বাংলাস্ফিয়ার: কলকাতার কালীঘাটে নিজের বাসভবনের সামনে পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ছুরি নিয়ে হামলার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর সন্ধ্যার এই ঘটনা নিয়ে পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ জানিয়েছে তাঁর দল মমতা এআইটিসি। পুলিশ জানিয়েছে, অনুসূয়া সাহা নামে ৩৮ বছরের এক মহিলাকে আটক করা হয়েছে। তিনি সিভিক ভলান্টিয়ার বলে পরিচিত। তবে ছুরি দিয়ে হামলার অভিযোগ পুলিশ নিশ্চিত করেনি।
সাংসদ দোলা সেনের অভিযোগ অনুযায়ী, সন্ধ্যা ছ’টা নাগাদ পাড়ার একটি দুর্গাপুজোর মণ্ডপ থেকে ফিরছিলেন মমতা। সেই সময় ওই মহিলা আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে তাঁর দিকে এগিয়ে আসেন। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, মহিলার হাতে ছুরি ছিল এবং তিনি মমতাকে আঘাত করার চেষ্টা করেন। এই অভিযোগের ভিত্তিতেই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও যথাযথ আইনি পদক্ষেপ দাবি করেছেন দোলা।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, ওই মহিলা নিজেকে মমতার ভাগ্নি বলে দাবি করছিলেন। তিনি অশালীন ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং নেশাগ্রস্ত অবস্থায় প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর দিকে তেড়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ। এমনকি রাস্তায় শুয়ে পড়ার কথাও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তাঁর আত্মীয়তার দাবি কিংবা নেশাগ্রস্ত থাকার অভিযোগের সত্যতা পুলিশের প্রকাশিত বক্তব্যে নিশ্চিত করা হয়নি।
মমতা জেড-প্লাস নিরাপত্তা পান। সেই অবস্থায় অস্ত্র বহনকারী কেউ কীভাবে তাঁর বাড়ির প্রবেশপথ পর্যন্ত পৌঁছতে পারেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন দোলা। তাঁর অভিযোগ, বিষয়টি কেবল একজন মহিলার আচরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে দেখা উচিত নয়; এর পিছনে বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তবে ষড়যন্ত্রের দাবির সমর্থনে পুলিশের কোনও সিদ্ধান্ত প্রকাশিত হয়নি।
অভিযোগের সঙ্গে কয়েকটি ছবি ও ভিডিও জমা দেওয়া হয়েছে বলে দোলা জানিয়েছেন। সেগুলি পরীক্ষা করে পদক্ষেপ করার আবেদন জানানো হয়েছে পুলিশকে। ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৭৩ ধারা অনুযায়ী অভিযোগটি নথিভুক্ত করার অনুরোধও রয়েছে চিঠিতে। লিখিত অভিযোগের পাশাপাশি দৃশ্যগত উপাদানগুলিও বিবেচনায় নেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে। তবে জমা দেওয়া ছবি ও ভিডিও সম্পর্কে পুলিশের বিস্তারিত মূল্যায়ন ওই প্রতিবেদনে নেই।
কলকাতা পুলিশের এক উচ্চপদস্থ আধিকারিকের বক্তব্য অবশ্য অভিযোগপত্রের বিবরণ থেকে কিছুটা আলাদা। তিনি জানিয়েছেন, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় অনুসূয়া সাহা তাঁর সামনে এসে দাঁড়ান এবং উত্তপ্ত বাকবিতণ্ডা হয়। কর্তব্যরত পুলিশকর্মীরা পরে মহিলাকে আটক করেন। দলীয় প্রতিনিধিদের অভিযোগ পাওয়ার কথা জানিয়ে ওই আধিকারিক বলেছেন, আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
ফলে ঘটনার মুহূর্তে মমতা কোথা থেকে কোথায় যাচ্ছিলেন, সেই বিবরণেও অমিল রয়েছে। দোলার অভিযোগে পুজোমণ্ডপ থেকে ফেরার কথা থাকলেও পুলিশ জানিয়েছে, তিনি বাড়ি থেকে বেরোচ্ছিলেন। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হল, পুলিশের বক্তব্যে বাকবিতণ্ডার উল্লেখ থাকলেও ছুরি দিয়ে আক্রমণের দাবি সমর্থন করা হয়নি। অভিযোগ ও পুলিশের নিশ্চিত করা তথ্য তাই এখনও এক নয়।
ঘটনাটি নিয়ে রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন দলের সাংসদ সাকেত গোখলে। তাঁর বক্তব্য, তিনবারের মুখ্যমন্ত্রী এবং জেড-প্লাস নিরাপত্তাপ্রাপ্ত একজন নেত্রীও নিরাপদ না থাকলে রাজ্যের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বিজেপির পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের সম্ভাবনার কথাও তুলেছেন তিনি। দিল্লিতে মমতার রাজনৈতিক তৎপরতার সঙ্গে ঘটনাটির সম্পর্ক আছে কি না, সেই প্রশ্ন করেছেন গোখলে। তবে এটি তাঁর রাজনৈতিক অভিযোগ, প্রতিষ্ঠিত তদন্ত-তথ্য নয়।
আটক মহিলার নাম নিয়েও প্রকাশিত বিবরণে পার্থক্য রয়েছে। একটি সংবাদ সংস্থা পুলিশের সূত্রে অনুসূয়া সাহা নাম জানিয়েছে। অন্যদিকে, অপর একটি সংবাদসংস্থার প্রতিবেদনে অভিযোগপত্রের উল্লেখ করে তন্নিষ্ঠা সাহা নাম লেখা হয়েছে। এই অমিলের ব্যাখ্যা প্রকাশিত প্রতিবেদনে নেই। মহিলার পরিচয়, তাঁর হাতে ছুরি ছিল কি না এবং তিনি ঠিক কী করেছিলেন—এসব নির্ধারণে পুলিশের বিস্তারিত বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। আপাতত এক মহিলাকে আটক করার বিষয়টি নিশ্চিত; ছুরি নিয়ে হামলার চেষ্টা ও বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের দাবি অভিযোগ হিসেবেই রয়েছে।