বাংলাস্ফিয়ার: প্রাকৃতিক তাণ্ডবে ফের ক্ষতবিক্ষত দক্ষিণের রাজ্য তামিলনাড়ু। একটানা ভারী বর্ষণ আর দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার জেরে রাজ্যের অন্যতম দুই পাহাড়ি ও সংলগ্ন জনবহুল জেলা—নীলগিরি এবং কোয়েম্বাটুরে নেমে এল ভয়াবহ ভূমিধস (Landslide) ও হড়পা বানের কোপ। এই সর্বনাশা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের জেরে মর্মান্তিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে; পাহাড়ি ঢাল বেয়ে নেমে আসা মাটির স্তূপ ও পাথরের নিচে চাপা পড়ে মৃত্যু হয়েছে এক কর্তব্যরত বাসচালকের। অন্যদিকে, জলের তীব্র স্রোত এবং পাহাড় ধসে ধূলিসাৎ ও সম্পূর্ণ ভেসে গেছে একাধিক বসতবাড়ি। আকস্মিক এই বিপর্যয়ে গোটা এলাকায় চরম আতঙ্ক, শোক এবং থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে।

প্রশাসন ও আবহাওয়া দপ্তর সূত্রে প্রাপ্ত খবরে জানা গিয়েছে, গত কয়েক দিন ধরেই তামিলনাড়ুর বিস্তীর্ণ অঞ্চলে মৌসুমী ও ঘূর্ণাবর্তজনিত কারণে লাগাতার মুষলধারে বৃষ্টিপাত চলছে। পাহাড়ি ঢালগুলি জলমগ্ন হয়ে পড়ায় নীলগিরি এবং কোয়েম্বাটুর জেলার বিভিন্ন দুর্গম সড়কে ভূমিধসের মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। এই বৃষ্টির মধ্যেই কোয়েম্বাটুর সংলগ্ন পাহাড়ি রাস্তায় একটি যাত্রীবাহী বাস চলাচলের সময় আচমকাই ধস নামে। পাহাড়ের ওপর থেকে হাজার হাজার টন কাদা, পাথর ও গাছপালা সোজা এসে আছড়ে পড়ে ওই চলন্ত বাসটির ওপর। আকস্মিক এই আঘাত সামলানোর কোনো সুযোগই হয়নি। ঘটনাস্থলেই মর্মান্তিক মৃত্যু হয় বাসের চালকের। বাসের ভেতরে থাকা যাত্রীদের মধ্যে প্রচণ্ড আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, যদিও স্থানীয় মানুষের প্রচেষ্টায় যাত্রীদের নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হয়।

শুধু যোগাযোগ মাধ্যম বা যাতায়াতই নয়, প্রকৃতির এই নিষ্ঠুর রূপ সবচেয়ে বেশি আঘাত হেনেছে নীলগিরি জেলার প্রত্যন্ত গ্রাম ও পাহাড়ি জনবসতিগুলিতে। অবিরাম বৃষ্টির ফলে পাহাড়ি ঝোরা ও নদীগুলি ফুলেফেঁপে উঠেছে। জলের প্রচণ্ড তোড় এবং পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে ধসে যাওয়ার ফলে বেশ কিছু কাঁচা ও পাকা বাড়ি সম্পূর্ণ ভেসে গেছে। চোখের পলকে চোখের সামনে নিজেদের সাজানো সংসার জলের করালগ্রাসে তলিয়ে যেতে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। অনেক পরিবার সর্বস্ব হারিয়ে এখন খোলা আকাশের নিচে বা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে দিন কাটাচ্ছেন।

খবর পাওয়া মাত্রই রাজ্য সরকারের দুর্যোগ মোকাবিলা বাহিনী (State Disaster Response Force), স্থানীয় পুলিশ এবং ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান। চরম প্রতিকূল আবহাওয়া এবং অন্ধকারের মধ্যেই উদ্ধারকাজ শুরু করে দেয় উদ্ধারকারী দলগুলি। ধস সরিয়ে অবরুদ্ধ রাস্তা পরিষ্কার করার পাশাপাশি আটকে থাকা মানুষদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজ চলছে যুদ্ধকালীন তৎপরতায়।

টানা বৃষ্টির কারণে নীলগিরির বিখ্যাত পাহাড়ি জনপদ ও ট্যুরিস্ট স্পটগুলির সঙ্গে যোগাযোগের মূল রাস্তাগুলি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের জনজীবন পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে পড়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাহাড়ি রাস্তায় যাতায়াতের ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে এবং পর্যটকদের পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সুরক্ষিত স্থানে থাকতে বলা হয়েছে। আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েকদিন এই দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি বজায় থাকতে পারে। ফলে নীলগিরি ও কোয়েম্বাটুরের সমস্ত ভূমিধসপ্রবণ ও সংবেদনশীল অঞ্চলগুলিতে রেড অ্যালার্ট জারি করেছে জেলা প্রশাসন। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে নিহত বাসচালকের শোকাহত পরিবারের প্রতি আর্থিক সাহায্যের ঘোষণা করা হয়েছে এবং সমস্ত ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে দ্রুত সরকারি পুনর্বাসন দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। প্রকৃতির এই নির্মম তান্ডব থেকে কবে জনজীবন স্বাভাবিক ছন্দে ফিরবে, এখন সেই আশাতেই দিন গুনছেন পাহাড়ের মানুষ।