বাংলাস্ফিয়ারঃ ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার ‘অনেকটাই কাছে’ পৌঁছে গিয়েছে আমেরিকা—এমনই ইঙ্গিত দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ভারতের সঙ্গে ‘একেবারে অন্য ধরনের’ একটি চুক্তির সম্ভাবনার কথাও বলেছেন তিনি। এক দিন আগে সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিও একই সুরে জানিয়েছিলেন, দুই দেশ চুক্তি স্বাক্ষরের ‘অবিশ্বাস্য রকম কাছে’ পৌঁছে গিয়েছে এবং কাজের ‘৯৯ শতাংশ’ সম্পূর্ণ হয়েছে।

২০২৫ সালের গোড়ায় ট্রাম্প প্রশাসন দ্বিতীয় বার ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভিয়েতনাম, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ব্রিটেন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষর করেছে আমেরিকা।

মঙ্গলবার রুবিও বলেন, “যে বিষয়গুলিতে এখনও মতপার্থক্য রয়েছে, সেগুলির বিস্তারিত আলোচনায় যেতে চাই না। শুধু এটুকু বলতে পারি, সেগুলি রয়েছে। এগুলিকে আমি নিছক কারিগরি বিষয় বলব না; মূলত ভাষা সংক্রান্ত বিষয়। নির্দিষ্ট কিছু শব্দ এবং বাক্যাংশের অর্থ কী হবে, বিষয়টি এখন মূলত সেখানেই এসে ঠেকেছে। কারণ, দু’পক্ষের মধ্যে সম্পূর্ণ মতৈক্য থাকা জরুরি। একটি চুক্তির অর্থ কী, তা নিয়ে দু’পক্ষকে একশো শতাংশ একমত হতে হবে। তা না হলে ভবিষ্যতে চুক্তি ভেঙে পড়তে পারে।”

তিনি আরও বলেন, “আমার মনে হয়, আমরা অবিশ্বাস্য রকম কাছে পৌঁছে গিয়েছি। আমি বিষয়টিকে এ ভাবে বলব—চুক্তি চূড়ান্ত করতে আর কয়েক সপ্তাহ লাগবে বলে মনে করি, কয়েক মাস নয়। আমার মনে হয়, ৯৯ শতাংশ কাজ হয়ে গিয়েছে। বাকি বিষয়টি হল, কাজ একশো শতাংশ সম্পূর্ণ হতেই হবে। তবে আলোচনা যে পথে এগোচ্ছে, তা নিয়ে আমি অত্যন্ত আশাবাদী।”

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও ট্রাম্প আলোচনা শুরুর বিষয়ে একমত হওয়ার পর থেকেই এই বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে কাজ চলছে। কিন্তু ওই বছরের মে মাসে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে অবনতি হওয়ায় আলোচনা বাধার মুখে পড়ে।

অপারেশন সিঁদুরের প্রেক্ষাপটে ভারত-পাকিস্তান সামরিক সংঘর্ষের পর যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতা করার কৃতিত্ব দাবি করেছিলেন ট্রাম্প। তাঁর সেই দাবি দুই দেশের সম্পর্কে জটিলতা তৈরি করে। এর পরে ভারতের পণ্যে মোট ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ বাণিজ্যচুক্তির পরিস্থিতি আরও কঠিন করে তোলে। এর মধ্যে ২৫ শতাংশ ছিল পাল্টা শুল্ক এবং বাকি ২৫ শতাংশ আরোপ করা হয়েছিল রাশিয়ার জ্বালানি কেনার জন্য। ভারত রাশিয়া থেকে তেল আমদানি কমানোর পর আলোচনায় ফের গতি আসে।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির গোড়ায় দুই পক্ষ চুক্তির একটি কাঠামোর বিষয়ে একমত হয়েছিল। মার্চের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর হবে বলেও আশা করা হচ্ছিল। কিন্তু ফেব্রুয়ারিতেই মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট জরুরি যুদ্ধকালীন ক্ষমতা ব্যবহার করে বিভিন্ন দেশের উপর শুল্ক আরোপের প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা খারিজ করে দেয়। সেই রায়ের ফলে আলোচনার পরিস্থিতি বদলে যায়।

জানা যায়, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভারতীয় আলোচকেরা চুক্তির শর্ত ও শুল্কের হার নিয়ে নতুন করে দর-কষাকষি শুরু করেন। তার পর থেকে দিল্লি ও ওয়াশিংটন মতপার্থক্য দূর করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

গত ছয় মাসে আলোচনা বারবার নিষ্পত্তির কাছাকাছি পৌঁছলেও চূড়ান্ত হয়নি। ১ অক্টোবর মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার বলেন, ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যচুক্তি চূড়ান্ত করতে কাজ করছে ট্রাম্প প্রশাসন। তবে একই সঙ্গে তিনি জানান, চুক্তি হওয়া ‘আসন্ন নয়’।

