বাংলাস্ফিয়ার: খাড়গের পরিচয়পত্রের স্পষ্ট প্রতিলিপি না থাকা-সহ আবেদনে ১৪টি ত্রুটি চিহ্নিত করেছে শীর্ষ আদালতের রেজিস্ট্রি।

১২ অক্টোবরের বিশাল মিছিলের পরে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ও বিরোধী শিবিরের আরও ১০ জন বিশিষ্ট নেতার দায়ের করা আবেদন মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টের শুনানির তালিকায় ওঠেনি। আদালতের রেজিস্ট্রি যে ত্রুটিগুলি চিহ্নিত করেছিল, সেগুলি এখনও সংশোধন না হওয়ায় আবেদনটি তালিকাভুক্ত হয়নি।

সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, আবেদনে মোট ১৪টি ত্রুটি চিহ্নিত করেছে রেজিস্ট্রি। এর মধ্যে রয়েছে মামলার অন্যতম আবেদনকারী, কংগ্রেস সভাপতি তথা রাজ্যসভার বিরোধী দলনেতা মল্লিকার্জুন খাড়গের পরিচয়পত্রের স্পষ্ট প্রতিলিপি না থাকা। আবেদনের কয়েকটি পৃষ্ঠা অস্পষ্ট বা অনুপস্থিত বলেও জানিয়েছে রেজিস্ট্রি।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও ভারতের নির্বাচন কমিশন সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়, একাধিক পড়ুয়াকে খেয়ালখুশিমতো গ্রেফতারের অভিযোগ, মেট্রো স্টেশন বন্ধ করে দেওয়া এবং ট্রেন বাতিলের বিষয়ে স্মারকলিপি জমা দিতে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের সঙ্গে দেখা করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন রাহুল। সেই অনুরোধের জবাবে প্রধান বিচারপতি জানিয়েছিলেন, বিচারবিভাগীয় প্রক্রিয়ায় আবেদন দাখিল করা হলে দ্রুত শুনানির ব্যবস্থা করা হবে।

মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ আবেদনকারীদের আশ্বাস দেয়, ত্রুটিগুলি সংশোধন করা হলে তাঁদের বিষয়গুলি শুনানির জন্য তালিকাভুক্ত করা হবে।

একজন সাংবাদিকের হয়ে বিষয়টি আদালতের নজরে আনেন প্রবীণ আইনজীবী গোপাল শঙ্করনারায়ণন। তাঁকে প্রধান বিচারপতি বলেন, “আমরা এই সমস্ত বিষয় শুনানির জন্য তালিকাভুক্ত করব। ত্রুটিগুলি যাতে সংশোধন করা হয়, তা নিশ্চিত করুন।”

রাহুল ও খাড়গে ছাড়াও এই আবেদনের সহ-আবেদনকারীরা হলেন তৃণমূল সাংসদ সৌগত রায়, সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব, রাষ্ট্রীয় জনতা দলের নেতা তেজস্বী প্রসাদ যাদব, ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি (শরদ পওয়ার)-এর নেত্রী সুপ্রিয়া সুলে, শিবসেনা (উদ্ধব বালাসাহেব ঠাকরে)-র নেতা সঞ্জয় রাউত, সিপিআই নেতা ডি রাজা, ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার সাংসদ মহুয়া মাজি, সিপিআই(এম)-এর সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবি এবং ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লিগের নেতা ই টি মহম্মদ বশির।

আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়ায় বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে এবং নানা অনিয়ম ঘটেছে।

এসআইআরের সময় ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া ও তালিকায় পরিবর্তন আনার বিষয়গুলি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে স্বাধীনভাবে নিরীক্ষা করার জন্য একটি স্বাধীন কমিটি গঠনের আর্জি জানানো হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে সেই কমিটি গঠন এবং প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও অন্যান্য বিশিষ্ট নাগরিককে তার সহায়তায় যুক্ত করার আবেদন করা হয়েছে।

আবেদনে আরও বলা হয়েছে, আইন অনুযায়ী নোটিস দেওয়া এবং বক্তব্য জানানোর যুক্তিসংগত সুযোগ না দিয়ে কোনও ভোটারের নাম যেন তালিকা থেকে বাদ দেওয়া না হয়, তা নিশ্চিত করতে নির্দেশ দেওয়া হোক। পাঞ্জাব এবং ভোট হতে চলেছে এমন অন্য রাজ্যগুলিতে যোগ্য নাগরিকেরা যাতে আইনসম্মত শেষ দিন পর্যন্ত ভোটার তালিকায় নাম তোলার আবেদন করতে পারেন, তা নিশ্চিত করারও আর্জি জানানো হয়েছে।

আবেদনে বলা হয়েছে, “যোগ্য ভোটারদের অধিকার রক্ষা এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার অখণ্ডতা বজায় রাখার স্বার্থে, এই আবেদনে উত্থাপিত বিষয়গুলির বিবেচনা ও নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বিভিন্ন রাজ্যে চলমান ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া স্থগিত রাখার অন্তর্বর্তী নির্দেশ দেওয়া হোক।”

মামলায় ভারতের নির্বাচন কমিশন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এবং দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিংহ সান্ধু ও বিবেক জোশিকে পক্ষ করা হয়েছে।

এসআইআর সংক্রান্ত প্রতিটি ‘বিতর্কিত সিদ্ধান্তের’ সম্পূর্ণ নথি, বৈঠকের আলোচ্যসূচি, কার্যবিবরণী, নোট এবং নির্বাচন কমিশনারদের নথিভুক্ত আপত্তি আদালতে পেশ করতে নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশ দেওয়ার আর্জি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ইসিআইনেট ও ইআরওনেট ব্যবস্থার অ্যাক্সেস লগ এবং দেশজুড়ে এসআইআর শুরু করার বিষয়ে ২০২৫ সালের ২৪ জুন গৃহীত সিদ্ধান্তের সম্পূর্ণ নথিও চাওয়া হয়েছে।

এসআইআর সংক্রান্ত বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলি সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদ, ২০২৩ সালের প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার (নিয়োগ, চাকরির শর্তাবলি ও কার্যকালের মেয়াদ) আইনের ১৮ ধারা এবং সুপ্রিম কোর্টের ঘোষিত আইন মেনে নেওয়া হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখার নির্দেশও চাওয়া হয়েছে।

সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ভোটার তালিকা প্রস্তুত করা এবং নির্বাচন পরিচালনার তত্ত্বাবধান, নির্দেশনা ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের হাতে ন্যস্ত।

আবেদনে বলা হয়েছে, কোনও সিদ্ধান্ত আইনসম্মত কর্তৃত্ব ছাড়া নেওয়া হয়ে থাকলে তা বাতিল করতে হবে।

আরও বলা হয়েছে, “ভোটার তালিকা প্রস্তুত ও সংশোধন সংক্রান্ত সাংবিধানিক বা বিধিবদ্ধ বিধান লঙ্ঘনের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে যথাযথ রিট, আদেশ বা নির্দেশ দেওয়া হোক। যেখানে প্রযোজ্য, সেখানে ১৯৫০ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ৩২ ধারার অধীনেও ব্যবস্থা নেওয়া হোক।”

অনলাইনে ব্যবহৃত ফর্ম ৬ যাতে ১৯৬০ সালের ভোটার নিবন্ধন বিধিতে নির্ধারিত ফর্মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তা নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশ দেওয়ার আর্জিও জানানো হয়েছে। প্রযোজ্য পদ্ধতি মেনে ওই বিধি আইনসম্মতভাবে সংশোধন না করা পর্যন্ত নির্ধারিত ফর্মই অনুসরণ করতে হবে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এসআইআরের সময় যাঁদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, বুথভিত্তিক সেই সমস্ত ভোটারের নাম, প্রত্যেকের নাম বাদ দেওয়ার কারণ এবং লিঙ্গ ও বয়স অনুযায়ী বাদ পড়া ভোটারদের পৃথক পরিসংখ্যান প্রকাশের নির্দেশও চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে, ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত ব্যক্তিদের নাম পুনর্বহালের জন্য কার্যকর ও সচল ব্যবস্থা গড়ে তোলার আর্জি জানানো হয়েছে।

এর আগে স্মারকলিপি জমা দিতে সাক্ষাতের জন্য খাড়গে ও রাহুলের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন প্রধান বিচারপতি।

রাহুল ও খাড়গেকে লেখা চিঠিতে প্রধান বিচারপতি জানিয়েছিলেন, বিচারাধীন বিষয় নিয়ে বৈঠক আয়োজন করলে ক্ষমতার পৃথকীকরণের নীতি লঙ্ঘিত হবে। তাঁর বক্তব্য, এ ধরনের বৈঠক “প্রতিষ্ঠিত নৈতিকতা ও বিচারবিভাগীয় শিষ্টাচারের সঙ্গে বেমানান।