বাংলাস্ফিয়ার: এসআরএফটিআইয়ের আন্দোলন এবার দেশজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়ার ডাক দিলেন পড়ুয়ারা। আগামীকাল, মঙ্গলবার ২৭ অক্টোবর, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে প্রতিবাদ কর্মসূচির আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা। রবিবার আন্দোলনের ২৮তম দিনে সাংবাদিক বৈঠক করে তাঁদের অভিযোগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভিন্নমত দমন এবং ক্যাম্পাসের গৈরিকীকরণ চলছে। অন্যদিকে, প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রতিবাদের জন্য কাউকে শাস্তি দেওয়া হয়নি; বহিষ্কার ও কারণ দর্শানোর নোটিসের ভিত্তি নির্দিষ্ট অসদাচরণ এবং আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ।
পড়ুয়াদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রতিবাদ করার জন্য বহিষ্কৃতদের শাস্তি প্রত্যাহার, নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন এবং শিক্ষাঙ্গনে জাতপাত ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য রুখতে রোহিত ভেমুলা আইন প্রণয়ন। জাতীয় শিক্ষানীতি, ২০২০ ও বিকশিত ভারত শিক্ষা অধিষ্ঠান বিল, ২০২৫ প্রত্যাহারও চেয়েছেন তাঁরা। পাশাপাশি শিক্ষার বেসরকারিকরণ, ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত নজরদারি এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ দমনে ব্যবহৃত সংঘ-ঘনিষ্ঠ নিয়োগের বিরোধিতা করা হয়েছে। ছাত্র অ্যারন পি জয় অভিযোগ করেন, বিরোধিতা ও সমালোচনার পরিসর সংকুচিত করে তরুণ প্রজন্মকে সহজে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে।
আন্দোলনের মধ্যে দৈনন্দিন জীবনযাপনের সংকটও সামনে এনেছেন পড়ুয়ারা। তাঁদের অভিযোগ, হস্টেল ও মেস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় খাবার এবং পানীয় জলের ব্যবস্থা করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। প্রশাসনিক ভবন বন্ধ থাকায় সেখানে থাকা সর্বক্ষণ ব্যবহারযোগ্য শৌচাগারেও প্রবেশ করা যাচ্ছে না। পানীয় জলের পরিশোধনব্যবস্থা ঠিকমতো কাজ করছে না বলে অভিযোগ। এই অবস্থায় ক্যাম্পাস ছাড়ার নির্দেশকে আন্দোলন ভাঙার চাপ হিসেবেই দেখছেন প্রতিবাদীরা।
ছাত্র সুদীপ চক্রবর্তীর বক্তব্য অনুযায়ী, ক্যাম্পাসে প্রায় ৮০ থেকে ১০০ জন পড়ুয়া রয়েছেন। বাইরে থেকে খাবার কিনে ভাগ করে খাওয়া হচ্ছে; কেউ নিজের ঘরে রান্না করছেন। মেসে যে খাবার ৬০ টাকায় পাওয়া যেত, বাইরে থেকে নিয়মিত খাবার আনতে তার চেয়ে বেশি খরচ হচ্ছে। খাবার সংগ্রহ করতে মূল ফটকে যেতে হওয়ায় নিরাপত্তা নিয়েও তাঁদের উদ্বেগ রয়েছে। অনেকের পক্ষে এই অতিরিক্ত ব্যয় বহন করা কঠিন। কয়েকজন পড়ুয়া জানিয়েছেন, খরচ চালাতে তাঁদের খণ্ডকালীন কাজ করতে হয়। পরিবারের আর্থিক সমর্থন না থাকলে দীর্ঘ আন্দোলনের মধ্যে খাবারের বাড়তি খরচ আরও কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
অচলাবস্থার সূত্রপাত ২৭ সেপ্টেম্বর। সেদিন একটি অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে পড়ুয়াদের সঙ্গে আরএসএস-ঘনিষ্ঠ অখিল ভারতীয় গ্রাহক পঞ্চায়েতের সদস্যদের সংঘর্ষ হয়। ৪ অক্টোবর বঙ্গীয় হিন্দু জাগরণ মঞ্চের বিক্ষোভ ঘিরে ফের উত্তেজনা ছড়ায়। পুলিশ বাধা দিলে কয়েকজন বিক্ষোভকারী প্রতিষ্ঠানের ফটক ভাঙার চেষ্টা করেন বলে সংবাদসংস্থা পিটিআইয়ের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা এবং ওই ঘটনাগুলির দায় নির্ধারণের দাবিতেই পড়ুয়ারা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন।