৫ অক্টোবর কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন বলেন, বাণিজ্য আলোচনা এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে আপাতত আর অগ্রগতি হচ্ছে না। শুল্ককে ক্রমশ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে দু’পক্ষের কারও পক্ষে আরও ছাড় দেওয়া কিংবা নতুন দাবি তোলা ‘অত্যন্ত, অত্যন্ত কঠিন’ হয়ে পড়েছে।

১৪ অক্টোবর বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর জানান, চুক্তি নিয়ে মতপার্থক্য দূর করতে দুই দেশ আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে এবং আলোচনা একটি ‘নিষ্পত্তির জায়গার’ দিকে এগোচ্ছে।

তার পরের দিনই আলোচনার অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর বলেন, “এই পর্যায়ে খুব বেশি বিস্তারিত বলতে চাই না। মন্ত্রীরাই ঘোষণা করুন। তবে সামগ্রিক ভাবে বড় বিষয়গুলির নিষ্পত্তি হয়ে গিয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা সক্রিয় ভাবে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি… এখানে আসার তিন সপ্তাহের মধ্যে আমরা একটি বাণিজ্যচুক্তি ঘোষণা করেছিলাম। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাণিজ্যচুক্তি হতে প্রায় ২০ বছর লেগেছে। সুতরাং আমরা অবিশ্বাস্য গতিতে এগোচ্ছি। আমি নিশ্চিত, কাজটি আমরা সম্পন্ন করব। আমরা লক্ষ্যের দিকে এগোচ্ছি। এখানে যে বাণিজ্যচুক্তি হবে, সে বিষয়ে আমি আত্মবিশ্বাসী। এই মঞ্চেই ডক্টর জয়শঙ্করকে যেমন বলতে শুনেছেন, আমরা তা চূড়ান্ত করার খুব কাছে পৌঁছে গিয়েছি।”

১৬ অক্টোবর ট্রাম্প একটি নতুন আইনের প্রয়োগ স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেন। ‘লিন্ডসে ও. গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট অব ২০২৬’ নামে ওই আইন রাশিয়ার জ্বালানির প্রধান ক্রেতাদের উপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দিয়েছিল। রাশিয়ার অপরিশোধিত তেলের দুই বৃহত্তম ক্রেতার অন্যতম ভারত। ফলে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে স্বস্তি পায় দিল্লি।

মঙ্গলবার রুবি জানান, ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়টি বিবেচনা করেই ট্রাম্প ওই শুল্ক আরোপ করেননি।

রুবিও বলেন, “তিনি ওই শুল্ক আরোপ করেননি যে কারণে, তার একটি হল—তিনি বোঝেন, এর ফলে ভারতের সঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সম্পর্কের উপর খুব ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে। সুতরাং এটি বিদেশনীতিতে ভারসাম্য বজায় রাখারই অংশ। আর কাজটি কঠিন। কারণ, এক দিকে আপনি চাইছেন, যুদ্ধরত পক্ষগুলিকে চাপ দিয়ে আলোচনার টেবিলে আনতে, যাতে আলোচনার মাধ্যমে ওই যুদ্ধের একটি নিষ্পত্তি হয়… অন্য দিকে, কখনও কখনও শুল্কের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করতে গিয়ে অন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কের উপর চাপ তৈরি হচ্ছে… আমার মনে হয়, প্রেসিডেন্ট এই দুই দিকের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য খুব চেষ্টা করছেন… তবে কাজটি চ্যালেঞ্জের হবে।”

শাস্তিমূলক শুল্ক স্থগিত রাখার পর ট্রাম্পের এই বক্তব্য চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা আরও জোরালো করছে। চলতি মাসের গোড়ায় বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গয়াল মিলওয়াকি ও ওয়াশিংটনে গ্রিয়ারের সঙ্গে দেখা করে চুক্তির খুঁটিনাটি নিয়ে আলোচনা করেন।

আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচন হতে আর কয়েক সপ্তাহ বাকি। ডিসেম্বর মাসে জি২০ নেতাদের শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী মোদীর আমেরিকা যাওয়ারও কথা রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আলোচনা শেষ করে চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগে ফের গতি এসেছে।

আধিকারিকদের বক্তব্য, রুবিওর মুম্বই সফরের উদ্দেশ্য ছিল ভারতের শীর্ষ ব্যবসায়ী মহলের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো। সেখানে তিনি প্রথম সারির ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। অন্য দিকে, জয়শঙ্করের সঙ্গে তাঁর আলোচনায় গুরুত্ব পায় আমেরিকা থেকে ভারতের জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার বিষয়টি।

এই সব উদ্যোগ বাণিজ্যচুক্তির কাঠামো তৈরির পথ প্রশস্ত করছে বলেই মনে হচ্ছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে হোয়াইট হাউসে বৈঠকের সময় ট্রাম্প ও মোদী ২০৩০ সালের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ৫০ হাজার কোটি মার্কিন ডলারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য স্থির করেছিলেন। প্রস্তাবিত চুক্তি সেই লক্ষ্য পূরণে সাহায্য করবে বলে আশা করা হচ্ছে।