বাংলাস্ফিয়ার: দিল্লিতে বিক্ষোভ ঘিরে গণহারে আটক এবং ট্রেন-মেট্রো পরিষেবায় বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া আবেদনের শুনানির জন্য রবিবার, ১১ অক্টোবর বিশেষ অধিবেশনে বসছে সুপ্রিম কোর্ট। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে শনিবারের প্রতিবাদ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পুলিশের পদক্ষেপ ও নাগরিক স্বাধীনতার প্রশ্ন উঠেছে মামলা দুটিতে। বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চে শুনানি হওয়ার কথা।
একটি আবেদনে ছাত্রছাত্রী, যুবক-যুবতী, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী, সাংবাদিক, আইনজীবী এবং অন্যদের নির্বিচারে আটকের অভিযোগ তোলা হয়েছে। আবেদনকারীদের বক্তব্য, এই ধরপাকড় আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের অধিকারের পরিপন্থী। অন্য আবেদনটি আদালত অবমাননার। অভিযোগ, গণপরিবহণ পুরোপুরি বন্ধ না করার নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও মেট্রো স্টেশনের প্রবেশপথ বন্ধ রাখা হয় এবং রেল চলাচলে বাধা দেওয়া হয়।
আটকের বিরুদ্ধে হেবিয়াস কর্পাস বা বন্দিপ্রত্যক্ষীকরণের আবেদন করেছেন প্রবীণ আইনজীবী ও তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ মেনকা গুরুস্বামী। সংবিধানের ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে দায়ের করা আবেদনে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার দমনে আগাম আটককে ব্যবহার করা যায় কি না। তাঁর অভিযোগ, বিরোধী নেতাদের বাড়ি এবং বিক্ষোভকারীদের রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
আবেদনে যে চার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর আটকের প্রসঙ্গ এসেছে, তাঁরা হলেন অরবিন্দ কেজরীওয়াল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, পিনারাই বিজয়ন এবং মানিক সরকার। অভিযোগ অনুযায়ী, কয়েকজন নেতাকে প্রতিবাদস্থলে পৌঁছনোর আগেই আটক করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। যন্তরমন্তরে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি এবং অন্য সংগঠনগুলির কর্মসূচির পরিপ্রেক্ষিতে এই আবেদন করা হয়েছে।
আদালত অবমাননার আবেদনটি করেছেন আইনজীবী শৈলেন্দ্রমণি ত্রিপাঠী। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব গোবিন্দ মোহন, দিল্লির পুলিশ কমিশনার অনুরাগ কুমার এবং দিল্লি মেট্রো রেল কর্পোরেশনের চেয়ারপার্সন ডি থারার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা চেয়েছেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, ৯ অক্টোবরের নির্দেশ ইচ্ছাকৃতভাবে অমান্য করা হয়েছে। আবেদনে বলা হয়েছে, আদালতের হস্তক্ষেপের পরেও শনিবার ৪৫টি মেট্রো স্টেশনের প্রবেশ ও প্রস্থানপথ বন্ধ ছিল।
পরিবহণ সংক্রান্ত মামলাটি করেছিলেন সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবি এবং অন্য আবেদনকারীরা। সেখানে ৫৭টি মেট্রো স্টেশন বন্ধের নির্দেশ ও নয়াদিল্লি এবং নিজামুদ্দিন স্টেশনে আসা ট্রেন বাতিলের বিষয় ওঠে। আদালত জানিয়েছিল, ওই শুনানিতে তার বিবেচনা সীমাবদ্ধ থাকছে পরিবহণ পরিষেবাতেই। ফলে আটকের বৈধতা নিয়ে আবেদনটি পৃথক বিচার্য বিষয় হিসেবে সামনে এসেছে।
শুক্রবারের শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট বলেছিল, নিরাপত্তার প্রয়োজনে পরিষেবা নিয়ন্ত্রণ করা এবং তা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি অনুযায়ী ট্রেন-মেট্রো চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, কিন্তু সাধারণ মানুষকে পরিবহণহীন করে দেওয়া চলে না। বিধিনিষেধের মাত্রা প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখতে হবে। পরিবর্তিত ব্যবস্থা সম্পর্কে যাত্রীদের যথাযথভাবে জানানোর নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল।
ওই শুনানিতে আদালত বিশেষভাবে কর্মস্থলে যাতায়াতকারী মানুষ, পড়ুয়া ও প্রবীণ নাগরিকদের দুর্ভোগের কথা তোলে। গুরুগ্রাম, গ্রেটার নয়ডা এবং দিল্লির বিভিন্ন এলাকা থেকে বহু মানুষ জীবিকার জন্য গণপরিবহণের উপর নির্ভর করেন। সকলের ব্যক্তিগত গাড়ি নেই। তাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ব্যবস্থা নিতে গিয়ে তাঁদের দৈনন্দিন যাতায়াত কার্যত বন্ধ করে দেওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বেঞ্চ।
কেন্দ্রের পক্ষে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা আগের শুনানিতে দাবি করেছিলেন, গোটা শহর বন্ধ করে দেওয়ার ধারণা সঠিক নয়। পূর্ববর্তী বিক্ষোভে হিংসার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আদালতের বক্তব্যের পর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে পরিষেবা নিয়ন্ত্রিতভাবে চালানোর বিষয়টি বিবেচনার আশ্বাসও দেন তিনি।
রবিবারের শুনানিতে তাই ব্যক্তিস্বাধীনতার পাশাপাশি আদালতের নির্দেশ কার্যকর করার প্রশ্নও সামনে আসবে। তবে শুনানি নির্ধারিত হওয়ার অর্থ এই নয় যে আটককে ইতিমধ্যে বেআইনি ঘোষণা করা হয়েছে, কিংবা সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননা প্রমাণিত হয়েছে। আবেদনকারীদের অভিযোগ এবং প্রশাসনের বক্তব্য বিচার করেই পরবর্তী নির্দেশ দেবে সর্বোচ্চ আদালত।