লগইনসদস্যতালেখক
হোম›ভারত›পশ্চিমবঙ্গ›মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে নতুন গতি, ভাঙনের আরও কাছে তৃণমূল
পশ্চিমবঙ্গ

মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে নতুন গতি, ভাঙনের আরও কাছে তৃণমূল

হাইলাইটস: তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ২০। আরও কয়েকজন সাংসদের যোগদানের সম্ভাবনা নিয়ে জোর জল্পনা। বিদ্রোহী গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা বিজেপি নেতৃত্বের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছেন। লোকসভায় আলাদা গোষ্ঠী বা দলভাঙার…

মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে নতুন গতি, ভাঙনের আরও কাছে তৃণমূল

হাইলাইটস:

  • তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ২০।
  • আরও কয়েকজন সাংসদের যোগদানের সম্ভাবনা নিয়ে জোর জল্পনা।
  • বিদ্রোহী গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা বিজেপি নেতৃত্বের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছেন।
  • লোকসভায় আলাদা গোষ্ঠী বা দলভাঙার সাংবিধানিক পথ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
  • মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্ব নিয়ে অসন্তোষই বিদ্রোহের প্রধান কারণ বলে দাবি শিবিরের।

বাংলাস্ফিয়ার: তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ সংকট এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে দলভাঙার সম্ভাবনা আর নিছক রাজনৈতিক জল্পনা নয়। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে যে অসন্তোষ চাপা আগুনের মতো জ্বলছিল, তা এখন প্রকাশ্য বিদ্রোহের রূপ নিতে শুরু করেছে। বিদ্রোহী শিবিরে এক প্রভাবশালী সাংসদের যোগদান সেই আগুনে নতুন করে ঘি ঢেলেছে। ফলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন দলটি এখন স্বাধীন ভারতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম বড় সাংগঠনিক সঙ্কটের মুখোমুখি।

সূত্রের খবর, বিদ্রোহী শিবিরের সাংসদ সংখ্যা এখন ২০-এ পৌঁছেছে। এই সংখ্যা নিছক পরিসংখ্যান নয়; এর রাজনৈতিক তাৎপর্য অনেক গভীর। কারণ লোকসভায় তৃণমূলের শক্তির একটি বড় অংশ যদি সংগঠিতভাবে আলাদা অবস্থান নেয়, তাহলে শুধু সংসদীয় রাজনীতিতেই নয়, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতেও তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে।

বিদ্রোহীদের দাবি, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পরও দলের শীর্ষ নেতৃত্ব আত্মসমালোচনার পথে হাঁটেনি। বরং পরাজয়ের কারণ নিয়ে খোলামেলা আলোচনার পরিবর্তে বিরোধী মতকে দমন করার চেষ্টা হয়েছে। এর ফলে বহু সাংসদ, বিধায়ক এবং জেলা স্তরের নেতা নিজেদের ক্রমশ কোণঠাসা মনে করছেন।

বিদ্রোহী শিবিরের নেতাদের বক্তব্য, তৃণমূল এখন আর সেই দল নেই যা একসময় বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে গণআন্দোলনের প্রতীক ছিল। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সীমিত কয়েকজনের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছে। সাংগঠনিক স্তরে মতবিনিময়ের সুযোগ কমেছে। দলের পুরনো নেতাদের গুরুত্ব কমেছে এবং নতুন এক ক্ষমতাকেন্দ্র তৈরি হয়েছে। এই অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বর্তমান সংকটের মূলেও রয়েছে নেতৃত্বের প্রশ্ন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখনও দলের সর্বজনগ্রাহ্য মুখ হলেও তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে দলের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরেই চাপা বিতর্ক ছিল। নির্বাচনী বিপর্যয়ের পরে সেই বিতর্ক প্রকাশ্যে চলে এসেছে।