১২ অক্টোবর থেকে উপাচার্য সন্তোষ আজমেরার দপ্তরের বাইরে অবস্থান চলছে। তাঁর পদত্যাগও দাবি করেছেন আন্দোলনকারীরা। এর মধ্যে ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত নিয়মিত পঠনপাঠন স্থগিত রেখে ক্যাম্পাস খালি করার নির্দেশ দেয় প্রতিষ্ঠান। অভিভাবকদের ইমেল পাঠিয়ে সন্তানদের বাড়ি নিয়ে যাওয়ার অনুরোধও করা হয়। কর্তৃপক্ষের যুক্তি, ক্লাস বন্ধ থাকায় অভিভাবকদের জানানো প্রয়োজন। ছাত্রদের পাল্টা অভিযোগ, পরিবারের মাধ্যমে তাঁদের উপর চাপ তৈরি করা হচ্ছে। অধিকাংশ আন্দোলনকারী পশ্চিমবঙ্গের বাইরের বাসিন্দা হলেও প্রতিবাদে থাকতে ক্যাম্পাস ছাড়েননি।
শাস্তিমূলক ব্যবস্থার পক্ষে অবশ্য অনড় প্রশাসন। রেজিস্ট্রার দীপক কুমার জানিয়েছেন, উপাচার্যের কাজে বাধা, ভয় দেখানো, গালিগালাজ এবং শারীরিক নিগ্রহের প্রমাণের ভিত্তিতে ছয় পড়ুয়াকে বহিষ্কারের সুপারিশ করেছিল ডিনস কাউন্সিল। তাঁর দাবি, সিদ্ধান্তটি সর্বসম্মত ছিল। উপাচার্যও অভিযোগ করেছেন, নথিভুক্ত বিভিন্ন নিয়মভঙ্গের ঘটনায় শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি উত্তেজনা বাড়ানোর বদলে মধ্যস্থতার পক্ষে সওয়াল করেছেন। ফলে আন্দোলনের অধিকার ও শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থানের ব্যবধান স্পষ্ট। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিভাগের প্রধান ও ডিনদের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে প্রতিষ্ঠান আগেই বলেছিল, উপাচার্যের দপ্তরে ভাঙচুর এবং দেওয়ালে অশালীন লেখাও অভিযোগের অন্তর্ভুক্ত।
ছাত্র সংসদের সহসভাপতি শুভম ওয়াইদান্দের প্রতিনিধিত্ব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন রেজিস্ট্রার। তাঁর বক্তব্য, শুভমকে তিন সেমেস্টারের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে; এই সময়ে নিয়ম অনুযায়ী তিনি ছাত্র সংগঠনের অংশ হতে পারেন না। তাই তাঁর বক্তব্যকে সমগ্র ছাত্রসমাজের মত বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়।
পড়ুয়ারা অবশ্য ভাঙচুর ও হিংসার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁদের দাবি, অবস্থান, মিছিল, স্লোগান এবং শিল্পের মাধ্যমে প্রতিবাদই আন্দোলনের পদ্ধতি। সিসিটিভি বসানো নিয়েও বিরোধ রয়েছে। ছাত্র সংসদের বক্তব্য, ক্যামেরার অবস্থান নির্ধারণে তাদের সঙ্গে আলোচনা করার আগের সমঝোতা মানেনি প্রশাসন। নতুন ক্যামেরা বসানোর আগে তিন দিনের নোটিস দেওয়ার আশ্বাসও রাখা হয়নি বলে অভিযোগ। কর্তৃপক্ষের দাবি ছিল, উপাচার্যের দপ্তরে পাথর ছোড়া ও জানলার কাচ ভাঙার পর নজরদারির ব্যবস্থা করা হচ্ছিল। পড়ুয়ারা সেই অভিযোগকে সাজানো বলেছেন এবং বহিষ্কারের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের কথা জানিয়েছেন। বহিষ্কৃত ছাত্র নচিকেত নীলিমার বক্তব্য, শাস্তির কারণ ও প্রমাণ জানতে চেয়েও যথাযথ জবাব মেলেনি। সুদীপ জানিয়েছেন, সিদ্ধান্ত নেওয়া বৈঠকের কার্যবিবরণী চেয়েছেন তাঁরা। আইনি পরামর্শ নিয়ে নোটিসও পাঠানো হয়েছে।
আন্দোলনের সমর্থনে সরব হয়েছেন অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহও। শনিবার প্রকাশিত ভিডিওবার্তায় তাঁর অভিযোগ, প্রশাসনের জবাবদিহি চাওয়ায় ভবিষ্যতের চলচ্চিত্রকারদের ভয় দেখানো হচ্ছে। কারণ দর্শানোর নোটিস, নজরদারি ও হস্টেল ছাড়ার নির্দেশের সমালোচনা করে তিনি নাগরিকদের পড়ুয়াদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্য, এই তরুণেরাই ভবিষ্যতে দেশের বাস্তব অবস্থা নিয়ে চলচ্চিত্র তৈরি করবেন; তাঁদের ভয় দেখিয়ে স্বাধীন চিন্তা বন্ধ করা যাবে না।
টানা অচলাবস্থায় পড়াশোনা, নিরাপত্তা এবং ছাত্রদের প্রতিনিধিত্ব—তিনটি প্রশ্নই এখন সামনে। পড়ুয়ারা বহিষ্কার ও প্রশাসনিক চাপের বিরুদ্ধে বৃহত্তর সংহতি গড়তে চাইছেন; কর্তৃপক্ষ নিজেদের পদক্ষেপকে শৃঙ্খলা রক্ষার প্রয়োজন হিসেবে তুলে ধরছে। মঙ্গলবারের দেশব্যাপী প্রতিবাদের ডাক সেই সংঘাতকেই কলকাতার একটি চলচ্চিত্রশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সীমানার বাইরে নিয়ে যাচ্ছে। পঠনপাঠন স্বাভাবিক হওয়ার পথ অবশ্য এখনও অনিশ্চিত