বাংলাস্ফিয়ার: যোধপুরে বহুজাতিক সামরিক মহড়া ‘তরঙ্গ শক্তি’র মঞ্চে অত্যাধুনিক মার্কিন যুদ্ধবিমান এফ-৩৫ নিয়ে আমেরিকার এক শীর্ষ কমান্ডারকে খোঁচা দিলেন ভারতের বায়ুসেনাপ্রধান এয়ার চিফ মার্শাল এ পি সিং। পাশে বসা মার্কিন প্রশান্ত মহাসাগরীয় বায়ুসেনার কমান্ডার জেনারেল কেভিন বি স্নাইডারকে তাঁর রসিকতা, বিমানটির কাছে যাওয়ার অনুমতিই যখন মেলে না, তখন সেটি ভারতের কাছে বিক্রির কথা উঠছে কীভাবে?
শনিবার, ১০ অক্টোবর সাংবাদিক বৈঠকে সিং বলেন, “আপনাদের লোকজন আমাদের বিমানটির কাছেও যেতে দেন না, আর আপনারা সেটি আমাদের কাছে বিক্রি করার কথা বলছেন!” এফ-৩৫ সম্পর্কে ভারতীয় আধিকারিকেরা কতটা জানার সুযোগ পেয়েছেন, সেই প্রশ্নে তিনি জানান, ককপিট দেখানো হয়নি। তবে কাছাকাছি বিন্যাসে একসঙ্গে ওড়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
জবাবে স্নাইডার জানান, সংবেদনশীল সামরিক প্রযুক্তি সম্পর্কে কী তথ্য, কখন এবং কতটা দেওয়া যাবে, তা নির্দিষ্ট নিরাপত্তাবিধি অনুযায়ী স্থির হয়। এফ-৩৫ কর্মসূচির গোপনীয়তা সংক্রান্ত নির্দেশিকা রয়েছে। ফলে তথ্য ভাগাভাগির সিদ্ধান্ত তাঁর ব্যক্তিগত এক্তিয়ারে পড়ে না। যৌথ মহড়ায় অংশ নিলেও অত্যাধুনিক অস্ত্রব্যবস্থার প্রযুক্তি সুরক্ষার নিয়ম মেনেই চলতে হয় মার্কিন বাহিনীকে।
পরে অবশ্য নিজের মন্তব্যকে বন্ধুত্বপূর্ণ ঠাট্টা হিসেবেই ব্যাখ্যা করেন সিং। তাঁর বক্তব্য, ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের মধ্যেও তথ্য ভাগাভাগির নিজস্ব সীমারেখা থাকে।
বায়ুসেনাপ্রধান একই সঙ্গে স্পষ্ট করেন, ভারতকে এফ-৩৫ বিক্রির কোনও আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব এখনও দেয়নি আমেরিকা। এই বক্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ওয়াশিংটন সফরের সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতকে ভবিষ্যতে এফ-৩৫ সরবরাহের পথ খুলে দেওয়ার কথা বলেছিলেন। তবে রাজনৈতিক স্তরের সেই ঘোষণা এবং আনুষ্ঠানিক ক্রয়প্রস্তাব এক বিষয় নয়। সিংয়ের বক্তব্যে বোঝা গেল, যুদ্ধবিমানটি নিয়ে আলোচনা থাকলেও নির্দিষ্ট প্রস্তাব পাওয়ার পর্যায়ে বিষয়টি পৌঁছয়নি।
এবার যোধপুরের মহড়ায় আমেরিকা ছ’টি এফ-৩৫এ যুদ্ধবিমান এবং দু’শোর বেশি কর্মী পাঠিয়েছিল। ভারতের মাটিতে সামরিক মহড়ায় এই বিমানের অংশগ্রহণ এই প্রথম। এর আগে বেঙ্গালুরুর ‘অ্যারো ইন্ডিয়া’য় বিমানটি প্রদর্শিত হয়েছিল। প্রদর্শনীতে উপস্থিতির পরে যৌথ অনুশীলনে অংশগ্রহণ ভারতীয় বাহিনীর জন্য পৃথক অভিজ্ঞতা এনে দিয়েছে।
অন্যদিকে রাশিয়ার পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান সু-৫৭ প্রসঙ্গেও অবস্থান জানান সিং। মস্কো প্রস্তাব দিয়েছে, কিন্তু বিমানটির মূল্যায়ন করা হবে কি না, সে বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্ত এখনও আসেনি। নির্দেশ পেলে ভারতীয় বায়ুসেনা পরীক্ষা করে দেখবে, সেটি তাদের প্রয়োজন কতটা পূরণ করতে পারে। অর্থাৎ মার্কিন ও রুশ বিমান নিয়ে জল্পনা চললেও কোনওটিকেই ভারতের চূড়ান্ত পছন্দ হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে ১২ অক্টোবর পর্যন্ত আয়োজিত তরঙ্গ শক্তিতে ভারতের পাশাপাশি সাতটি দেশের বায়ুসেনা অংশ নিচ্ছে। আরও ৩২টি দেশ রয়েছে পর্যবেক্ষক হিসেবে। মহড়ার উদ্দেশ্য বিভিন্ন দেশের বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো, একসঙ্গে অভিযান পরিকল্পনার অভিজ্ঞতা অর্জন এবং পরস্পরের কাজের পদ্ধতি বোঝা। যুদ্ধবিমান ছাড়াও পরিবহণ ও আকাশে জ্বালানি ভরার ব্যবস্থার সমন্বিত ব্যবহার এই অনুশীলনের অংশ।
এই আবহে প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং দেশীয় ‘অ্যাডভান্সড মিডিয়াম কমব্যাট এয়ারক্রাফ্ট’ বা এএমসিএ প্রকল্পে গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ যুদ্ধবিমানের প্রযুক্তি আয়ত্ত করার পথে এটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা গড়ে তোলার পাশাপাশি বন্ধু দেশগুলির সঙ্গে গবেষণা, যৌথ উৎপাদন এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়াতে চায় ভারত। রাজনাথ বলেন, মহড়ার অভিজ্ঞতা প্রশিক্ষণ, রণকৌশল, প্রযুক্তি এবং ভবিষ্যৎ সক্ষমতা গড়ে তোলার কাজে লাগাতে হবে। অংশগ্রহণকারী দেশগুলির মধ্যে তৈরি হওয়া পেশাগত সম্পর্ক আগামী সহযোগিতার সুযোগ বাড়াবে বলে আশা তাঁর। যোধপুরের আলোচনায় তাই বিদেশি বিমান কেনার সম্ভাবনার সঙ্গে সামনে এসেছে প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকারের প্রশ্নও। ভবিষ্যতের প্রতিরক্ষা সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে রাজনাথ যে প্রযুক্তি ও পারস্পরিক আস্থার কথা বলেছেন, এফ-৩৫ ঘিরে কথোপকথন সেই প্রসঙ্গকেই প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে।