বাংলাস্ফিয়ার: সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় করা কাজের জন্য মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এবং নির্বাচন কমিশনারদের আজীবন দায়মুক্তি দিয়েছে ২০২৩ সালের আইনের ১৬ ধারা। এই বিধানকে চ্যালেঞ্জ করে দায়ের হওয়া আবেদনে কেন্দ্রকে নোটিস দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। রাষ্ট্রপতি ও রাজ্যপালদের সংবিধানপ্রদত্ত দায়মুক্তি এবং আইনসভার সদস্যদের সংসদীয় বিশেষাধিকারের তুলনাতেও এই সুরক্ষার পরিধি অনেক বিস্তৃত।
সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় করা কাজের জন্য মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এবং নির্বাচন কমিশনারদের আজীবন দায়মুক্তি দেওয়ার বিধানকে চ্যালেঞ্জ করে অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্র্যাটিক রিফর্মস বা এডিআর-এর দায়ের করা আবেদনে সম্প্রতি কেন্দ্রকে নোটিস দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।
সাম্য একটি মৌলিক অধিকার এবং আমাদের সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অংশ। সংবিধানের ১৪ অনুচ্ছেদ নিশ্চিত করে, ভারতের ভূখণ্ডের মধ্যে কোনও ব্যক্তিকে আইনের দৃষ্টিতে সাম্য কিংবা আইনের সমান সুরক্ষা থেকে রাষ্ট্র বঞ্চিত করতে পারবে না। ব্রিটিশ আইনজ্ঞ এ ভি ডাইসির ব্যাখ্যা করা ‘আইনের শাসন’ ধারণার একটি উপাদান হল আইনের দৃষ্টিতে সাম্য। এর অর্থ, কোনও ব্যক্তির অনুকূলে বিশেষ সুবিধা থাকবে না; প্রত্যেকে একই আইনের অধীন থাকবেন; এবং সমাজে তাঁর অবস্থান যা-ই হোক, কেউই আইনের ঊর্ধ্বে থাকবেন না। অন্য দিকে, আইনের সমান সুরক্ষা একটি মার্কিন ধারণা। এর তাৎপর্য হল, একই পরিস্থিতিতে আইনের মাধ্যমে প্রদত্ত সুবিধা এবং আরোপিত দায়—উভয় ক্ষেত্রেই সমান আচরণ করতে হবে।
সংবিধান অবশ্য কয়েকটি পদের জন্য কিছু দায়মুক্তি ও বিশেষাধিকারের ব্যবস্থা রেখেছে। ৩৬১ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতি এবং রাজ্যপালদের নির্দিষ্ট কিছু দায়মুক্তি দেয়। এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, তাঁদের কার্যকালে তাঁদের বিরুদ্ধে কোনও ফৌজদারি বিচারপ্রক্রিয়া চালানো যায় না এবং গ্রেফতার বা কারাবাসের জন্য কোনও পরোয়ানা বা আদেশ জারি করা যায় না। এমনকি রাষ্ট্রপতি বা রাজ্যপালের বিরুদ্ধে দেওয়ানি মামলা শুরু করতে হলেও নোটিস দেওয়ার পরে দু’মাস অতিবাহিত হতে হয়। ব্রিটিশ শাসনকালে গভর্নর জেনারেল এবং গভর্নররা এই বিশেষাধিকার ভোগ করতেন। এই উচ্চপদগুলির মর্যাদা রক্ষার উদ্দেশ্যে আমাদের সংবিধানেও সেই ব্যবস্থা বজায় রাখা হয়েছে।
সংবিধানের ১০৫ ও ১৯৪ অনুচ্ছেদে যথাক্রমে সংসদ এবং রাজ্য আইনসভার সদস্যদের বিশেষাধিকারের ব্যবস্থা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বক্তব্য পেশ এবং ভোটদানের স্বাধীনতা। সংবিধানে আরও বলা হয়েছে, সংসদ আইন প্রণয়ন করে এই বিশেষাধিকারগুলি বিধিবদ্ধ না করা পর্যন্ত, সংবিধান কার্যকর হওয়ার আগে ব্রিটিশ হাউস অব কমন্স যে বিশেষাধিকার ভোগ করত, ভারতের আইনসভাগুলি ও তাদের সদস্যরাও তা ভোগ করবেন। সংসদ এখনও পর্যন্ত এই বিশেষাধিকারগুলি বিধিবদ্ধ করতে কোনও আইন প্রণয়ন করেনি।
ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী, অন্য দেশের কূটনীতিক ও রাষ্ট্রদূতেরা দেওয়ানি এবং ফৌজদারি বিচারিক এক্তিয়ার থেকে দায়মুক্তি পান। এটি একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি, যা পারস্পরিকতার ভিত্তিতে ১৯০টিরও বেশি দেশে প্রযোজ্য।
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে পাস হওয়া ‘মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এবং অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার (নিয়োগ, চাকরির শর্তাবলি ও কার্যকালের মেয়াদ) আইন, ২০২৩’-এর ১৬ ধারায় বলা হয়েছে, বর্তমান বা প্রাক্তন কোনও মুখ্য নির্বাচন কমিশনার কিংবা নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় করা, অথবা সেই দায়িত্ব পালনের অংশ বলে দাবি করা কোনও কাজের জন্য কোনও আদালত দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা গ্রহণ করতে কিংবা চালিয়ে যেতে পারবে না।
রাষ্ট্রপতি ও রাজ্যপালদের গ্রেফতার এবং ফৌজদারি বিচারপ্রক্রিয়া থেকে দায়মুক্তি ঔপনিবেশিক আমলের একটি উত্তরাধিকার, যা আমাদের সংবিধানেও রয়ে গিয়েছে। তবে মনে রাখা প্রয়োজন, এই দায়মুক্তি কেবল তাঁদের পদে থাকার সময়টুকুর জন্যই প্রযোজ্য। অন্য দিকে, সংসদীয় বিশেষাধিকার সাম্যের নীতির একটি ব্যতিক্রম হলেও তা মূলত আইনসভার অভ্যন্তরে সংঘটিত কাজ এবং অধিবেশন চলার সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ। কূটনৈতিক দায়মুক্তির ভিত্তি হল দায়িত্ব পালনের প্রয়োজনীয়তা এবং পারস্পরিকতা; এর উদ্দেশ্য কূটনৈতিক সম্পর্কের কাজকর্ম নির্বিঘ্নে চালাতে সাহায্য করা।
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারদের আজীবন এবং শর্তহীন দায়মুক্তি দেওয়ার বিধানটি সংসদে পেশ করা মূল বিলের অংশ ছিল না। ফলে বিল পেশের সময় তার সঙ্গে জমা দেওয়া ‘উদ্দেশ্য ও কারণসংবলিত বিবৃতি’তে এই ধারা অন্তর্ভুক্ত করার কোনও যুক্তি দেওয়া হয়নি। রাজ্যসভায় বিলটি পাস হওয়ার দিন সংশোধনী হিসেবে এই ধারা যুক্ত করা হয়। পরে লোকসভাও বিলটি অনুমোদন করে এবং রাষ্ট্রপতি তাতে সম্মতি দেন।
এই সংশোধনী পেশ করার সময় কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী বলেছিলেন, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারেরা যাতে বাধাহীন ও স্বাধীনভাবে তাঁদের দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সেই উদ্দেশ্যেই বিধানটি আনা হয়েছে।
১৪ অনুচ্ছেদের অধীনে আইনের সমান সুরক্ষার নীতি আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে পৃথক শ্রেণিবিভাগের সুযোগ দেয়। তবে সেই শ্রেণিবিভাগ খামখেয়ালি বা অযৌক্তিক হতে পারে না। তার ভিত্তি হতে হবে বোধগম্য ও যুক্তিসংগত পার্থক্য। পাশাপাশি, ওই শ্রেণিবিভাগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আইনের লক্ষ্য বা উদ্দেশ্যের যুক্তিসংগত সম্পর্ক থাকতে হবে।
বিভিন্ন সাংবিধানিক ও বিধিবদ্ধ কর্তৃপক্ষকে স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে হয়। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বিচারপতিরা, ভারতের কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল বা সিএজি, সরকারি কর্ম কমিশনগুলির চেয়ারম্যান ও সদস্যেরা, লোকপাল ও লোকায়ুক্ত এবং তথ্য কমিশনারেরা। সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় করা কাজের জন্য তাঁদের কেউই এ ধরনের আজীবন ও শর্তহীন দায়মুক্তি ভোগ করেন না।
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারদের কার্যকালের শর্তাবলি আগে যে আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হত, সেই ‘নির্বাচন কমিশন (নির্বাচন কমিশনারদের চাকরির শর্তাবলি ও কার্যপরিচালনা) আইন, ১৯৯১’-এও এমন কোনও বিধান ছিল না। এই সমস্ত দিক বিবেচনায়, ২০২৩ সালের আইনে থাকা এমন ঢালাও দায়মুক্তির বিধান আইনে বহাল থাকা উচিত নয়