এদিকে বিদ্রোহী সাংসদদের একটি প্রতিনিধিদল সম্প্রতি বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা করেছে বলে জানা গেছে। যদিও প্রকাশ্যে কেউ দলত্যাগের ঘোষণা দেননি, তবে রাজনৈতিক মহলে মনে করা হচ্ছে যে বিদ্রোহীরা এখন নিজেদের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে হিসাব-নিকাশ করছেন। তাদের সামনে দুটি পথ খোলা—একদিকে লোকসভায় আলাদা গোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি চাওয়া, অন্যদিকে সরাসরি বিজেপিতে যোগদান।

বিজেপিও পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। পশ্চিমবঙ্গে সদ্য ক্ষমতায় আসা বিজেপি নেতৃত্ব জানে, তৃণমূলের ভাঙন যত বাড়বে, রাজ্যে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান তত শক্তিশালী হবে। তাই প্রকাশ্যে সংযত অবস্থান নিলেও পর্দার আড়ালে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে বলেই রাজনৈতিক মহলের ধারণা।

বিদ্রোহী শিবিরের কৌশলও অত্যন্ত সতর্ক। তারা চাইছে নিজেদের পদক্ষেপকে ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার ফল হিসেবে নয়, বরং দলের গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের আন্দোলন হিসেবে তুলে ধরতে। সেই কারণেই এখনও পর্যন্ত প্রকাশ্য আক্রমণের পরিবর্তে সাংগঠনিক সংস্কারের প্রশ্নটিকেই সামনে রাখা হয়েছে।

তবে তৃণমূল নেতৃত্ব পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে পারছে। দলের একাংশ এখনও বিশ্বাস করে যে শেষ মুহূর্তে সমঝোতার সম্ভাবনা রয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বিদ্রোহীদের ফেরানোর চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু সেই প্রচেষ্টা কতটা সফল হবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।

কারণ বিদ্রোহী শিবিরের দাবি, এটি আর ব্যক্তিগত ক্ষোভের বিষয় নয়; এটি দলের ভবিষ্যৎ চরিত্র নিয়ে মতাদর্শগত সংঘাত। তারা মনে করছে, বর্তমান কাঠামো বজায় থাকলে তৃণমূলের পুনরুজ্জীবন সম্ভব নয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিদ্রোহী শিবিরের শক্তি শুধু সাংসদ সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। তাদের সঙ্গে বিভিন্ন জেলার সাংগঠনিক নেতাদেরও যোগাযোগ রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। যদি এই অসন্তোষ জেলা ও ব্লক স্তরে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে তৃণমূলের সাংগঠনিক ভিত্তিই নড়বড়ে হয়ে যেতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তৃণমূল দীর্ঘদিন ধরে ছিল একটি নেতা-কেন্দ্রিক দল। এই ধরনের দলে নেতৃত্বের প্রতি আস্থা কমে গেলে ভাঙনের গতি অত্যন্ত দ্রুত হতে পারে। বর্তমানে সেই ঝুঁকিই সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ।

অন্যদিকে বিজেপি চাইছে তৃণমূলের এই সঙ্কটকে দীর্ঘস্থায়ী করতে। কারণ বিরোধী শিবিরের বিভাজন যত গভীর হবে, ততই রাজ্যের নতুন সরকারকে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করার সুযোগ দেবে।

ফলে এখন প্রশ্ন একটাই—এটি কি সাময়িক বিদ্রোহ, নাকি তৃণমূল কংগ্রেসের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিভাজনের সূচনা? আগামী কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহই তার উত্তর দেবে। তবে এতটুকু স্পষ্ট যে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবনে এটি সম্ভবত সবচেয়ে কঠিন সাংগঠনিক লড়াই। আর সেই লড়াইয়ের ফল শুধু একটি দলের ভবিষ্যৎ নয়, পশ্চিমবঙ্গের আগামী রাজনৈতিক মানচিত্রও নির্ধারণ করতে পারে।

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক