কাজিরাঙা জাতীয় উদ্যানের কাছে প্রস্তাবিত বিলাসবহুল হোটেল প্রকল্পের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় জাতীয় নিরাপত্তা আইন বা এনএসএ-তে আটক করা হয়েছিল ভূমি-অধিকার কর্মী প্রণব দোলেকে। শুক্রবার, ৬ নভেম্বর গৌহাটি হাই কোর্ট তাঁর আটকাদেশ খারিজ করায় ১১৭ দিন হেফাজতে কাটানোর পরে মুক্তি পেতে চলেছেন তিনি।

বিচারপতি কল্যাণ রাই সুরানা ও বিচারপতি সুস্মিতা ফুকন খাউন্দের বেঞ্চ রায়ে বলেছে, “আবেদনকারীর কার্যকলাপ মোকাবিলায় দেশের সাধারণ আইনগুলি অপর্যাপ্ত ছিল কি না, আটককারী কর্তৃপক্ষ অর্থাৎ অসম সরকার তা বিবেচনাই করেনি।”

৪০ বছরের দোলে বৃহত্তর কাজিরাঙা ভূমি ও মানবাধিকার কমিটির আহ্বায়ক। প্রস্তাবিত প্রকল্পটির সম্ভাব্য প্রভাব এবং তার জন্য আদিবাসী গ্রামবাসীদের উচ্ছেদের আশঙ্কা নিয়ে বেশ কয়েক বছর ধরে সরব তিনি। ২০২২ সাল থেকে গোলাঘাটের আদিবাসী বাসিন্দারা প্রকল্পটির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছেন। জমি জোর করে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ জানিয়ে তাঁরা গৌহাটি হাই কোর্টেও গিয়েছেন।

পুরনো মামলা ও বিদেশ সফর নিয়ে আদালতের প্রশ্ন

আটকাদেশ খারিজ করতে গিয়ে হাই কোর্ট জানিয়েছে, পুরনো, প্রাসঙ্গিকতা হারানো ফৌজদারি মামলার ভিত্তিতে এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। রাজ্য সরকার যে ১৩টি মামলার উপরে নির্ভর করেছিল, তার মধ্যে ন’টিতেই দোলে ইতিমধ্যে খালাস পেয়েছেন। আদালত বলেছে, “মাত্র তিনটি কার্যধারা চালু ছিল এবং একটি মামলা সাক্ষ্যগ্রহণের পর্যায়ে রয়েছে।”

রায়ে বলা হয়েছে, “দেখা যাচ্ছে, আবেদনকারীকে এমন সব পুরনো মামলার ভিত্তিতে আটক করা হয়েছে, যেগুলির মধ্যে এমন মামলাও রয়েছে যেখানে তিনি অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন বা খালাস হয়েছেন। এই মামলার পরিস্থিতিতে তাই একটিই সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায়: আটকের সুপারিশকারী কর্তৃপক্ষ এবং আটককারী কর্তৃপক্ষ আটকাদেশ জারি করে আবেদনকারীকে আটকে রাখার একটি শর্টকাট পথ বেছে নিয়েছে।”

আটকাদেশে দোলের বিদেশ সফরের উল্লেখ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে আদালত। হাই কোর্ট জানিয়েছে, তাঁর কোনও “ভারতবিরোধী কার্যকলাপের বিস্তারিত বিবরণ” রাজ্য সরকার দেয়নি।

আদালতের কথায়, “বারবার বিদেশ সফর করাটাই এমন কোনও কাজ নয়, যার জন্য কাউকে প্রতিরোধমূলকভাবে আটক করা যায় এবং নিজের পছন্দের দেশে যাওয়ার মৌলিক অধিকার খর্ব করা যায়।”

রায়ে আরও বলা হয়েছে, “বিদেশ সফর এবং সন্দেহজনকভাবে বৈদেশিক মুদ্রা পাওয়ার অস্পষ্ট অভিযোগ ছাড়া, আটকের কারণের সঙ্গে আবেদনকারীকে এমন কোনও তথ্যপ্রমাণ দেওয়া হয়নি, যা দেখায় তাঁর বিদেশ সফর ও বৈদেশিক মুদ্রা গ্রহণ কীভাবে রাষ্ট্রের স্বার্থ, নিরাপত্তা ও অখণ্ডতার পক্ষে ক্ষতিকর কার্যকলাপ, অথবা কীভাবে তা জনশৃঙ্খলার ক্ষতি করেছে।”

দোলের বিরুদ্ধে রাস্তা অবরোধ এবং সরকারি সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতিতে জড়িত থাকার অভিযোগও আনা হয়েছিল। কিন্তু সেই কথিত অপরাধগুলির কোনও বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয়নি বলে উল্লেখ করেছে হাই কোর্ট।

আদালত বলেছে, “সুতরাং, আবেদনকারীর বিরুদ্ধে অভিযোগগুলি অস্পষ্ট এবং প্রয়োজনীয় সুনির্দিষ্ট তথ্যবিবরণহীন।”

দোলের হয়ে সওয়াল করা প্রবীণ আইনজীবী শান্তনু বরঠাকুর সংবাদমাধ্যমকে জানান, আটকের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রাসঙ্গিক নথি দোলেকে দিতে রাজ্য সরকারের ব্যর্থতাও আটকাদেশ খারিজ করার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে হাই কোর্ট।

জামিনের পরদিনই এনএসএ

প্রতিবাদ-বিক্ষোভের ঘটনায় গত ১২ জুলাই গোলাঘাট পুলিশ দোলেকে গ্রেফতার করেছিল। আদিবাসী ও ভূমি-অধিকার আন্দোলনের পরিচিত এই কর্মীকে ২৯ জুলাই স্থানীয় আদালত জামিন দেয়। কিন্তু তার পরের দিনই অসম সরকার তাঁর বিরুদ্ধে এনএসএ প্রয়োগ করে। সরকারের বক্তব্য ছিল, তাঁর কার্যকলাপ “জনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং রাজ্যের নিরাপত্তার পক্ষে ক্ষতিকর”।

জামিনের নির্দেশে গোলাঘাটের এক অতিরিক্ত দায়রা বিচারক পর্যবেক্ষণ করেছিলেন, ভিডিও ফুটেজে “কর্তব্যরত পুলিশকর্মীদের উপরে বিক্ষোভকারীদের সরাসরি হামলার প্রমাণ” মেলেনি। বিচারক আরও বলেছিলেন, পুলিশ অভিযোগ করলেও তদন্ত চলাকালীন তদন্তকারী অফিসার কোনও “প্রাণঘাতী অস্ত্র” বাজেয়াপ্ত করেননি।

আটকাদেশের বিরুদ্ধে দোলের আবেদনের রায় ১৪ অক্টোবর সংরক্ষিত রেখেছিল হাই কোর্ট। আটকের পরে ৬০টিরও বেশি গণ-আন্দোলন, শ্রমিক সংগঠন ও নাগরিক অধিকার গোষ্ঠী যৌথ বিবৃতিতে এনএসএ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছিল। কংগ্রেসও রাজ্য সরকারের সমালোচনা করে বলেছিল, সরকার আদালতের জামিনকে এড়িয়ে গিয়েছে। শুক্রবারের রায়ের পরে রাজ্য সরকারের কোনও প্রতিক্রিয়া এখনও পাওয়া যায়নি।