি হওয়ার আগেই তারা গল্প থেকে হারিয়ে যায়। রহস্যের দিকটিও তুলনায় দুর্বল। যাঁরা আগের দুটি বই পড়েননি, তাঁরাও এই উপন্যাস পড়তে পারবেন, কারণ লেখিকা আগের ঘটনাগুলির প্রয়োজনীয় প্রেক্ষাপট বুঝিয়ে দেন। তবু আমাদের পরামর্শ, ত্রয়ীটি ক্রমানুসারেই পড়ুন।
‘টু অল দ্য মেন আই’ভ কিল্ড বিফোর’ এমন কোনও থ্রিলার নয়, যেখানে ধীরে ধীরে রহস্য ঘনীভূত হবে আর প্রতিটি বাঁকে অপেক্ষা করবে নতুন চমক। বরং এটি সহজপাঠ্য, দ্রুতগতির এক কাহিনি—যেখানে রক্তপাতের অভাব নেই, আর নায়িকার কাণ্ডকারখানা ও ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য পাঠককে আটকে রাখে। ভারী, গম্ভীর বই পড়ার ফাঁকে স্বাদবদলের জন্য এটি বেশ উপযুক্ত।
আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে অন্যায়ের প্রতিশোধ নেওয়ার গল্পের সঙ্গে যদি গ্ল্যামার, রক্তপাত আর খানিক হাস্যরসও চান, তা হলে বইটি আপনার পছন্দ হতে পারে। এমন নয় যে পড়তে বসে রাত কাবার হয়ে যাবে, কিংবা প্রতিটি পাতায় উত্তেজনায় দম বন্ধ হয়ে আসবে। কিন্তু মুখে হাসি ফুটবে বারবার, কখনও হয়তো জোরে হেসেও উঠবেন—বিশেষত আপনি যদি নারী হন। আর সেই আনন্দেরও কম মূল্য নেই।